Views Bangladesh Logo

ট্রফির ওপারে এক কিংবদন্তির গল্প

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জয়, যন্ত্রণা এবং অমরত্ব

Anjan Kar

অঞ্জন কর

ফুটবল মাঠে জয়ের জন্য যা যা অর্জন করা সম্ভব, তার প্রায় সবই নিজের করে নিয়েছেন তিনি। ব্যক্তিগত পুরস্কার, ক্লাব ফুটবলের অসংখ্য শিরোপা, গোলের পর গোল আর রেকর্ডের পর রেকর্ড; সবকিছুর শীর্ষেই জ্বলজ্বল করছে তার নাম। তবু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর গল্প শুধু ট্রফি কিংবা পরিসংখ্যানের গল্প নয়।

পর্তুগালের মাদেইরার এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা সেই ছেলেটির জীবন ছিল দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট, ত্যাগ আর নিরন্তর সংগ্রামে ভরা। প্রতিভার সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম, অদম্য মানসিকতা আর কখনো হার না মানা জেদই তাকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন ফুটবলের অন্যতম প্রধান মুখ, অনুপ্রেরণা এবং সাফল্যের প্রতীক। তবে এত অর্জনের পরও তার ক্যারিয়ারে একটি অপূর্ণতা থেকেই গেছে; বিশ্বকাপ ট্রফি। বহুবার চেষ্টা করেও ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত শিরোপাটি ছুঁয়ে দেখা হয়নি তার। সেই অপূর্ণতাই যেন তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের একমাত্র না-পাওয়া হয়ে রয়ে গেল।

এই প্রতিবেদনে উঠে আসবে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পুরো যাত্রাপথ; মাদেইরার ছোট্ট দ্বীপ থেকে বিশ্বজয়ের গল্প, সংগ্রাম, সাফল্য, রেকর্ড, অশ্রু, বিতর্ক এবং শেষ পর্যন্ত এক কিংবদন্তির উত্তরাধিকার।

শৈশব: দারিদ্র্য, প্রতিকূলতা আর স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার গল্প

১৯৮৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্তুগালের মাদেইরা দ্বীপের ফুনশাল শহরের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো দস সান্তোস আভেইরো। বাবা জোসে দিনিস আভেইরো ছিলেন স্থানীয় ক্লাব আন্দোরিনিয়ার কিট ম্যান, আর মা মারিয়া দোলোরেস দস সান্তোস আভেইরো জীবিকা নির্বাহ করতেন রাঁধুনি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে। চার ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট রোনালদোর শৈশব কেটেছে ফুনশালের সান্তো আন্তোনিও এলাকার একটি সাধারণ বাড়িতে, যেখানে আর্থিক সংকট ছিল নিত্যসঙ্গী। পরে নিজের আত্মজীবনীতে তার মা উল্লেখ করেন, চরম দারিদ্র্যের কারণে তিনি একসময় গর্ভপাতের কথাও ভেবেছিলেন। সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই বড় হতে থাকে ভবিষ্যতের এই ফুটবল কিংবদন্তি।

রোনালদোর জীবনে পারিবারিক সংগ্রামও ছিল গভীর। তার বাবা দীর্ঘদিন মদ্যপানের সমস্যায় ভুগেছেন এবং ২০০৫ সালে, রোনালদোর বয়স যখন মাত্র ২০, তখন তিনি মারা যান। পরিবারের এই সংকট, অর্থকষ্ট এবং অনিশ্চয়তা কখনোই রোনালদোর স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। বরং ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ছিল তার মুক্তির পথ। দিনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি কাটাতেন পাড়ার রাস্তায় বা খোলা মাঠে বল পায়ে। সেই অদম্য ভালোবাসা, কঠোর পরিশ্রম এবং কখনো হার না মানার মানসিকতাই একদিন মাদেইরার দরিদ্র মহল্লার সেই বালককে বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত করে।

