Views Bangladesh Logo

চিপ যুদ্ধের গল্প: পর্ব-৬

জাপানের সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর যুদ্ধ: সিলিকন ভ্যালির কঠিন লড়াই

Mahmud  Hossain

মাহমুদ হোসেন

এমডির সিইও জেরি স্যান্ডার্স চিপ ব্যবসায় প্রবেশ করেছিলেন এক যুদ্ধংদেহি মনোভাব নিয়ে, বিশেষ করে তার পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ইন্টেলের বিরুদ্ধে। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে ইন্টেল নয়, জাপানই হয়ে উঠেছিল তার নতুন, আরও ভয়ংকর প্রতিদ্বন্দ্বী।

সেই সময় আমেরিকান কোম্পানিগুলো- যেমন ফেয়ারচাইল্ড, ইন্টেল, এএমডি- একে অপরের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা-মোকদ্দমা চালাত। তারা প্রতিযোগীর সেরা ইঞ্জিনিয়ারদের নিজেদের কোম্পানিতে ভাগিয়ে আনত, পেটেন্ট নিয়েও তাদের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব লেগে থাকত। সেই সময় হিটাচি, এনইসি, তোশিবা, ফুজিৎসুর মতো জাপানি কোম্পানিগুলো ঝড়ের গতিতে বিশ্বের মেমরি চিপের বাজার দখল করে নিচ্ছিল। চিপ শিল্পের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব চার্লি স্পর্ক তো বলেই

ফেললেন, "আমরা জাপানের সঙ্গে যুদ্ধ করছি- না, বন্দুক নিয়ে নয়। এটা প্রযুক্তি, উৎপাদন দক্ষতা এবং গুণগত মানকে কেন্দ্র করে এক অর্থনৈতিক যুদ্ধ।" তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে, আমেরিকান টেলিভিশন শিল্পের (যা জাপান ধ্বংস করে দিয়েছিল) যা ঘটেছে, এবার চিপ শিল্পের ক্ষেত্রেও তাই ঘটবে।

আমেরিকানদের কিছু শঙ্কার সত্যিই বাস্তব ভিত্তি ছিল। ১৯৮১ সালে হিটাচির একজন কর্মী গ্লেনমার নামক এক আমেরিকান কোম্পানির এক ‘কনসালটেন্ট’-এর কাছ থেকে গোপনে কিছু ব্যবসায়িক তথ্য কেনার চেষ্টা করেন, যে জন্য হিটাচি ৫ লাখ ডলার বরাদ্দ রেখেছিল। আসলে গ্লেনমার ছিল এফবিআইর পাতা ফাঁদ। শেষমেশ হিটাচির বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তোশিবার বিরুদ্ধেও এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল- তারা সোভিয়েত ইউনিয়নকে সাবমেরিন তৈরির গোপন প্রযুক্তি দিয়েছিল। যদিও এই ঘটনা চিপ ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল না, তবু আমেরিকানদের মনে এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হলো যে, জাপান 'ফেয়ার প্লে' করছে না, অর্থাৎ তারা ন্যায্যভাবে খেলছে না।

তবে বাস্তবতা ছিল আরও অনেক জটিল। জাপান সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় দেশটির কোম্পানিগুলো তাদের নিজস্ব বাজারে আমেরিকান চিপের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব করে তুলেছিল। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত জাপান আমেরিকান কোম্পানিগুলোর চিপ বিক্রি কোটা দিয়ে সীমিত করে রাখে। এমনকি কোটা তুলে নেওয়ার পরও, সনি বা এনটিটি (জাপানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিকম কোম্পানি) কেবল জাপানি চিপই কিনত। জাপানি কোম্পানিগুলোর আরও বড় সুবিধা ছিল সরকারি ভর্তুকি। ১৯৭৬ সালে জাপান সরকার যৌথ গবেষণা প্রকল্প হিসেবে VLSI প্রোগ্রাম শুরু করে, যেখানে সরকার অর্ধেক খরচ বহন করত। আমেরিকায় এরকম কোনো কিছু সেখানকার অ্যান্টিট্রাস্ট আইনের কারণে সম্ভব ছিল না।

