বগুড়ায় স্কুল শিক্ষার্থীদের ডেকে নেওয়া হয় ফেস ভেরিফিকেশন, পাচার করা হচ্ছে কী তথ্য?
নির্জন এলাকা। চারপাশে বাঁশবাগান ও নানা ধরনের গাছপালা। সেখানে মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে। পূর্ব দিকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে করতোয়া নদী। দক্ষিণে আধা কিলোমিটার দূরে একটি গ্রাম, আর উত্তরে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে আরেকটি গ্রাম। মাঝখানে কৃষিজমির দিকে যাওয়া একটি নির্জন পথ।
সেই পথের পাশে পরিত্যক্ত একটি মুরগির খামার। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে কারও আসা-যাওয়া নেই। এই খামারটি বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার রহিমাবাদ এলাকায় অবস্থিত।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, গত কয়েক মাস ধরে ওই খামারে প্রায় প্রতিদিনই স্কুল পোশাক পরা শিক্ষার্থীদের আসা-যাওয়া চলছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার মহিপুর কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯ শিক্ষার্থীকে ডেকে নয়ে ওই পরিত্যক্ত খামারে আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে।
কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক ওই খামারে গিয়ে তাদের নিয়ে আসেন। এ ঘটনার রাতেই এক শিক্ষার্থীর বাবা শেরপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাত অভিযুক্ত করা আরও চার-পাঁচজনকে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ওই খামার শুধু গত ২১ সেপ্টেম্বরই নয়, গত তিন মাস ধরে সেখানে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসা হয়। স্কুলশিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষকে ওই খামারে নিয়ে আসা হয়। সেখানে অল্প সময়ের ভিডিও ধারণ ও মুখের ছবি নিয়ে (ফেস ভেরিফিকেশন) করা হয়। এ কাজের বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের ১০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। তবে তাদের নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা মাথাপিছু ৫০০ টাকা পান। সেই টাকা থেকেই নিয়ে আসা শিক্ষার্থীদের টাকা দেওয়া হয়।
বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার রহিমাবাদ এলাকার ওই পরিত্যক্ত খামারটির আশপাশে বসতি খুবই কম। কৃষকেরা জমিতে যাতায়াতের সময় খামারটির পাশ দিয়ে চলাচল করেন।
স্থানীয় কয়েকজন কৃষক জানান, প্রায় প্রতিদিনই বিকেলের দিকে স্কুল পোশাক পরা শিক্ষার্থীদের সেখানে দেখা যায়। তারা একসঙ্গে কয়েকজন করে আসে। সাধারণত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা অবস্থান করার পর তারা চলে যায়।
শাজাহানপুরের বামুনিয়া মণ্ডলপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, প্রায় প্রতিদিন বিকেলে ওই খামারে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসতে দেখা যায়।
ওই উপজেলার কাটাবাড়িয়া মধ্যপাড়া গ্রামের কৃষক শাহিনুল ইসলাম বলেন, নিয়মিতই স্কুল পোশাক পরা শিক্ষার্থীদের ওই খামারে আসতে দেখা যায়। তবে তার নজরে কোনো মেয়ে শিক্ষার্থী পড়েনি। সেখানে আসা শিক্ষার্থীদের অধিকাংশের বয়স ১২ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২১ সেপ্টেম্বর সকালে শেরপুরের মহিপুর কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৯ শিক্ষার্থীকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের শাজাহানপুর উপজেলার রহিমাবাদ এলাকার ওই পরিত্যক্ত খামারে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে তারা খামার থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের পা কেটে নেওয়ার ভয় দেখানো হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সেখানে শিক্ষার্থীদের ছবি তোলা এবং ফেস ভেরিফিকেশন করা হয়। পরে কয়েকজন অভিভাবক ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের সেখান থেকে নিয়ে আসেন।
ওই ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে আশিক আহমেদ নামে মহিপুর কলেনী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর নামও রয়েছে।
আশিক আহমেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত সোমবারই প্রথম নয়, এর আগেও সে শিক্ষার্থীদের ওই খামারে নিয়ে গেছে।
আশিক জানায়, এই ঘটনার ১০ থেকে ১২ দিন আগে সে আরও আটজনকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল। শাজাহানপুরের রহিমাবাদ এলাকার বাসিন্দা সাব্বির তাকে শিক্ষার্থী নিয়ে যেতে বলতেন। এর বিনিময়ে সে টাকাও পেত।
আশিক বলেন, সেখানে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের অল্প সময়ের ভিডিও করা হয় এবং ফেস ভেরিফিকেশন করা হয়। এ কাজের বিনিময়ে সাব্বির তাকে টাকা দেন। পরে সেই টাকা থেকে শিক্ষার্থীদেরও কিছু টাকা দেওয়া হয়।
আশিক আরও বলে, প্রায় দুই মাস আগে তাকেও তার এক বন্ধু ওই জায়গায় নিয়ে যায়। এরপর থেকে সে অন্য শিক্ষার্থীদের সেখানে নিয়ে যেতে শুরু করে।
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত কিশোর মোতালেব ও হাসান মাহমুদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যায়। তবে জানা গেছে, তারাও সাব্বিরের মাধ্যমে ব্যবহার হয়েছেন।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিত্যক্ত ওই মুরগির খামারটি সাব্বির নামে এক যুবক মালিকের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছেন। প্রায় এক বছর আগে তিনি খামারটি ভাড়া নেন। এরপর কয়েকবার সেখানে মুরগি তোলা হলেও পরে খামারটি আর চালু হয়নি।
তবে গত প্রায় তিন মাস ধরে সেখানে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে।
সাব্বির হাসান রাকিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, প্রায় তিন মাস ধরে একটি অ্যাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের ফেস ভেরিফিকেশন করাচ্ছেন তিনি।
সাব্বিরের দাবি, প্রতিটি ফেস ভেরিফিকেশনের জন্য তিনি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত পান। আর যারা লোকজনকে সেখানে নিয়ে আসেন, তাদের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়।
ফেস ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে কী করা হয়-জানতে চাইলে সাব্বির বলেন, ‘বিগপে’ নামের একটি অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইনে ফেস ভেরিফিকেশন করে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। এসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে দেশের বাইরে থেকে অনলাইনে কেনাকাটা করা হয়।
সাব্বির বলেন, তিনি অনলাইনেই এ কাজের বিজ্ঞাপন দেখেন। এরপর ওই কাজ শুরু করেন। তার কাছে বিভিন্ন বয়সী মানুষকে নিয়ে আসা হয় এবং তাদের ফেস ভেরিফিকেশন করা হয়। এর বিনিময়ে তিনি ডলার পান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শেরপুর থানা পুলিশের অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) এসএম মঈনুদ্দিন বলেন, বিষযটি আমার গুরুত্বের সাথে দেখছি। তদন্ত করে অপরাধীদের সনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
জানতে চাইলে বগুড়ার আইটি বিশেষজ্ঞ মিল্লাত চৌধুরী জানান, এই ধরণের বায়োমেট্রিক তথ্য এখন ডীপ ওয়েব ও ডার্ক ওয়েবে বিক্রি হচ্ছে। এসব দিয়ে ভুয়া পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ অনেক অপরাধ করা সম্ভব। এই শিশুদের তথ্য কোনভাবে সাইবার অপরাধীদের হাতে গেলে বড় ধরনের ঝুকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মতামত দিন