শৈশবের সংগ্রাম: মাদেইরার গলি থেকে স্বপ্নের উড়ান

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ফুটবলে হাতেখড়ি হয় বাবা জোসে দিনিস আভেইরোর হাত ধরে। মাত্র সাত বছর বয়সে মাদেইরার ছোট্ট ক্লাব আন্দোরিনিয়ায় খেলতে শুরু করেন তিনি। পরে যোগ দেন নাসিওনাল ক্লাবে, যেখানে অসাধারণ প্রতিভা ও গোল করার ক্ষমতা দ্রুতই নজর কেড়ে নেয় পর্তুগালের অন্যতম সেরা ক্লাব স্পোর্টিং সিপির স্কাউটদের। ১৯৯৭ সালে, মাত্র ১২ বছর বয়সে, তিন দিনের ট্রায়ালে নিজেকে প্রমাণ করে প্রায় দেড় হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে স্পোর্টিংয়ের একাডেমিতে যোগ দেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্নের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। পরিবার ছেড়ে একা লিসবনে চলে আসা; নতুন শহর, ভিন্ন উচ্চারণের কারণে সহপাঠীদের বিদ্রূপ আর তীব্র হোমসিকনেস সবকিছুই কাঁধে নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছিল কিশোর রোনালদোকে।

সংগ্রাম সেখানেই শেষ হয়নি। ১৪ বছর বয়সে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে শিক্ষককে চেয়ার ছুড়ে মারার ঘটনার পর স্কুল ছেড়ে পুরোপুরি ফুটবলেই মনোযোগ দেন তিনি। এর কিছুদিন পর ১৫ বছর বয়সে তার হৃদযন্ত্রে ট্যাকিকার্ডিয়া ধরা পড়ে, যা ক্যারিয়ারের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারত। তবে অস্ত্রোপচারের পর অল্প সময়ের মধ্যেই মাঠে ফিরে আসেন তিনি। শৈশবের দারিদ্র্য, পারিবারিক টানাপোড়েন, নিঃসঙ্গতা আর শারীরিক প্রতিকূলতা—প্রতিটি বাধাকে জেদ ও কঠোর পরিশ্রম দিয়ে জয় করেই মাদেইরার সেই কিশোর একদিন বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অমর হয়ে ওঠেন।

পেশাদার ফুটবলে অভিষেক: স্পোর্টিং সিপি থেকে ওল্ড ট্র্যাফোর্ড

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পেশাদার ফুটবলের পথচলা শুরু হয় পর্তুগালের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব স্পোর্টিং সিপি থেকে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ক্লাবটির যুব একাডেমিতে নিজেকে শাণিত করার পর ২০০২ সালের আগস্টে মূল দলে অভিষেক হয় তার। প্রথম মৌসুমেই তিনি মিডফিল্ড ও আক্রমণভাগের বিভিন্ন পজিশনে খেলে নিজের অসাধারণ গতি, ড্রিবলিং ও সৃজনশীলতার ছাপ রাখেন। সেই সময় ইউরোপের অনেক বড় ক্লাবই এই কিশোর ফুটবলারের দিকে নজর দিতে শুরু করে।

রোনালদোর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ২০০৩ সালের আগস্টে স্পোর্টিং সিপি ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মধ্যকার উদ্বোধনী প্রীতি ম্যাচ। লিসবনের নতুন জোসে আলভালাদে স্টেডিয়ামের সেই ম্যাচে ইউনাইটেডের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারদের একের পর এক পরাস্ত করে তিনি এমন পারফরম্যান্স দেখান যে, ম্যাচ শেষে ইউনাইটেডের খেলোয়াড়রাই স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনকে তাকে দলে নেওয়ার অনুরোধ করেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই প্রায় ১২.২৪ মিলিয়ন পাউন্ডে তাকে দলে ভিড়িয়ে নেয় ইংলিশ ক্লাবটি। সে সময় এটি ছিল একজন কিশোর ফুটবলারের জন্য ইংল্যান্ডের ইতিহাসে অন্যতম বড় ট্রান্সফার।

১৮ বছর বয়সে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে এসে কিংবদন্তি স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের অধীনে শুরু হয় তার প্রকৃত রূপান্তর। শুরুর দিকে দৃষ্টিনন্দন ড্রিবলিংয়ের জন্য প্রশংসা পেলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গোল করার ধারাবাহিকতা নিয়ে সমালোচনা ছিল। ফার্গুসনের নিবিড় তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে পরিণত করেন আরও কার্যকর, পরিণত এবং বিধ্বংসী আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ে। ২০০৬-০৭ মৌসুম থেকে শুরু হয় তার আধিপত্য। আর ২০০৭-০৮ মৌসুমে তিনি ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় কাটান। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪২ গোল করে জেতেন ইউরোপীয় গোল্ডেন বুট, ক্যারিয়ারের প্রথম ব্যালন ডি'অর এবং ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি। একই মৌসুমে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে জেতান প্রিমিয়ার লিগ ও উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা।

ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে প্রথম অধ্যায়ে রোনালদো ২৯২ ম্যাচে ১১৮ গোল করেন। এই সময় তিনি ক্লাবটির হয়ে জেতেন তিনটি প্রিমিয়ার লিগ, একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, একটি এফএ কাপ, দুটি লিগ কাপ, একটি কমিউনিটি শিল্ড এবং একটি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ। ইউনাইটেডেই তিনি প্রতিভাবান এক তরুণ থেকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত হন। ২০০৯ সালে তৎকালীন বিশ্বরেকর্ড প্রায় ৮০ মিলিয়ন পাউন্ড ট্রান্সফার ফিতে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়ে শুরু হয় তার ক্যারিয়ারের আরেকটি কিংবদন্তি অধ্যায়।

রিয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্টাস: সাফল্যের স্বর্ণযুগ


২০০৯ সালে তৎকালীন বিশ্বরেকর্ড প্রায় ৯৪ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফিতে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। এরপরই শুরু হয় তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। নয় মৌসুমে ৪৩৮ ম্যাচে ৪৫০ গোল করে তিনি ক্লাবটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতায় পরিণত হন। তার নেতৃত্বে রিয়াল জেতে চারটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, যার মধ্যে ২০১৪ সালে আসে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘লা দেসিমা’ বা দশম ইউরোপীয় শিরোপা। এছাড়া দুটি লা লিগা, তিনটি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ, দুটি কোপা দেল রে ও তিনটি উয়েফা সুপার কাপ জেতেন তিনি। এই সময়ে ২০১৩, ২০১৪, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে জেতেন চারটি ব্যালন ডি'অর।

২০১৮ সালে নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে ইতালিয়ান ক্লাব জুভেন্টাসে যোগ দেন রোনালদো। সেখানেও নিজের গোল করার ধারাবাহিকতা ধরে রেখে ১৩৪ ম্যাচে ১০১ গোল করেন। জুভেন্টাসের হয়ে দুটি সিরি আ, একটি ইতালিয়ান কাপ ও দুটি ইতালিয়ান সুপার কাপ জেতার পাশাপাশি ২০২০-২১ মৌসুমে সিরি আ'র সর্বোচ্চ গোলদাতাও হন তিনি। ২০২১ সালে দ্বিতীয় দফায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে ফিরে গেলেও রিয়াল মাদ্রিদে কাটানো সময়টিই তার ক্লাব ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

আন্তর্জাতিক ফুটবল: ইউরো জয়ে ঘুচল সংশয়

ক্লাব ফুটবলে একের পর এক সাফল্য পেলেও দীর্ঘদিন সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল; পর্তুগালের হয়ে বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা কোথায়? ২০১৬ সালে সেই প্রশ্নের জবাব দেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তার নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো উয়েফা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (ইউরো) জেতে পর্তুগাল। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে চোট পেয়ে প্রথমার্ধেই মাঠ ছাড়তে হলেও সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে এডারের গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে ইতিহাস গড়ে পর্তুগাল।

ইউরো ২০১৬–এর পর ২০১৯ সালে উয়েফা নেশনস লিগ জিতেও দেশের ফুটবলে নতুন অধ্যায় রচনা করেন রোনালদো। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তিনিই ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং পর্তুগালের হয়ে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার। দুই দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের নেতৃত্ব দিয়ে অসংখ্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি। যদিও বিশ্বকাপ ট্রফি অধরাই থেকে গেছে, তবু আন্তর্জাতিক ফুটবলে রোনালদোর অবদান ও উত্তরাধিকার নিঃসন্দেহে সর্বকালের অন্যতম সেরা।

