রামিসা নেই: ভেতরটা যেন এক হিমশীতল অন্ধকারে ডুবে আছে
মিরপুরের পপুলার মডেল স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির সেই চেনা শ্রেণিকক্ষটিতে আজ কোনো কোলাহল নেই। বাইরে তপ্ত রোদ, অথচ ঘরের ভেতরটা যেন এক থমথমে, হিমশীতল অন্ধকারে ডুবে আছে। যে বেঞ্চটিতে বসে প্রতিদিন ক্লাসের রোল নম্বর ‘এক’—রামিসা পরম মায়ায় তার বই খাতা মেলতো, সেই কাষ্ঠখণ্ডটি আজ বড় বেশি একা, বড় বেশি স্তব্ধ। প্লে আর কেজিতে দ্বিতীয় হওয়ার পর যে ফুটফুটে মেয়েটি প্রথম শ্রেণিতে নিজের মেধার প্রতিভায় প্রথম হয়েছিল, আজ তার মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ স্কুল থেকে পাওয়া ট্রফিগুলো ঘরের কোণে শোভা পাচ্ছে। ট্রফিগুলো আছে, কিন্তু যার হাসিতে পুরো ঘর আলো হয়ে থাকতো, সেই রামিসা আজ নেই।
গত পরশুদিনও যে বাবা নিজের তিন বছরের পুরোনো, তালি দেওয়া ছেঁড়া স্যান্ডেল জোড়া পায়ে গলিয়ে ভাবতেন—নিজের যাই হোক, সন্তানদেরকে কোনো কষ্ট পেতে দেওয়া যাবে না; সেই বাবা আজ মেয়ের সহপাঠী অবুঝ শিশুদের জড়িয়ে ধরে ডুকরে কাঁদছেন। এক হতভাগা পিতা, যার মুঠোফোনে মেয়ের শত ছবি জমা হয়ে আছে, অথচ রামিসার একটা ছবিও চোখের সামনে মেলে ধরার মতো সাহস তার অবশিষ্ট নেই।
কারণ তার সাত বছরের সেই কলিজার টুকরোটি আজ এক নরপিশাচের লালসার শিকার হয়ে, মস্তকবিহীন লাশ হয়ে ওপারে পাড়ি জমিয়েছে। চিৎকার শুনলেও আমরা চোখ ফিরিয়ে নেই এটাই বড় সমস্যা।
নৃশংসতার সেই কালো মুহূর্তের কথা মনে করে রামিসার মা বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, “আমি একটা চিৎকার শুনেছিলাম, কিন্তু বুঝতে পারিনি সেটা আমার মেয়ের ছিল।” মেয়েটি মাত্র একটি পায়ের জুতো পরে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়েছিল, অন্য জুতোটি পরার সুযোগটুকুও ঘাতক তাকে দেয়নি অথবা টানা হেঁচড়ায় একটি হয়তো খুলে গিয়েছিল। অবুঝ শিশু কিছু বুঝে উঠার আগেই ওত পেতে থাকা অন্ধকার তাকে টেনে হিঁচড়ে জমঘরে নিয়ে গেল। তার চিৎকার শুনেও মা ভেবেছেন হয়তো অন্য কারও, হয়তো পাশের ফ্ল্যাটের অন্য কোনো শিশুর স্বাভাবিক কান্নার আওয়াজ।
আমাদের বর্তমান সমাজটাও কি ঠিক এই মায়ের মতোই এক ভয়ানক ঘোরের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে না? আমরা প্রতিদিন আমাদের চারপাশের অলিতে-গলিতে, ফ্ল্যাটের দেওয়ালে দেওয়ালে কত অন্যায়ের আলামত দেখি, কত শিশুর গুমরে মরা আর্তনাদ আমাদের কানে আসে। কিন্তু আমরা এক অদ্ভুত আত্মকেন্দ্রিকতার চাঁদর মুড়ি দিয়ে ভাবি—‘ওটা তো অন্য কারোর ঘরের কান্না, আমার নিজের সন্তান তো সুরক্ষিত!’ পাশের ফ্ল্যাটে কী ঘটছে, কার ঘরে অন্ধকার নেমে আসছে, তা নিয়ে মাথা না ঘামানোর এই যে ‘ভদ্দরলোক’ সংস্কৃতি, এটাই কি খুনিদের বুকে সবচেয়ে বড় সাহস জোগায় না?
তাহলে কি আমাদের এই রাষ্ট্র, এই সমাজ আজ পুরোপুরি অন্ধ ও বধির হয়ে গেছে? এই অন্ধ সমাজের বন্ধ দরজার ওপাশে আর কত হাজারো রামিসাকে এভাবে বলিদান মঞ্চে যেতে হবে? রক্ত দিয়ে গানিতিক হিসাবকে আর কত হৃষ্টপুষ্ঠ করতে হবে? এই রূঢ় প্রশ্ন আজ দেশের প্রচলিত আইন, স্থবির আদালত আর আমাদের প্রত্যেকের ঘুমিয়ে থাকা বিবেকের কাঠগড়ায় ছুঁড়ে দেওয়া প্রয়োজন।
জ্ঞানপাপী কিছু মানুষ তো হরহামেশাই বলে থাকেন, টিজিং আর ধর্ষণ মেয়েদের পোষাকের কারণেই হয়। রামিসার মতো শত শত ফুল যে কুঁড়িতেই লালসার শিকার হচ্ছে, তাতে পোষাক এর কি কারণ থাকতে পারে? যত দোষ নন্দ ঘোষ এর নোংরা বাজনাও থামাতে হবে।
সামাজিক ব্যর্থতা নাকি তথাকথিত নাগরিকতা
একটি সাত বছরের নিষ্পাপ শিশুর মস্তকবিহীন দেহ আর বাথরুমের মেঝে থেকে উদ্ধার হওয়া খণ্ডিত মাথা—এটি কেবল শিশু ঘাতকের একার পৈশাচিকতা নয়, এটি আসলে আমাদের সামগ্রিক সামাজিক পচনের এক চূড়ান্ত দলিল। আমরা আজ সস্তা ক্ষমতার রাজনীতি, দলবাজি, ব্যক্তিগত স্বার্থ আর ‘কে কী ভাবলো’ তা নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তুলতে ব্যস্ত। কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজেদের দায়টা কোথায়?
