বিশেষজ্ঞদের অভিমত
'অধ্যাদেশ বাতিলে গুমের বিচার বাধাগ্রস্ত হবে না'
বিগত অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের জারি করা গুম অধ্যাদেশটি বাতিলের সিদ্ধান্তই একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সংস্কার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, গুমের মতো গুরুতর অপরাধ আগেই বিদ্যমান আইনের আওতায় বিচারযোগ্য ছিল, ফলে আলাদা অধ্যাদেশের প্রয়োজন ছিল না। বিগত অন্তর্বর্তীকালিন সরকার শুধুমাত্র নিজেদের কৃতিত্ব জাহিরের জন্যই এই অধ্যাদেশটি করেছিলো। তাই এটি বাতিলের মাধ্যমে আইনগত জটিলতা কমেছে এবং বিচারব্যবস্থা আরও সুসংগঠিত হবে। পাশাপাশি জাতীয় সংসদে পাশ হওয়া সংশোধিত আইনে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে গুমের ঘটনায় দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা সহজ হবে। পাশাপাশি আইনের দ্বৈততা দূর হয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গুমসংক্রান্ত অধ্যাদেশটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালে জারি করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে গুমের অভিযোগ তদন্ত ও বিচারের জন্য পৃথক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে পরবর্তীতে বর্তমান সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে এবং চলতি বছরের ৭ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালস (সংশোধন) বিল ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাসের মাধ্যমে ওই অধ্যাদেশটি বাতিল করে। সংশোধিত আইনের মাধ্যমে গুমকে সরাসরি ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় এবং ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনেই এর বিচার নিশ্চিত করার পথ উন্মুক্ত করা হয়।
এ ব্যপারে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘গুম অধ্যাদেশের আওতায় যে অপরাধকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, সেটি ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে বিচারযোগ্য ছিল। ফলে একই ধরনের অপরাধের জন্য আলাদা আইন ও ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রয়োজনীয়তা ছিল না। গুমের বিচার বিদ্যমান আইনের মাধ্যমেই সম্ভব হওয়ায় নতুন করে অধ্যাদেশ আনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘একই অপরাধের জন্য একাধিক আইন থাকলে বিচারব্যবস্থায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। গুমের মতো গুরুতর অপরাধকে বিদ্যমান আইনের আওতায় এনে বিচার করাই বেশি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।’ তার মতে, এই একীভূতকরণ বিচারপ্রক্রিয়াকে দ্রুততর করবে এবং অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমাবে। তিনি বলেন, ‘গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াটা একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এর মাধ্যমে শুধু বিচারই নয়, অপরাধের গুরুত্বও স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিচার পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গুমের বিচারের জন্য পৃথক অধ্যাদেশের প্রয়োজন ছিল না, কারণ ট্রাইব্যুনাল আইনে আগেই এ ধরনের অপরাধের বিচার করার সুযোগ ছিল। নতুন সংশোধনের ফলে আইনি কাঠামো আরও সুসংগঠিত হয়েছে ও এর ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে। একইসঙ্গে বিচারব্যবস্থার ওপর জনআস্থা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।’ চিফ প্রসিকিউটরও বলেন, ‘গুম অধ্যাদেশের আওতায় যে অপরাধকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, সেটি ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে বিচারযোগ্য ছিল। ফলে একই ধরনের অপরাধের জন্য আলাদা আইন ও ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রয়োজনীয়তা ছিল না।’ তিনি আরও বলেন, ‘গুম অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে যাওয়ায় এবং গুমের বিষয়টি ট্রাইব্যুনাল আইনের সঙ্গে একীভূত করায় আমি আইনমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এটি শুধু আইনি কাঠামোকে সরল করেছে তা নয়, বরং বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও সমন্বিত করেছে।’
এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘সরকারের লক্ষ্য হলো বিচারব্যবস্থাকে সহজ, কার্যকর ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত করা। গুমের মতো গুরুতর অপরাধ ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় বিচারযোগ্য ছিল, ফলে আলাদা অধ্যাদেশ রাখার যৌক্তিকতা ছিল না। জাতীয় সংসদে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালস (সংশোধন) বিল ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাসের মাধ্যমে ওই গুম অধ্যাদেশটি বাতিল করা হয়েছে এবং সংশোধিত আইনের মাধ্যমে গুমকে সরাসরি ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। গুমের বিচার এখন থেকে ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনেই হবে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করায় বিচারপ্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে বলেই মনে করি।’ একই সঙ্গে এটি আইনের দ্বৈততা দূর করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সংশোধনী বিলটি নিয়ে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন এবং তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। সংশোধনীর মাধ্যমে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের বিচার আরও কঠোরভাবে করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে বিচারব্যবস্থায় দ্বৈততা দূর হবে এবং একটি নির্দিষ্ট আইনের অধীনে সব ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হওয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে