১২ মাসে সার্বভৌম এআই: ঘোষণার ভেতরের হিসাব
আগামী ১২ মাসের মধ্যে বাংলাদেশ সার্বভৌম এআই সক্ষমতা অর্জন করবে—এটাই আজকের খবর। খবরটা শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু তিন দশক টেলিযোগাযোগ আর তথ্যপ্রযুক্তি খাতের খবর লিখতে গিয়ে একটা শিক্ষা পেয়েছি: এ দেশে ঘোষণা যত সহজে আসে, বাস্তবায়ন তত সহজে আসে না।
ঘোষণাটি এসেছে গত ৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে আয়োজিত একটি সংলাপ থেকে। যে সংলাপে দুজন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ অংশ নিয়েছিলেন। সংলাপ আয়োজনে টেলিযোগাযোগ বিভাগ কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অংশীদারিত্ব ছিল না। এটা প্রমাণ করে বর্তমান সরকার এআইকে যতটা না প্রযুক্তিগতভাবে দেখছে, তার চেয়ে বেশী কূটনীতির অংশ হিসেবে দেখছে এবং এটাই সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি।
কারণ এআই এখন আর শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়, কূটনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তারও বিষয়। চিপ কোথা থেকে আসবে, কোন দেশের সঙ্গে প্রযুক্তি সহযোগিতা হবে, বৈশ্বিক এআই শাসনব্যবস্থায় বাংলাদেশ কোন অবস্থান নেবে—এসব প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্রনীতির টেবিলেই ঠিক হবে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার? কূটনৈতিক টেবিলে নেওয়া লক্ষ্য মাঠে নামাতে হবে আইসিটি বিভাগ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, বিটিআরসি, বিদ্যুৎ বিভাগসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানকে। তাদের মধ্যে সমন্বয়ের রূপরেখা কী হবে, সেটাই হবে এই ঘোষণার প্রথম পরীক্ষা।
অতীতেও আমরা বড় ঘোষণা দেখেছি। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ স্লোগানের যুগে অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ আর সক্ষমতার ঘাটতিতে অনেক প্রকল্প পরে অলস পড়ে থেকেছে।
তাই সার্বভৌম এআই-এর ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েও কয়েকটা কঠিন প্রশ্ন তোলা জরুরি। ১২ মাসে আসলে কী অর্জন করতে চাই? কোন পথে? আর পথে কোথায় কোথায় কাঁটা বিছানো?
সংজ্ঞাটাই আগে ঠিক হোক
সার্বভৌম এআই বলতে যদি বোঝানো হয় নিজস্ব চিপ, নিজস্ব ফ্রন্টিয়ার মডেল আর সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি—তাহলে ১২ মাস কেন, ১২ বছরেও তা সম্ভব কি-না সন্দেহ। যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের বাইরে পৃথিবীর খুব কম দেশই এ অর্থে সার্বভৌম। ইউরোপও পারেনি। অতএব বাংলাদেশের জন্য সেটা অবাস্তব, অযৌক্তিক।
বাস্তবসম্মত অর্থ হতে পারে স্তরভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ। দেশের মাটিতে কম্পিউট থাকবে। নাগরিকের ডেটা থাকবে দেশের আইনের অধীনে। ওপেন ওয়েট (open-weight) মডেলের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হবে নিজস্ব বাংলা মডেল। আর সেই মডেল কাজে লাগবে সরকারি সেবায়।
