Views Bangladesh Logo

অডিটে ‘পছন্দের কর্মকর্তা’, বদলিতে চাপ: ভূমির হিসাব নিয়ন্ত্রককে ঘিরে যত প্রশ্ন

• অনুমোদন ছাড়াই দায়িত্ব বণ্টনের অভিযোগ, একই কর্মকর্তার হাতে একাধিক জেলার অডিট
• আর্থিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টার অভিযোগও তদন্তে
• তদন্তে ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিবের নেতৃত্বে কমিটি গঠন
• একই কর্মকর্তার হাতে একাধিক জেলার অডিট দায়িত্ব
• চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণের দায়িত্ব না দিয়ে তিন পার্বত্য জেলার দায়িত্ব একজনের হাতে



সরকারি অর্থের হিসাব পরীক্ষা ও আর্থিক অনিয়ম শনাক্ত করার দায়িত্ব যাঁদের ওপর, তাঁদেরই কর্মকাণ্ড নিয়ে যদি প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সেই প্রশ্ন আর কেবল একটি দপ্তরের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা গিয়ে পড়ে সরকারি অর্থের জবাবদিহি, দায়িত্ব বণ্টনের স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহারের মতো মৌলিক প্রশ্নে। ভূমির হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) দপ্তরের নিয়ন্ত্রক মো. মাশুক বিল্লাহ আরেফ খানের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগ এখন ঠিক সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। অভিযোগ রয়েছে-মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে কর্মকর্তাদের বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অডিটে পাঠানো হয়েছে, একই কর্মকর্তাকে একাধিক জেলার অডিটের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, বিধিবহির্ভূত বদলি করা হয়েছে এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে।

অভিযোগের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক হলো, অডিটের মতো সংবেদনশীল দায়িত্ব বণ্টন নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ অডিট কেবল একটি সফর বা দাপ্তরিক দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে সরকারি অর্থের হিসাব, ব্যয় যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দায়বদ্ধতা সরাসরি যুক্ত। ফলে কে অডিট করবেন, কী প্রক্রিয়ায় তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হবে এবং সেই দায়িত্বের প্রশাসনিক অনুমোদন কোথায়-এসব প্রশ্নের প্রতিটি উত্তরই গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগগুলোকে আমলে নিয়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব আখতার হোসেনকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্রও চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। মন্ত্রণালয়ে দেওয়া লিখিত অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কিছু নথি পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগের একটি অনুলিপি এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ বলেন,* অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়েছে। একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পেলেই অঅইন মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তার আগে কোনো ধরনের মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।

অডিটের দায়িত্ব বণ্টনেই বড় প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে- অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অডিট কার্যক্রমে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অডিটের হিসাব তত্ত্বাবধায়ক (রাজস্ব) কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের কথা। কিন্তু তার পরিবর্তে এক ধাপ উপরে সহকারী হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের দিয়ে ওই দায়িত্ব পালন করানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাকে নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে এ ধরনের কাজে পাঠাতে হলে মন্ত্রণালয়ের মৌখিক বা লিখিত অনুমোদন আবশ্যক। সেক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কোন ধরনের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
নথিতে দেখা যায়, গত ৫ মে ঢাকা বিভাগের সহকারী হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) আবুল কাশেমকে একটি অডিটের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগেও ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের অডিটের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। প্রশ্ন এখানেই-একই কর্মকর্তাকে কেন বারবার সংবেদনশীল অডিটের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে? দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে কোনো লিখিত মানদণ্ড ছিল কি না? অন্য যোগ্য কর্মকর্তারা কি বিবেচনায় ছিলেন? নাকি দায়িত্ব বণ্টন হয়েছে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে?

একই কর্মকর্তার হাতে একাধিক অডিট
অভিযোগে ময়মনসিংহ বিভাগের সহকারী হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আনিছুর রহমানের নামও এসেছে। গত জুনে তাঁকে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অডিটের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অডিটের দায়িত্বও তাঁর ওপর দেওয়া হয়। একজন কর্মকর্তাকে একাধিক জেলার অডিটের দায়িত্ব দেওয়া নিজেই বেআইনি-এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ ধরনের দায়িত্ব বণ্টনের প্রশাসনিক যুক্তি কী ছিল? একাধিক জেলার অডিটে একই কর্মকর্তাকে পাঠানোর পেছনে যদি দক্ষতা, অভিজ্ঞতা বা বিশেষ প্রয়োজনীয়তা থাকে, তার লিখিত ভিত্তি কী? আর যদি একই কাজের জন্য অন্য কর্মকর্তারাও যোগ্য থাকেন, তাহলে তাঁদের বাদ দেওয়ার কারণ কী? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-এই দায়িত্ব বণ্টনের ফলে সরকারি অর্থে অতিরিক্ত সফর, ভাতা বা অন্যান্য ব্যয় হয়েছে কি না।

