ছয় মাসে সরকারের পথচলা: প্রতিশ্রুতির ভার বনাম বাস্তবতার কষ্টিপাথর
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন তারেক রহমান। সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত সময়ের হিসাবে পেরিয়ে গেছে ঠিক ছয় মাস বা ১৮০ দিন। সংখ্যায় সময়টা হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু একটি রাষ্ট্রের জন্য ছয় মাস কখনো কখনো এক দশকের সমান ভারী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঝড় সামলে যখন কোনো সরকার নতুন করে রাষ্ট্রের হাল ধরে, তখন প্রথম ছয় মাস আর নিছক ক্যালেন্ডারের কয়েকটি পাতা থাকে না; তা হয়ে ওঠে জনআস্থা ও রাষ্ট্রক্ষমতার মধ্যকার এক নীরব পরীক্ষার মঞ্চ। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির খাতায় লেখা স্বপ্নগুলো বাস্তবের কঠিন মাটিতে কতটা শিকড় গাড়তে পেরেছে, আর কতটা রয়ে গেছে কেবল কালিতে লেখা শব্দ হয়ে; এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই শুরু হয় সরকারের আসল পরীক্ষা।
তারেক রহমানের সরকারও এই পরীক্ষার বাইরে নয়; বরং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বাস্তবতার কারণে পরীক্ষাটি তার জন্য আরও কঠিন। কারণ তিনি যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছেন, তার পথ মোটেও মসৃণ নয়। ভঙ্গুর অর্থনীতির ভাঙাচোরা কাঠামো, রক্তক্ষরণে ন্যুব্জ ব্যাংকিং খাত এবং আইনশৃঙ্খলার নড়বড়ে ভিত্তি; এসব বাস্তবতা নিয়েই তাকে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। এমন এক বিরূপ প্রেক্ষাপটে ছয় মাস পার করার পর প্রশ্নটি তাই সরল, কিন্তু নির্মম; কতটা পথ সত্যিই অতিক্রম করা গেল, আর কতটা রয়ে গেল কেবল ফাইলবন্দি প্রতিশ্রুতি হয়ে, যার স্পর্শ এখনো পৌঁছায়নি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়?
সরকারি মহল থেকে অবশ্য শোনা যাচ্ছে আত্মবিশ্বাসেরই প্রতিধ্বনি। এক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ছয় মাসের মতো স্বল্প সময়ে কোনো সরকারের পক্ষেই সব সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে সততা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নে বর্তমান সরকার কোনো ছাড় দিচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেন। সেখানে কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ ঋণ মওকুফের ঘোষণা আসে এবং এর সুফল প্রায় ১৩ লাখ কৃষক পরিবারের কাছে পৌঁছে যায়। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই দ্রুত বাস্তবায়নই নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণে তাদের আন্তরিকতার প্রমাণ।
তবে সাফল্যের এই বয়ান যতটা জোরালো, বাস্তবতার চিত্র ততটা মসৃণ নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতির কিছুটা সুফল মিলেছে। মে মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশের ঘরে। অর্থাৎ পরিসংখ্যানের পাতায় কিছুটা স্বস্তি এলেও বাজারের বাস্তবতায় তার ছায়া এখনো স্পষ্ট নয়। সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের আয়-ব্যয়ের হিসাবেই এই ব্যবধান সবচেয়ে প্রকট হয়ে ধরা পড়ছে।
নীতিগত সংস্কারের তালিকাও অবশ্য ছোট নয়। জুয়া প্রতিরোধ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনসহ একাধিক আইনি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এই ছয় মাসে। নিরাপদ খাদ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন ক্রেডিট এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের মতো বিষয়েও নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরিবেশ খাতে অগ্রগতির একটি দৃশ্যমান সংখ্যাও রয়েছে। ২০২৬ সালে ৫ কোটি ১৫ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রথম ছয় মাসেই রোপণ হয়েছে ২ কোটি ২২ লাখের বেশি চারা। খাল খনন কর্মসূচিতেও নির্দিষ্ট অগ্রগতির দাবি রয়েছে।
শিক্ষা খাতেও সরকার নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে ৪৩টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল শিক্ষায় কিছু অগ্রগতি হলেও এর একটি বড় অংশ এখনো প্রকল্প প্রস্তাব কিংবা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। ফলে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যকার দূরত্ব যে এখনো যথেষ্ট, সেটিও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অবকাঠামো খাতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, ঢাকার জলপথে ওয়াটার বাস, সরকারি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো প্রকল্প নিয়ে সরকার সক্রিয় থাকার কথা বলছে। প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বায়োটেকনোলজির মতো ভবিষ্যৎমুখী খাতেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। কূটনীতির ক্ষেত্রেও সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা রয়েছে। তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা এখনো কাটেনি; প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের পরিবেশও এখনো অনুকূল হয়ে ওঠেনি।
তবে সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষার জায়গা সম্ভবত বাজারদর ও জ্বালানি সরবরাহ। মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান কিছুটা নেমেছে ঠিকই, কিন্তু নিত্যপণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাসের ঘাটতিজনিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ঘন ঘন লোডশেডিং। এতে জনজীবনের পাশাপাশি শিল্প উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়েছে। আগস্টে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে নতুন করে কড়াকড়ি আরোপ করতে হয়েছে। এতে স্পষ্ট, সংকটটি কেবল সাময়িক নয়; এর শিকড় এখনো কাঠামোগত বাস্তবতার গভীরে রয়ে গেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে সরকারের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, গণপিটুনি এবং মব-সৃষ্ট সহিংসতা বন্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বারবার বলা হলেও বাস্তবে এসব পুরোপুরি থামানো যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুর রাজ্জাক খানের মূল্যায়নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গত ছয় মাসের কর্মকাণ্ডে তিনি সন্তুষ্ট নন। তাঁর ভাষায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে চলে আসা মব সহিংসতা এখনো বন্ধ হয়নি; একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জ্বালানি সংকট মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। সরকারের সরকারি বয়ানের বিপরীতে এই মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এই সরকারের জন্য সবচেয়ে কঠিন অর্থনৈতিক উত্তরাধিকারগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও বাংলাদেশের আর্থিক খাত, রাজস্ব ব্যবস্থা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। সংস্থাটির বার্তা স্পষ্ট, দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা সমাধানে দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ প্রয়োজন। আরও উদ্বেগের বিষয় প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস। আইএমএফ সতর্ক করেছে, প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সাড়ে তিন শতাংশে নেমে আসতে পারে; এমনকি মধ্যমেয়াদে তা তিন শতাংশের নিচেও নামার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় অর্থনৈতিক সংস্কারের গুরুত্ব এখন আরও বেড়ে গেছে।
এসব সমালোচনার মধ্যেও বিএনপির অবস্থান তুলনামূলক আত্মবিশ্বাসী, যদিও পুরোপুরি প্রতিরক্ষামূলক নয়। দলের নবনিযুক্ত স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সরকার অনেক ক্ষেত্রে সফল হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে তাঁর মতে, ছয় মাস একটি সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট সময় নয়। প্রতি ছয় মাস অন্তর সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা হবে এবং জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্ভব হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
দলের আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার অবশ্য কিছুটা ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন। তাঁর দাবি, দ্রব্যমূল্য এখন অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে এসেছে এবং গ্যাস সরবরাহের সংকট মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি এ সংকটের জন্য বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমালোচনা করে বলেন, তারা গ্যাসের টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে তিনি সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ প্রশাসনে দলীয়করণকে দায়ী করেন। তাঁর দাবি, সার্বিক পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই উন্নত হয়েছে।
এই ছয় মাসের কর্মকাণ্ড নথিবদ্ধ করতে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে একটি ই-বুকও প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে রাষ্ট্র সংস্কার, অর্থনীতি, কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বিভিন্ন উদ্যোগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এটি সরকারের নিজস্ব সাফল্যের বয়ান। তবে এর পাশাপাশি সমাজে চলমান সমালোচনার ধারাটিও থেমে নেই।
সর্বোপরি, এই ছয় মাসকে এক কথায় সফল কিংবা ব্যর্থ বলে চিহ্নিত করার সুযোগ কম। সরকারের বড় অর্জন সম্ভবত দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় একটি নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করার চেষ্টা। কিন্তু সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটিও একই সঙ্গে স্পষ্ট— এসব উদ্যোগের অনেকটাই এখনো পরিকল্পনা কিংবা প্রক্রিয়ার স্তরে রয়েছে; সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনে এর প্রতিফলন এখনো সীমিত।
আইএমএফের সতর্কবার্তা, বাজারের অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং মব সহিংসতার মতো সমস্যাগুলো মিলিয়ে সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ একটিই— পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নে রূপ দেওয়া। আগামী ছয় মাসে ঘোষণার চেয়ে ফলাফল, রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে জনজীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন এবং প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব অর্জনই হয়ে উঠবে এই সরকারের প্রকৃত মূল্যায়নের কষ্টিপাথর।
[লেখক: অঞ্জন কর, সাব-এডিটর, ভিউজ বাংলাদেশ]
মতামত দিন