ওপেন ওয়েট (open-weight) মডেল কী, তা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। একটি এআই মডেল প্রশিক্ষণের সময় বিপুল ডেটা থেকে যা শেখে, তা জমা থাকে কোটি কোটি সংখ্যার আকারে। এগুলোকে বলে ওয়েট বা প্যারামিটার। সহজ ভাষায়, ওয়েটই মডেলের ‘মস্তিষ্ক’। চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো ক্লোজড মডেলের এই মস্তিষ্ক থাকে নির্মাতা কোম্পানির সার্ভারে। ব্যবহারকারী ইন্টারনেটে প্রশ্ন পাঠান, উত্তর আসে বিদেশ থেকে। অন্যদিকে open-weight মডেলের ওয়েট প্রকাশ্যে ডাউনলোড করা যায়। মেটার লামা, চীনের ডিপসিক ও আলিবাবার কুয়েন, ফ্রান্সের মিস্ট্রাল কিংবা গুগলের জেমা এর পরিচিত উদাহরণ। ফলে পুরো মডেলটাই নিজের ডেটা সেন্টারে এনে চালানো যায়, নিজের ভাষা ও ডেটা দিয়ে আরও প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। তবে open-weight মানেই পুরোপুরি ওপেন সোর্স নয়। কোন ডেটায় মডেলটি প্রশিক্ষিত হয়েছে, তা সাধারণত গোপন থাকে। লাইসেন্সেও থাকে নানা শর্ত। আর মূল মস্তিষ্কটা তৈরি হয়েছে অন্য দেশে, তাই তার দৃষ্টিভঙ্গি ও পক্ষপাতও সঙ্গে চলে আসে।
বিশ্বব্যাংকও প্রায় একই কথা বলছে। চলতি বছরের ৪ আগস্ট প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬-এর বিষয়ই ছিল উন্নয়নশীল দেশের জন্য এআইয়ের সম্ভাবনা। প্রতিবেদনে তিন ধাপের পথ দেখানো হয়েছে: আগে বিদ্যমান প্রযুক্তি গ্রহণ, তারপর স্থানীয় প্রেক্ষাপটে অভিযোজন আর সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে ফ্রন্টিয়ার এআইয়ের দিকে অগ্রসর হওয়া। সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে, সীমিত সম্পদ যেন নষ্ট না হয় এবং কোনো একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা যেন না বাড়ে। বাংলাদেশকে সেখানে উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে এমন দেশ হিসেবে, যারা ফ্রন্টিয়ার মডেল না বানিয়ে বিদ্যমান প্রযুক্তি গ্রহণ ও অভিযোজন করেই বড় মূল্য তৈরি করতে পারে।
সমস্যা হলো, ৮ অক্টোবরের ‘এআই অ্যান্ড দ্যা ইনোভেশন ডায়ালগ’ এর ঘোষণায় এই সংজ্ঞা স্পষ্ট নয়। সংজ্ঞা না থাকলে মাপকাঠিও থাকে না। আর মাপকাঠি না থাকলে ১২ মাস পর যেকোনো কিছুকেই ‘সাফল্য’ বলে ঘোষণা করা যায়।
কম্পিউট: ঘড়ির কাঁটা শুরুতেই দৌড়াচ্ছে
সার্বভৌম এআই-এর প্রথম শর্ত দেশের ভেতরে পর্যাপ্ত কম্পিউট। অর্থাৎ উচ্চক্ষমতার জিপিইউ ক্লাস্টার। একটি মাঝারি মানের বাংলা মডেল প্রশিক্ষণ ও সরকারি সেবায় চালানোর জন্য কয়েক শ থেকে হাজারখানেক জিপিইউ দরকার হতে পারে। এর খরচ আনুমানিক কয়েক কোটি ডলার।
কিন্তু টাকা থাকলেই জিপিইউ চলে আসে না। বিশ্বজুড়ে এর চাহিদা আকাশছোঁয়া, সরবরাহে অপেক্ষার তালিকা লম্বা। তার সঙ্গে যোগ হবে আমাদের সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া—দরপত্র, মূল্যায়ন, আপত্তি, পুনঃদরপত্র। অভিজ্ঞতা বলে, এই পর্ব শেষ করতেই ছয় থেকে নয় মাস চলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাহলে ১২ মাসের অর্ধেকের বেশি সময় যন্ত্র আনতেই শেষ।
তারপর বিদ্যুৎ। এআই ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা প্রচলিত ডেটা সেন্টারের কয়েক গুণ। লাগে বিশেষ শীতলীকরণ ব্যবস্থা। কালিয়াকৈরের জাতীয় ডেটা সেন্টার আছে ঠিকই, কিন্তু সেটি এআই-এর উচ্চ ঘনত্বের কম্পিউটের জন্য নকশা করা হয়নি। গ্রিডের লোডশেডিং আর ভোল্টেজ ওঠানামা সামলে কোটি ডলারের যন্ত্র নিরাপদে চালানো আলাদা চ্যালেঞ্জ।
আরেকটা পুরোনো রোগের কথাও বলতে হয়। আমরা অবকাঠামো কিনি, কিন্তু চালানোর বাজেট রাখি না। বিদ্যুৎ বিল, রক্ষণাবেক্ষণ আর হালনাগাদের বার্ষিক বরাদ্দ না থাকলে দুই বছরের মধ্যে এই ক্লাস্টারও অলস যন্ত্রের তালিকায় নাম লেখাবে। এ খাতের পুরোনো অনেক প্রকল্পের পরিণতি আমরা দেখেছি।
ডেটাই আসল সার্বভৌমত্ব
জিপিইউ কেনা যায়, ডেটা কেনা যায় না। সার্বভৌম এআই-এর প্রাণ হলো নিজের ভাষা আর নিজের মানুষের ডেটা। প্রায় ৩০ কোটি মানুষের ভাষা বাংলা, অথচ বৈশ্বিক এআই মডেলগুলোতে বাংলার উপস্থিতি এখনো দুর্বল। এই শূন্যতাই আমাদের সুযোগ।
সুযোগ কাজে লাগাতে দরকার বিশাল ও পরিচ্ছন্ন বাংলা কর্পাস—সরকারি নথি, আদালতের রায়, পাঠ্যপুস্তক, জাতীয় আর্কাইভ, বেতার-টেলিভিশনের ভাষণ, আঞ্চলিক উচ্চারণের কণ্ঠস্বর। কিন্তু আমাদের সরকারি ডেটা ছড়ানো-ছিটানো, অনেকটাই এখনো কাগজে বন্দি। এক মন্ত্রণালয় আরেক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ডেটা ভাগাভাগি করতে চায় না—এ অভিজ্ঞতা পুরোনো।
এখানে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নটাও তুলতে চাই। দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ সমকালীন বাংলা টেক্সট তৈরি করছে সংবাদমাধ্যম। সেই কনটেন্ট দিয়ে জাতীয় মডেল প্রশিক্ষিত হলে কপিরাইট আর ন্যায্য পারিশ্রমিকের কাঠামো কী হবে? এ প্রশ্নের উত্তর এখনই ঠিক না করলে পরে বিরোধ অনিবার্য।
মডেলের ক্ষেত্রে শূন্য থেকে শুরু করার দরকার নেই। ওপেন ওয়েট১‘ মডেলকে বাংলায় ফাইন-টিউন করা ১২ মাসে সম্ভব। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টার্টআপে বাংলা ভাষাপ্রযুক্তি নিয়ে যে বিচ্ছিন্ন কাজ হয়েছে, সেগুলোকে এক ছাতার নিচে আনতে হবে। সঙ্গে চাই নিজস্ব বাংলা বেঞ্চমার্ক। নইলে ‘আমাদের মডেল ভালো’—এই দাবি যাচাই করার কোনো উপায় থাকবে না।
আর ডেটার নিরাপত্তা? ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার আইনি কাঠামো কাগজে থাকলেই চলবে না, তার কার্যকর প্রয়োগ লাগবে। কোন ডেটা দেশের বাইরে যাবে না, কে কোন ডেটায় প্রবেশ করতে পারবে—এসব স্পষ্ট না হলে ‘সার্বভৌম’ শব্দটাই ফাঁপা হয়ে যায়।
মানুষ ছাড়া যন্ত্র অচল
হার্ডওয়্যার এক বছরে আনা যায়, দক্ষ জনবল এক বছরে তৈরি করা যায় না। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১৮ কোটি মানুষের দেশে বাংলাদেশ এক হাজার মানসম্পন্ন এআই প্রকৌশলী তৈরি করতেও হিমশিম খাচ্ছে। যারা দক্ষ, তাদের বড় অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছেন বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য দেশে বসে কাজ করছেন।
তাই ১২ মাসে করণীয় দুটি। প্রথমত, প্রবাসী বাংলাদেশি এআই গবেষক ও প্রকৌশলীদের যুক্ত করার একটি বিশেষ কর্মসূচি—পূর্ণকালীন হোক বা খণ্ডকালীন। দ্বিতীয়ত, জাতীয় কম্পিউট ক্লাস্টারে বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টার্টআপের সহজ প্রবেশাধিকার। গবেষক যদি যন্ত্র ব্যবহারের অনুমতি পেতে মাসের পর মাস ফাইল ঘোরান তাহলে সেই যন্ত্র দিয়ে জাতির কোনো লাভ নেই।
প্রতিষ্ঠানের প্রশ্নটাও সমান জরুরি। আইসিটি বিভাগ, বিটিআরসি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা—সবাই এআই-এর অংশীদার। কিন্তু দায়িত্ব কার? টেলিযোগাযোগ খাতে আমরা বছরের পর বছর দেখেছি, একাধিক কর্তৃপক্ষ থাকলে সিদ্ধান্ত আটকে থাকে আর দায় ঠেলাঠেলি চলে। সার্বভৌম এআইয়ের জন্য একটি ক্ষমতাসম্পন্ন একক সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ দরকার। আর জাতীয় এআই নীতি ২০২৬-২০৩০-এর সঙ্গে ১২ মাসের লক্ষ্যকে মাসভিত্তিক মাইলফলকে বাঁধতে হবে।
ভূরাজনীতির দেয়াল আর সংযোগের সীমা
সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা আসলে প্রযুক্তির বাইরে। উচ্চক্ষমতার চিপ আসবে মূলত মার্কিন ইকোসিস্টেম থেকে। open-weight মডেলের বড় অংশ মার্কিন অথবা চীনা। বিশ্ব এখন দুই প্রযুক্তি-বলয়ে ভাগ হচ্ছে—একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্যাক্স সিলিকা, অন্যদিকে চীনের ওয়াইকো।
বাংলাদেশ কোন বলয়ের চিপ কিনবে, কোন বলয়ের মডেলকে ভিত্তি করবে—এই সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে আমাদের সার্বভৌমত্বের সীমা কতটুকু। দুই নৌকায় পা রাখার কৌশল অতীতে কাজে দিয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি-বলয়ের এই প্রতিযোগিতায় সেই জায়গা দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। তাই সত্যটা স্বীকার করাই ভালো: চিপ আর বেস মডেলে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব আমাদের নেই, থাকবেও না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বিকল্প খোলা রাখা আর কোনো এক সরবরাহকারীর হাতে জিম্মি না হওয়া।
এই বাস্তবতার একটা দেশীয় উদাহরণ দেওয়া যাক। ‘পুকু’ (Puku) এখন দেশের ডেভেলপার আর শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচিত একটি এআই কোডিং প্ল্যাটফর্ম। এর আছে কোড লেখার এডিটর, টার্মিনালে কাজের সিএলআই আর ব্রাউজারভিত্তিক চ্যাট। ওয়েবসাইটের ‘অ্যাবাউট’ পাতায় জানানো হয়েছে, পুকু তৈরি করেছে ঢাকার প্রতিষ্ঠান পরিধি আইও লিমিটেড। ব্যবহারকারীদের তালিকায় বুয়েট, ব্র্যাক, সাস্টসহ বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দেখানো হয়েছে। বিকাশ, নগদ, রকেটে পেমেন্ট নিয়ে বিশ্বমানের এআই মডেলে দেশের মানুষের প্রবেশাধিকার সহজ করেছে তারা। শুধু তাই নয়, প্রতিটি অনুরোধ তার উদ্দেশ্য ও জটিলতা বুঝে উপযুক্ত মডেলের কাছে পাঠানোর রাউটিং ব্যবস্থা এবং কোড লেখার আগে পুরো প্রকল্পের কাঠামো বুঝে নেওয়ার নিজস্ব প্রযুক্তিও গড়ে তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ধরনের দেশীয় দক্ষতাই সার্বভৌম এআই-এর ভিত্তি।
কিন্তু একই ‘অ্যাবাউট’ পাতায় পরিধি স্পষ্ট করেই বলছে, তাদের পণ্যগুলো একাধিক এআই প্রোভাইডারের মডেল ব্যবহার করে আর তারা মডেল নিয়ে গবেষণা, ফাইন-টিউনিং ও রাউটিং করে। প্যাকেজে দেওয়া হচ্ছে অ্যানথ্রপিকের ক্লদ অপাস ৫-এর মতো ক্লোজড মডেল, যার ওয়েট কখনো দেশের সার্ভারে আসে না। অর্থাৎ পুকুতে বসে কেউ এই মডেলে কাজ করলে তার কোড আর প্রশ্ন প্রক্রিয়াকরণের জন্য যায় বিদেশি সার্ভারে। পরিধি অবশ্য জানিয়েছে, পুকু অ্যাপের ব্যবহারকারীর ডেটা দিয়ে তারা নিজেদের মডেল প্রশিক্ষণ দেয় না এবং ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করে না। কিন্তু বিদেশি প্রোভাইডারের সার্ভারে সেই ডেটা কোন দেশের আইনের অধীনে থাকছে, সে প্রশ্ন কোনো দেশীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে নেই।
এটা পুকু বা পরিধির দুর্বলতা নয়, এটাই আমাদের এআই খাতের বাস্তব চেহারা। দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলোও দাঁড়িয়ে আছে বিদেশি মডেলের কাঁধে। কাল কোনো বিদেশি প্রোভাইডার দাম বাড়ালে, শর্ত বদলালে কিংবা ভূরাজনৈতিক কারণে সেবা সীমিত করলে তার ধাক্কা সরাসরি এসে লাগবে এই দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গায়ে। অ্যাপ্লিকেশনের স্তরে আমরা এগোচ্ছি, কিন্তু মূল ‘মস্তিষ্ক’ এখনো অন্যের হাতে। সার্বভৌম এআই-এর ঘোষণা তখনই অর্থবহ হবে, যখন পুকুর মতো উদ্যোগগুলো দেশের মাটিতে চলা নিজস্ব বা ওপেন ওয়েট মডেলে কাজ করার বিকল্প হাতে পাবে।
আছে সংযোগের প্রশ্নও। আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের জন্য আমরা এখনো সীমিত সংখ্যক সাবমেরিন কেবলের ওপর নির্ভরশীল। আইআইজি স্তরের কাঠামো আর ব্যান্ডউইথের খরচ নিয়ে বিতর্ক পুরোনো। দেশের ভেতরে এআই সেবা চালানোর অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভর করবে দেশীয় নেটওয়ার্ক অবকাঠামো কতটা শক্তিশালী আর সাশ্রয়ী, তার ওপর।
ঘোষণা অর্থবহ হবে যদি…
আমি এই ঘোষণার বিরোধী নই। বরং বলব, দেরিতে হলেও সঠিক প্রশ্নে রাষ্ট্রের মনোযোগ এসেছে। কিন্তু ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দিতে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতেই হবে।
প্রথমত, সরকারকে প্রকাশ্যে বলতে হবে ১২ মাস পর ‘সার্বভৌম এআই সক্ষমতা’ বলতে ঠিক কী বোঝাবে—কত কম্পিউট, কোন মডেল, কোন কোন সেবা। দ্বিতীয়ত, কম্পিউট ক্রয়ে দ্রুত ও স্বচ্ছ বিশেষ প্রক্রিয়া চাই। সঙ্গে চাই অন্তত পাঁচ বছরের পরিচালন বাজেটের নিশ্চয়তা। তৃতীয়ত, ডেটা শেয়ারিং ও সুরক্ষার আইনি কাঠামো মাঠে কার্যকর করতে হবে। চতুর্থত, একক সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষকে প্রকৃত ক্ষমতা দিতে হবে। পঞ্চমত, প্রতি তিন মাসে অগ্রগতির প্রকাশ্য প্রতিবেদন আর স্বাধীন মূল্যায়ন রাখতে হবে।
সবশেষে, বছর শেষে সাধারণ মানুষ যেন বাংলায় কথা বলে অন্তত কয়েকটি সরকারি সেবা পান—স্বাস্থ্য পরামর্শ, কৃষি তথ্য, ভূমি সেবা। নাগরিক নিজে ব্যবহার করতে না পারলে সার্বভৌম এআই থাকবে কেবল মন্ত্রণালয়ের প্রেজেন্টেশনে।
১২ মাসে একটা শক্ত ভিত্তি দাঁড় করানো সম্ভব। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌম সক্ষমতার জন্য লাগবে অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছরের ধারাবাহিক বিনিয়োগ আর রাজনৈতিক অঙ্গীকার। ঘোষণার উচ্ছ্বাসে এই সত্য যেন হারিয়ে না যায়।
রাশেদ মেহেদীটেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিশ্লেষক, সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ
মতামত দিন