Views Bangladesh Logo

সাম্বার নাচে ভাইকিং বাধা, ইংলিশ চ্যানেলে উঠবে মেক্সিকান ওয়েভ

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কিছু রাত শুধু ফুটবল নয়, ইতিহাসও লিখে। আজ তেমনই এক রাত। বাংলাদেশ সময় আজ ভোর ২টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ও ইউরোপের উদীয়মান শক্তি নরওয়ে। আর আগামীকাল সকাল ৬টায় মেক্সিকো সিটির কিংবদন্তি আজতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক মেক্সিকো লড়বে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। একদিকে সাম্বার নান্দনিকতা থামাতে চাইবে ভাইকিংরা, অন্যদিকে মেক্সিকান ওয়েভের গর্জনের সামনে নিজেদের ঐতিহ্য রক্ষা করতে নামবে ইংলিশরা। দুটি ম্যাচের পটভূমি ভিন্ন, কিন্তু লক্ষ্য এক—কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট।

নিউজার্সির লড়াইয়ে ব্রাজিলই কাগজে-কলমে এগিয়ে। কার্লো আনচেলত্তির দল বলের দখল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করার দর্শনে বিশ্বাসী। তবে মাঝমাঠে লুকাস পাকেতার অনুপস্থিতি তাদের পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছে। তাই ব্রুনো গুইমারেস ও কাসেমিরোর ওপরই থাকবে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব। সামনে ম্যাথিউস কুনহা আক্রমণের সেতুবন্ধন তৈরি করবেন, আর বাম প্রান্তে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গতি ও ড্রিবলিং হবে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ভিনিসিয়ুস যদি এক-অন-এক লড়াইয়ে নরওয়ের রক্ষণকে ভাঙতে পারেন, তাহলে এন্ড্রিকের জন্য গোলের সুযোগ তৈরি হবে বারবার। প্রয়োজন হলে দ্বিতীয়ার্ধে নেইমার কিংবা রাফিনহার অভিজ্ঞতাও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

কিন্তু নরওয়েকে হারানো এত সহজ হবে না। স্টালে সোলবাকেনের দল জানে, ব্রাজিলের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় বলের দখল ধরে রাখা কঠিন। তাই তারা অপেক্ষা করবে সঠিক মুহূর্তের। সেই মুহূর্তকে কাজে লাগানোর জন্য আছেন আর্লিং হলান্ড। বিশ্বের অন্যতম সেরা এই স্ট্রাইকারের হয়তো বেশি স্পর্শের প্রয়োজন হবে না; একটি নিখুঁত পাস কিংবা একটি ক্রসই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। মাঝমাঠে মার্টিন ওডেগার্ডের সৃজনশীলতা, দুই পাশে আলেকজান্ডার সরলোথ ও আন্তোনিও নুসার গতি নরওয়ের পাল্টা আক্রমণকে ভয়ংকর করে তুলবে। বিশেষ করে কর্নার ও ফ্রি-কিক থেকে তাদের উচ্চতার সুবিধা ব্রাজিলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তারপরও অভিজ্ঞতা, স্কোয়াডের গভীরতা এবং আক্রমণের বৈচিত্র্যের কারণে ব্রাজিলকেই এগিয়ে রাখছেন ফুটবল বিশ্লেষকেরা। তবে শর্ত একটাই—হলান্ডের কাছে বল পৌঁছানোর পথ বন্ধ করতে হবে এবং ওডেগার্ডকে সময় দেওয়া যাবে না। যদি তা সম্ভব হয়, তাহলে সাম্বার ছন্দেই কোয়ার্টার ফাইনালের পথে এগিয়ে যেতে পারে সেলেসাও। আর যদি নরওয়ে দ্রুত ট্রানজিশন ও সেট-পিস কাজে লাগাতে পারে, তাহলে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটনের একটি দেখতেও প্রস্তুত থাকতে হবে ফুটবল বিশ্বকে।

অন্যদিকে আজতেকা স্টেডিয়ামের ম্যাচটি শুধু ইংল্যান্ড বনাম মেক্সিকো নয়; এটি প্রকৃতি, আবেগ এবং মানসিক দৃঢ়তারও পরীক্ষা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই স্টেডিয়ামের পাতলা বাতাস, প্রায় এক লাখ দর্শকের গর্জন এবং ঘরের মাঠের আবহ স্বাগতিকদের বড় শক্তি। এই পরিবেশে প্রতিপক্ষের জন্য ছন্দ ধরে রাখা সহজ নয়।

টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড বলের দখল ধরে রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। ডেকলান রাইস ও জুড বেলিংহ্যাম মাঝমাঠে ভারসাম্য রক্ষা করবেন, আর সামনে হ্যারি কেইন গোল করার পাশাপাশি আক্রমণ গড়ে তোলার ভূমিকাও পালন করবেন। কিন্তু উচ্চতার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া এবং স্বাগতিক দর্শকদের চাপ সামলানোই হবে ইংলিশদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

মেক্সিকো অবশ্য নিজেদের পরিচিত আক্রমণাত্মক ফুটবলই খেলতে চাইবে। মাঝমাঠে বল কেড়ে দ্রুত উইং ব্যবহার করে আক্রমণে উঠবে তারা। হুলিয়ান কিনোনিয়েসের গতি, সান্তিয়াগো হিমেনেসের বক্সে উপস্থিতি এবং আলেক্সিস ভেগার সৃজনশীলতা ইংল্যান্ডের রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারে। ম্যাচ যত গড়াবে, আজতেকার গ্যালারিও তত বড় অস্ত্র হয়ে উঠবে স্বাগতিকদের জন্য। ইংল্যান্ড যদি শুরুতেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে কিংবা কেইনকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে মেক্সিকোর রক্ষণ, তাহলে স্বাগতিকদের জয় মোটেও অপ্রত্যাশিত হবে না।

শেষ পর্যন্ত এই রাত হয়তো শুধু দুটি কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট নির্ধারণ করবে না; এটি দেখাবে আধুনিক ফুটবলে শুধু তারকা নয়, কৌশল, পরিবেশ, মানসিক শক্তি এবং মুহূর্তকে কাজে লাগানোর দক্ষতাই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয়। নিউজার্সিতে সাম্বা টিকে থাকবে, নাকি ভাইকিংদের শক্তিতে থেমে যাবে—আর আজতেকায় মেক্সিকান ওয়েভ ইংলিশদের ভাসিয়ে দেবে, নাকি ইংল্যান্ড অভিজ্ঞতার জোরে সেই ঢেউ সামলে নেবে—এই দুই প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী কয়েক ঘণ্টাতেই।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