যে নাগরিকতা ছোট্ট শিশুর নিরাপত্তা দিতে পারে না তা নিয়ে গর্ব করার কি আছে?
রড সিমেন্টের যে শক্ত দেয়াল ঘাতককে নিঃসংকোচে অপকর্ম করার সুযোগ করে দিচ্ছে এই প্রাচীরের কি দাম আছে।
চাকচিক্যকেই আর লেবাসকেই আমরা আভিজাত্যের নমুনা হিসেবে দেখি, দিন শেষে প্রাপ্তি কি এ অরক্ষিত সমাজ?
আমাদের প্রতিবেশীদের সাথে পারস্পরিক যোগাযোগ, পাড়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আজ পুরোপুরি শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকেছে। আমরা নিজেদের দরজায় দামী সিসিটিভি ক্যামেরা লাগাই বটে, কিন্তু পাশের ঘরের মানুষের বিপদে ঠিকই চোখ ফিরিয়ে নেই। যখন একটা লোক দিনের আলোয় একটি ফ্ল্যাটের দরজা আটকে এমন নৃশংস কাণ্ড ঘটিয়ে দিতে পারে এবং চারপাশের মানুষ দীর্ঘক্ষণ তার টেরই পায় না, তখন বুঝতে হবে আমাদের সামাজিক বন্ধনগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। যে অমানুষ একটা শিশুর জীবন ছিঁড়ে নিতে এক মুহূর্ত দ্বিধাবোধ করেনি, আইনের চোখে তার জন্য কোনো সহানুভূতি বা কালক্ষেপণের সুযোগ থাকতে পারে না। আমরা সামান্য বিষয় নিয়ে কোর্ট-কাচারি করে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিতে পারি, কিন্তু একটা ফুটফুটে শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়ার পর আমাদের কালক্ষেপনের সুযোগ নেই, কঠিন বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন না করলে রামিসারা হারাতেই থাকবে, আমাদের দীর্ঘশ্বাস বাড়তেই থাকবে। এসব জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিচারব্যবস্থা কেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার চাঁদর মুড়ি দিয়ে ঝিমিয়ে থাকবে?
কত স্বপ্ন আর ঝরে যাবে
আমরা যখন টিভির পর্দায় বা পত্রিকার পাতায় নারী ও শিশু নির্যাতনের সংখ্যাগুলো দেখি, তখন সেগুলো আমাদের কাছে কেবলই কিছু প্রাণহীন গাণিতিক পরিসংখ্যান মনে হয়। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, প্রতিটা সংখ্যার পেছনে একটা জীবন্ত নাম ছিল, একটা অপূর্ণ স্বপ্ন ছিল এবং একটি পরিবারের বেঁচে থাকার মূল চালিকাশক্তি ছিল। আমাদের ঘরের ছোট্ট মেয়েটি যখন পিঠে স্কুলব্যাগ ঝুলিয়ে হাসিমুখে ঘর থেকে বের হয়, আমরা কি বুকে হাত দিয়ে নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, সে ঠিক একইভাবে হাসিমুখে ঘরে ফিরবে? এই চিরন্তন ভয়টা কোনো মা-বাবার মনে থাকার কথা ছিল না, কথা থাকতে পারে না। এ ব্যথর্তা আমার, আপনার, এ সমাজের সবার, এ ব্যর্থতা বিচার বিভাগের, এ সীমাবদ্ধতা রাষ্ট্রের।
পরিশেষের কথা
রামিসা আর কোনোদিন তার মায়ের কোলে ফিরে আসবে না, কোনোদিন রোল নম্বর ‘এক’ শুনে তার শিক্ষকের ডাকে সাড়া দেবে না। কিন্তু তার রেখে যাওয়া রক্তের দাগ যদি আজ আমাদের এই ঘুমন্ত সমাজকে চাবুক মেরে জাগিয়ে তুলতে না পারে, তবে আমরাও অপরাধীর সমকক্ষ হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত হয়ে থাকবো।
আজ যারা নিজেদের সুরক্ষিত ঘরের চার দেয়ালের ভেতর বসে এই লেখাটি পড়ছেন, তারা ঘরের কোণে খেলা করতে থাকা নিজের সন্তানের মুখের দিকে একবার তাকান। আজ যদি আমরা পল্লবীর এই নির্মমতার বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে রাস্তায় নেমে ফুঁসে উঠতে না পারি, তবে এই অন্ধ সমাজের বন্ধ দরজার ওপাশে কাল হয়তো অন্য কোনো রামিসার এক চিলতে জুতো জোড়া এভাবেই একা পড়ে থাকবে।
আমরা চাই এই দেশের প্রতিটা কন্যা শিশু, প্রতিটা মেয়ে নিরাপদে বুক ফুলিয়ে বাঁচুক। আর প্রতিটা ধর্ষক ও খুনি সমাজ থেকে নিশ্চিহ্ন হোক—দ্রুত, কঠিন এবং নিশ্চিতভাবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে