শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, ফাঁসির দণ্ড আর বিচারিক গোলকধাঁধা
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের একটি মন্তব্য। গত রোববার তিনি বলেছেন, `শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফিরতে কোনো আইনগত বাধা নেই; বরং রাষ্ট্রপক্ষ চায় তিনি দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হোন এবং নিজের বিরুদ্ধে দেওয়া রায় আইনি প্রক্রিয়ায় চ্যালেঞ্জ করুন।‘ তার এই বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে—দেশে ফেরার পথ যদি আইনগতভাবে খোলা থাকে, তাহলে তার সামনে সবচেয়ে বড় বাধা কোথায়? আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড, হাইকোর্টে অপেক্ষমাণ ডেথ রেফারেন্স, সম্ভাব্য আপিল, বিভিন্ন আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং সারা দেশে দায়ের হওয়া কয়েকশ মামলার জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে কীভাবে এগোবে তার আইনি লড়াই? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন দৃষ্টি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার দিকে।
দেশে ফেরার অধিকার বনাম বিচারের বাস্তবতা
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী একজন নাগরিককে নিজ দেশে প্রবেশ থেকে বিরত রাখার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাইলে আইনগতভাবে তাকে বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হবে বিচারিক বাস্তবতা। কারণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা আদালত পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে রয়েছে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, গণহত্যা, গুম, মানবতাবিরোধী অপরাধ, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অভিযোগে দায়ের হওয়া কয়েকশ মামলা। অধিকাংশ মামলায় আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও কার্যকর রয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলের মতে, দেশে ফিরলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হবে আদালতের জারি করা পরোয়ানাগুলো কার্যকর করা। এরপর একের পর এক আদালতে হাজিরা, রিমান্ড, জামিনের আবেদন, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ—সব মিলিয়ে শুরু হবে দীর্ঘ বিচারিক লড়াই।
মৃত্যুদণ্ডের রায় মানেই কি দ্রুত দণ্ড কার্যকর?
সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা প্রচলিত থাকলেও বাস্তবে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ অনুসরণ করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিলেই তা কার্যকর হয়ে যায় না। প্রথমে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এরপর ডেথ রেফারেন্স ও সংশ্লিষ্ট বিচারিক নথি উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়। হাইকোর্ট বিভাগ সেই রায় পর্যালোচনা করে মৃত্যুদণ্ড বহাল, পরিবর্তন কিংবা বাতিল—যেকোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারে। এরপরও আপিল বিভাগের পথ খোলা থাকে। সব বিচারিক ধাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিমের মতে, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া আরও জটিল হতে পারে। কারণ, তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিলও করেননি।
আপিলের সুযোগ কি শেষ?
চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল না করায় বিষয়টি এখন আদালতের বিবেচনার ওপর নির্ভর করছে। আইন অনুযায়ী, বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে আদালতের কাছে সময় প্রার্থনা বা বিলম্ব মার্জনার আবেদন করা যেতে পারে। আদালত যদি সন্তুষ্ট হন, তাহলে আপিল গ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, আপিলের দরজা পুরোপুরি বন্ধ—এমনটি বলার সুযোগ নেই; আবার তা স্বয়ংক্রিয়ভাবেও খুলে যাবে না।
কয়েকশ মামলার চাপ—বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে বিরল অধ্যায়
শুধু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলাই নয়, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যাও নজিরবিহীন। হত্যা, হত্যাচেষ্টা, গুম, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত সহিংসতা, শাপলা চত্বর অভিযানসহ বিভিন্ন ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলা দেশের বিভিন্ন জেলায় বিচারাধীন। অনেক মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। আবার নতুন অভিযোগও যুক্ত হচ্ছে।
অর্থাৎ, দেশে ফিরলে তাকে একই সঙ্গে একাধিক আদালত, ট্রাইব্যুনাল এবং তদন্ত সংস্থার আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিপুল সংখ্যক মামলায় একই ব্যক্তির বিচার পরিচালনা বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে আদালতের কাঠগড়ায়
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের বক্তব্যের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—রাষ্ট্রপক্ষ শেখ হাসিনার বিচারকে রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে চায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি বা ঊর্ধ্বতন দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে বিচার হয়েছে। ফলে আদালতেই তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাবেন।
এদিকে আওয়ামী লীগের বিচার নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯–এর বিভিন্ন বিধান বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, তদন্তে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে কোনো রাজনৈতিক দলকেও বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এখন কী?
শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি ফিরবেন না—রাজনৈতিক অঙ্গনে এ প্রশ্ন বহুদিনের। কিন্তু আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এখন প্রশ্নটি ভিন্ন।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো—তিনি যদি ফিরে আসেন, তাহলে কীভাবে একই সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের মামলা, হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স, সম্ভাব্য আপিল, শত শত ফৌজদারি মামলা এবং নতুন তদন্ত—সবগুলো আইনি প্রক্রিয়া সমন্বিতভাবে পরিচালিত হবে?
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা অতীতে বহু আলোচিত রাজনৈতিক মামলার সাক্ষী হয়েছে। তবে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে একই সময়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দণ্ডিত ব্যক্তি এবং দেশের বিভিন্ন আদালতে কয়েকশ মামলার আসামি হিসেবে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা হবে একেবারেই ব্যতিক্রমী। সে কারণে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্নটি এখন কেবল একটি রাজনৈতিক ইস্যু নয়; এটি বাংলাদেশের সংবিধান, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা, মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার এবং আইনের শাসনের বাস্তব প্রয়োগের একটি বড় পরীক্ষাও বটে। আগামী দিনগুলোয় এই বিচারিক পথচলাই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের পরিণতি।
মতামত দিন