আল নাসর অধ্যায়: নতুন দিগন্ত, শেষ বেলাতেও অপ্রতিরোধ্য

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরে যোগ দিয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো শুধু নিজের ক্যারিয়ারেই নয়, বিশ্ব ফুটবলের অর্থনীতিতেও নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। তার আগমনের পর ইউরোপের একের পর এক তারকা সৌদি প্রো লিগে পাড়ি জমান, ফলে লিগটির বৈশ্বিক পরিচিতি ও বাণিজ্যিক মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। আল নাসরের জার্সিতেও ধারাবাহিকভাবে গোল করে নিজের ফিটনেস ও সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে চলেছেন পর্তুগিজ এই মহাতারকা।

৪১ বছর বয়সেও রোনালদো বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ও প্রভাবশালী ক্রীড়াবিদ। ২০২৬ সালে ফোর্বসের বিলিয়নিয়ার তালিকায় প্রথমবারের মতো জায়গা করে নেন তিনি, যেখানে তার আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মাঠের বাইরেও তার জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া—বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মিলিয়ে তার অনুসারীর সংখ্যা ১০০ কোটিরও বেশি, যা তাকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করা ব্যক্তিত্বদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

রেকর্ডের সম্রাট: সংখ্যাতেই যার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ


ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর অর্জনের তালিকা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সমৃদ্ধ। পাঁচবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই মহাতারকা জিতেছেন পাঁচটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, চারটি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ, সাতটি শীর্ষস্থানীয় লিগ শিরোপা (ইংল্যান্ড, স্পেন ও ইতালি মিলিয়ে), একটি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (ইউরো ২০১৬) এবং একটি উয়েফা নেশনস লিগ। এছাড়া চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বোচ্চ ম্যাচজয়ী খেলোয়াড়দের অন্যতম হিসেবেও তার নাম ইতিহাসে লেখা রয়েছে।

ব্যক্তিগত রেকর্ডের দিক থেকেও রোনালদো এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন। পেশাদার ফুটবলের ইতিহাসে সর্বাধিক গোলের মালিক তিনি এবং ক্যারিয়ারে এক হাজার গোলের মাইলফলকের দিকে এগিয়ে চলেছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতাও তিনি। এছাড়া বিশ্বকাপ ইতিহাসে টানা ছয়টি ভিন্ন আসরে (২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬) গোল করা একমাত্র ফুটবলার হিসেবে গড়েছেন অনন্য কীর্তি। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করে তিনি নিজেকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

অধরা বিশ্বকাপ শিরোপা: একমাত্র অপূর্ণতা-আক্ষেপের গল্প 


ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে অসংখ্য শিরোপা জিতলেও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ক্যারিয়ারে একটি আক্ষেপ আজীবন থেকে গেছে; ফিফা বিশ্বকাপ। ২০০৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত টানা ছয়টি বিশ্বকাপে পর্তুগালের জার্সিতে খেলেছেন তিনি। এই সময়ে ২৭ ম্যাচে ১১ গোল করার পাশাপাশি একমাত্র ফুটবলার হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপ আসরে গোল করার ইতিহাস গড়েন। প্রতিটি আসরেই দলকে অনুপ্রাণিত করেছেন নিজের নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও গোল করার সামর্থ্য দিয়ে।

২০২৬ বিশ্বকাপকে ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ হিসেবে ঘোষণা দিয়েই মাঠে নেমেছিলেন রোনালদো। গ্রুপ পর্বে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে আরও একটি অনন্য কীর্তি গড়লেও শেষ পর্যন্ত অধরা থেকে যায় স্বপ্নের ট্রফি। শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল, আর সেখানেই শেষ হয় বিশ্বকাপে রোনালদোর বর্ণাঢ্য অধ্যায়। ফুটবল ইতিহাসের প্রায় সবকিছুই জয় করা এই মহাতারকার ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ ট্রফিটিই শেষ পর্যন্ত একমাত্র অপূর্ণতা হয়ে রয়ে গেল।

বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁতে না পারলেও ফুটবল ইতিহাসে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নাম লেখা থাকবে সোনালি অক্ষরে। মাদেইরার দারিদ্র্য থেকে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ওঠা তার এই যাত্রা শুধু গোল আর ট্রফির গল্প নয়; এটি অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা আর নিজের ওপর অবিচল বিশ্বাসের এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত। ইয়োহান ক্রুফ, ফেরেন্স পুসকাস কিংবা জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের মতো কিংবদন্তিদের কাতারেই এখন তার নাম; যারা বিশ্বকাপ না জিতেও ফুটবল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছেন। 



মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