Views Bangladesh Logo

পঞ্চগড়ে পচা মরিচের প্রকাশ্য বেচাকেনা, স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ভোক্তারা

Masum   Hossain

মাসুম হোসেন

ভোরের আলো ফোটার আগেই বসে যায় মরিচের হাট। একপাশে স্তূপ করা ভালো মানের শুকনো মরিচের বস্তা, আরেক পাশে জমে থাকে পচা মরিচের গাদা। আলো ফুটতেই পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার কালীগঞ্জ হাট জমে ওঠে ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে। দূরদূরান্তের ব্যবসায়ীরা এসে দরদাম করে কেনেন শুকনো মরিচ, আর সকাল ৯টা পেরোতেই মোটামুটি শেষ হয়ে যায় হাটের বেচাকেনা। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই হাটেই প্রকাশ্যে বিক্রি হয় পচা শুকনো মরিচ, যার চাহিদাও কম নয়, আর এতেই স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন সাধারণ ভোক্তারা।

ব্যবসায়ীরা জানান, কালীগঞ্জ হাটে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ ট্রাক মরিচ বেচাকেনা হয়, যার বাজারমূল্য ট্রাকপ্রতি প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা। বগুড়া, নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর ও গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন এই হাটে মরিচ কিনতে।

মরিচ ব্যবসায়ী মতিয়ার রহমান জানান, সপ্তাহে দুদিন (রোববার ও বৃহস্পতিবার) বসে কালীগঞ্জ হাট। তাঁর ভাষ্যে, সাম্প্রতিক সময়ে বেচাকেনা কিছুটা কমেছে, কারণ মরিচের দর ওঠানামার ওপরই নির্ভর করে বিক্রি কেমন হবে।

শুধু ভালো মানের মরিচ নয়, কালীগঞ্জসহ জেলার প্রায় সব হাটেই সমানতালে চলে পচা শুকনো মরিচের কারবার। কম দামে হাজার হাজার কেজি এমন মরিচ কিনে নেন একশ্রেণির ব্যবসায়ী, যা পরে চলে যায় মরিচের গুঁড়া তৈরির কারখানায়। সেখানে ক্ষতিকর রং মিশিয়ে গুঁড়া বানিয়ে তা বাজারজাত করা হয় বলে জানা গেছে।

রোববার (১৬ আগস্ট) ভোরে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, বছরের পর বছর ধরে এই হাটে চলছে পচা শুকনো মরিচের বেচাকেনা। চাহিদা কম না থাকায় দামও তুলনামূলক চড়া। বর্তমান বাজারদরে এই মরিচ বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ছয় হাজার থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকায়। এর বিপরীতে উন্নতমানের দেশি মরিচের দাম প্রতি মণ ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা, যা মান ও জাতভেদে ওঠানামা করে। দামের এই বড় ব্যবধানের কারণেই সস্তায় পচা মরিচ কিনে নেন ব্যবসায়ীরা, পরে যা গুঁড়া করে বাজারে ছাড়া হয়।

এ বিষয়ে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক সাদিয়া আফরিন বলেন, ছত্রাকধরা বা পচা মরিচ দিয়ে গুঁড়া তৈরি করা হলে ছত্রাকের জীবাণু ও পচনজাত ক্ষতিকর উপাদান তাতে মিশে যায়। রং দিয়ে সেই গুঁড়া লাল দেখানো হলেও, তাতে ফুড কালারের বদলে বিষাক্ত শিল্প রং ব্যবহৃত হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ে। লিভার ও পাকস্থলীর ক্ষতি, হজমপ্রক্রিয়ায় সমস্যা এমনকি দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকিও থেকে যায় বলে জানান তিনি।

অভিযোগ আছে, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন সময়ে সময়ে মরিচের গুঁড়া তৈরির কারখানায় অভিযান চালালেও, হাটে পচা মরিচ বেচাকেনার ওপর তেমন কোনো নজরদারি নেই। ফলে প্রকাশ্যেই অবাধে চলছে এই কারবার।

এ প্রসঙ্গে পঞ্চগড়ের জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা জয় চন্দ্র রায়ের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পঞ্চগড় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এ এস এম মাসুম-উদ-দৌলার নম্বরেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

কালীগঞ্জ হাটের কয়েকজন মরিচ ব্যবসায়ীর মতে, সমস্যার সমাধান করতে হলে হাট থেকেই পচা শুকনো মরিচের বেচাকেনা বন্ধ করা জরুরি। শুধু গুঁড়া তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়ে প্রকৃত সুফল মিলবে না—তাদের ভাষায়, এসব অভিযান স্রেফ লোক দেখানো।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বোদা উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রবিউল ইসলাম ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, কালীগঞ্জ হাটে পচা মরিচ বিক্রির বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