তিন পার্বত্য জেলার অডিট কেন একজন
অভিযোগে আরও গুরুতর একটি বিষয় উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম উত্তর বা চট্টগ্রাম দক্ষিণের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব না দিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের সহকারী হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) দিদারুল আলম পাটোয়ারীকে তিন পার্বত্য জেলার অডিটের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তিনটি পৃথক জেলার অডিটের দায়িত্ব একজন কর্মকর্তার হাতে দেওয়ার প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা কী ছিল-এ প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ অডিটের দায়িত্ব বণ্টন যদি কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা, দক্ষতার মানদণ্ড ও প্রশাসনিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে হয়ে থাকে, তাহলে তার নথিভুক্ত ব্যাখ্যা থাকার কথা। আর যদি এমন কোনো লিখিত ভিত্তি না থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে-কেন ওই কর্মকর্তাকেই বেছে নেওয়া হলো? তদন্ত কমিটির উচিত শুধু আদেশটি বৈধ কি না তা দেখা নয়; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটিও খতিয়ে দেখা।

পছন্দের কর্মকর্তা’ দিয়ে অডিট অভিযোগের গভীরতা কোথায়
অডিটের দায়িত্ব বণ্টনে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পছন্দের কর্মকর্তাদের বারবার অডিটে পাঠানোর মাধ্যমে দায়িত্ব বণ্টনে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ প্রভাববলয় তৈরি করা হয়েছে।

এই অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; অডিট ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে। কারণ অডিটের মূল শক্তি হলো স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা। যিনি হিসাব পরীক্ষা করবেন, তাঁর দায়িত্ব বণ্টন যদি প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ায় হয়, তাহলে তাঁর অডিট কার্যক্রমের ওপরও স্বাভাবিকভাবেই আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের জন্য তদন্ত কমিটি দায়িত্ব বণ্টনের ধারাবাহিকতা, কর্মকর্তাদের নির্বাচনের মানদণ্ড, পূর্ববর্তী আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করবে বলে জানা গেছে।

বদলি প্রশাসনকি সিদ্ধান্ত না হলেও চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার: নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় শ্রেণির হিসাব তত্ত্বাবধায়ক (রাজস্ব) কর্মকর্তাদের বিধিবহির্ভূত বদলির অভিযোগও রয়েছে। কিছু কর্মকর্তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে অন্য জেলায় বদলি এবং তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো হয়েছে। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা নিছক ‘অফিস ম্যানেজমেন্ট’-এর বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। কিন্তু সেই ক্ষমতা যদি ভয় দেখানো, শাস্তির হুমকি বা ব্যক্তিগত স্বার্থ আদায়ের উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়-তাহলে সেটি প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্ন তৈরি করে।

তদন্ত কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন, এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখবে কমিটি। কমিটি আরও দেখবে, অডিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সফরসূচি, টিএ/ডিএ বিল, ভাউচার, অনুমোদনপত্র, অডিট রিপোর্ট, দায়িত্ব বণ্টনের আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবের নথি মিলিয়ে দেখবে। বিশেষ করে একই কর্মকর্তা যদি ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন জেলার অডিটের দায়িত্ব পেয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর সফর ব্যয়, সময়কাল, অডিটের ফলাফল এবং দায়িত্ব বণ্টনের সিদ্ধান্তগুলো পরখ করবে তারা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে নিয়ন্ত্রক মো. মাশুক বিল্লাহ আরেফ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তিনি আগের নিয়ম অনুসরণ করেই কাজ করেছেন। অতীতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করেই এখানে দেড় বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। কোন ভূল করলে সেটি তার অজ্ঞতা হতে পারে। আগামি ১৩ সেপ্টেম্বর তদন্ত কমিটির সামনে এ বিষয়ে তার শুনানি রয়েছে।

এখন নজর তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে
ভূমি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চেয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে অডিটের দায়িত্ব বণ্টন, কর্মকর্তাদের নির্বাচন, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন, বদলি, অতিরিক্ত দায়িত্ব, সরকারি অর্থ ব্যয় এবং কথিত আর্থিক সুবিধা-প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে পরীক্ষা করবে কমিটি। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে প্রশ্ন উঠবে শুধু একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়; বরং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থার নজরদারি ও জবাবদিহি নিয়েও। কারণ তদন্তের উদ্দেশ্য কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়; সত্য উদ্ঘাটন করা।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার-সরকারি অর্থের হিসাব যাঁদের হাতে, তাঁদের দায়িত্ব বণ্টন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে সেই প্রশ্নের উত্তরও হতে হবে নথি, বিধি এবং স্বচ্ছ তদন্তের ভিত্তিতে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