চিপ কারখানা নির্মাণ ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল, আর এতে পুঁজি বা ঋণের সুদের হার এক বিশাল ভূমিকা রাখত। আশির দশকের আমেরিকায় তখন সুদের হার ২০ শতাংশ পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল; কিন্তু জাপানে তা ছিল মাত্র ৬ থেকে ৭ শতাংশ । এর কারণ ছিল, জাপানের ব্যাংকগুলোর বিশাল আকারের সঞ্চয়ী আমানত এবং তারা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে দ্বিধা করতো না। এমনকি কোম্পানিগুলো লোকসানে চললেও, ব্যাংকগুলো তাদের সহজে ডুবতে দিত না, বরং আরও ঋণ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখত।

এই সস্তা মূলধন হাতে পেয়ে জাপানি কোম্পানিগুলো নতুন নতুন কারখানা নির্মাণ ও উৎপাদন বাড়াতে থাকে। হিটাচি, তোশিবা, এনইসি- সবাই বিপুল বিনিয়োগ করল। ১৯৮৫ সালে, বিশ্বব্যাপী চিপ খাতে যে মূলধন ব্যয় হয়েছিল, তার ৪৬ শতাংশ ছিল জাপানের, আর ৩৫ শতাংশ ছিল আমেরিকার। ১৯৯০ সালের মধ্যে জাপানের মূলধন ব্যয় ৫০ শতাংশ পেরিয়ে যায়। কঠিন প্রতিযোগিতার কারণে লাভ কম হলেও জাপানি কোম্পানিগুলো উৎপাদন বাড়ানো ও খরচ কমানো অব্যাহত রেখেছিল- তারা আমেরিকানদের চেয়ে বেশি সময় ধরে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারত।

এভাবে একসময় সিলিকন ভ্যালির গর্ব DRAM-এর বাজার খুব দ্রুতই পুরোপুরি জাপানের হাতে চলে যায়। 64K DRAM বাজারে আনার মাত্র ৫ বছরের মধ্যেই ইন্টেলের মার্কেট শেয়ার নেমে আসে মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশে। এর বিপরীতে জাপানি কোম্পানিগুলো দুর্বার গতিতে মার্কেট শেয়ারের দখল নিয়ে নেয়। এই সময়েও জাপানের কোম্পানিগুলোও নিজেদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা করত- কিন্তু ব্যাংক থেকে অনায়াসে সস্তা ঋণ পাওয়ার সুবিধার কারণে তারা টিকে যায়। আর এই অসহনীয় চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেক আমেরিকান কোম্পানি বাজার থেকে ছিটকে পড়ে।

জাপানি কোম্পানিগুলো বাজারে অন্যায্য আচরণ করছে- এমন অভিযোগ নাকচ করে দিত। তাদের দাবি ছিল- তাদের চিপের গুণগত মান ছিল উন্নত, দাম ছিল কম, তাই আমেরিকান কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তারা সহজেই ভালো করেছিল। তবুও অনেক আমেরিকানের কাছে এ যেন যুদ্ধে হারার শামিল। জাপানের সাথে আমেরিকার এই যুদ্ধটা ছিল অর্থনীতির, কিন্তু সিলিকন ভ্যালির যারা এই চিপ শিল্পকে গড়ে তুলেছিলেন, তাদের জন্য এ ছিল ব্যক্তিগতভাবে খুবই কষ্টদায়ক।

(ক্রিস মিলারের সাড়া জাগানো বই ‘চিপ ওয়ার’-এর ১৬তম অধ্যায় (‘অ্যাট ওয়ার উইথ জাপান’) থেকে পরিবর্তিত ও সংক্ষেপিত অনুলিখন)


লেখক পরিচিতি:
মাহমুদ হোসেন, বুয়েটের একজন স্নাতক, বাংলাদেশের টেলিকম ও আইসিটি খাতে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশের মোবাইল প্রযুক্তি প্রচলনের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বিটিআরসির কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, এর আগে তিনি বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন পদে কর্মরত ছিলেন।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