Views Bangladesh Logo

রাস্তায় বিক্ষোভ, টেবিলে বোর্ড: শ্রমিক অসন্তোষের চাপে বাংলাদেশ

Anjan Kar

অঞ্জন কর

বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড তৈরি পোশাক খাত। এই খাতের লাখ লাখ শ্রমিকের ঘামেই দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে। দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই আসে পোশাক শিল্প থেকে, গত বছর যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৬ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এই সাফল্যের পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরি, কর্মপরিবেশ ও চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বকেয়া বেতন, ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের ঘটনায় সেই অসন্তোষ আবার নতুন করে দানা বেঁধেছে।

পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। ১ নভেম্বর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। সেদিনও মিরপুর, সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা, পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষও হয়। একদিকে আলোচনার টেবিল প্রস্তুত হচ্ছে, অন্যদিকে রাস্তায় উত্তেজনা বাড়ছে। এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই ঠিক হবে বছরের শেষ কয়েক সপ্তাহে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতের গতিপথ।

২০২৩ সালের শেষ দিকে নিম্নতম মজুরির দাবিতে দেশজুড়ে যে আন্দোলন হয়, তা ছিল এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র শ্রমিক বিক্ষোভের একটি। মজুরি প্রায় তিন গুণ বাড়িয়ে ২৩ হাজার টাকা করার দাবিতে হাজার হাজার শ্রমিক পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান এবং বহু কারখানায় ভাঙচুর হয়। সেই আন্দোলনে হতাহতের ঘটনাও ঘটে। শেষ পর্যন্ত নতুন মজুরি কাঠামোতে প্রারম্ভিক বেতন নির্ধারিত হয় ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিক সংগঠনগুলো তখনই তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিল, এই অঙ্কে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও পোশাক শ্রমিকদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। কিন্তু পরিবর্তনের পর শ্রমিকদের জীবনে কতটা বদল এসেছে, সে প্রশ্ন থেকেই গেছে। একটি শ্রম অধিকার সংগঠনের নেতা বলেছিলেন, শ্রমিকেরা ন্যূনতম জীবনমান ধরে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন।

চলতি বছরের চিত্র উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ৮০টি কারখানার প্রায় ২০ হাজার ৭৮৩ জন শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪৫৭টি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হয়েছে, ফলে ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শ্রমিক বেকার হয়েছেন। প্রতিবেদনটি করেছে ফ্রান্সভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিস মেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স। একই প্রতিবেদনে দেরিতে বা অনাদায়ী মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নারী শ্রমিকদের ওপর, কারণ তাঁরাই এই খাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ।

মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন দেখা গেছে একের পর এক সংঘর্ষে। ফেব্রুয়ারির শেষে রূপগঞ্জে একটি কারখানায় বকেয়া মজুরি ও ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেন। পুলিশের সঙ্গে বারবার সংঘর্ষে শ্রমিক, পুলিশ, সাংবাদিক ও পথচারীসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। গত ডিসেম্বরে সাভারে টানা কয়েক দিন শ্রমিকদের ধর্মঘটের খবরও এসেছে। আগস্টে ঢাকায় গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির কর্মীরা সমাবেশ করে ২০২৬ সালের শ্রম আইনের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং গণতান্ত্রিক শ্রমবিধির দাবি জানান।

চলতি বছরের এপ্রিলে সংসদে পাস হয়েছে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬। এটি ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে এবং আইএলও মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বড় সংস্কার হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে নতুন বিধান যুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনের কেউ কেউ একে স্বাগত জানিয়েছে।

তবে দেশের ভেতরে বিতর্ক থামেনি। শ্রমিক নেতারা বলছেন, শ্রম সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাদ পড়েছে এবং আইনের প্রয়োগ দুর্বল, যা মালিকপক্ষের দিকে ঝুঁকে আছে। একটি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, আইনে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কমিশন বা মজুরি নির্ধারণের কোনো বিধিবদ্ধ কাঠামো রাখা হয়নি, যদিও এটি বহুদিনের দাবি। অন্যদিকে মালিকদের একটি সংগঠন, বিকেএমইএ, শ্রমিকের সংজ্ঞা ও যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধিসহ কয়েকটি ধারা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।

সংগঠিত শ্রমশক্তির দুর্বলতাও বড় সমস্যা। বিআইডিএসের তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের মাত্র ১১ দশমিক ৩৫ শতাংশ ইউনিয়নের সদস্য। প্রায় চার হাজার পোশাক কারখানার মধ্যে নিবন্ধিত ট্রেড ইউনিয়ন আছে ৩০ শতাংশে। ফলে অনেক সময় আলোচনার টেবিলের বদলে শ্রমিকদের সামনে খোলা থাকে শুধু রাস্তা।

সমস্যাটি একতরফা নয়। মালিকপক্ষের বক্তব্য হলো, বিদেশি ক্রেতাদের কম দামের কারণে অনেক কারখানা পুরো ন্যূনতম মজুরি দিতে হিমশিম খাচ্ছে। নিয়োগকর্তাদের প্রতিনিধিরা বলেছেন, ক্রেতারা ন্যায্য দাম দিলে মজুরি পরিপালন কোনো সমস্যাই হতো না। একই সঙ্গে খাতটি নানামুখী বাইরের চাপে আছে। বিজিএমইএ সভাপতি জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। তীব্র লোডশেডিংয়ে ক্ষতির কথা বলেছে বিকেএমইএ। ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি ১২ শতাংশ কমে ৩৪৯ কোটি ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বেড়ে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দেয়।

আগামী কয়েক মাসের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নিম্নতম মজুরির পুনর্নির্ধারণ। আগে প্রতি পাঁচ বছর পরপর মজুরি পুনর্বিবেচনা বাধ্যতামূলক ছিল। ২০২৬ সালের সংশোধিত আইনে তা কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ঘোষিত ১২ হাজার ৫০০ টাকার মজুরির তিন বছর পূর্ণ হচ্ছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। শ্রমিক সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি তুলেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় না কমলে এবং নতুন মজুরি কাঠামো দ্রুত ও গ্রহণযোগ্যভাবে ঘোষিত না হলে বছরের শেষ দিকে নতুন করে অস্থিরতার ঝুঁকি থাকছে।

বিশ্লেষকেরা আগেই সতর্ক করেছেন, অসমাপ্ত শ্রম সংস্কার ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির মধ্যে নতুন সরকার বড় ধরনের শ্রমিক বিক্ষোভের মুখে পড়তে পারে। আইনের কার্যকর প্রয়োগ ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কাগজে অধিকার থাকলেই হবে না। শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বকেয়া মজুরির ক্ষেত্রে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। মজুরি বাড়াতে হলে মূল্য নির্ধারণে ক্রেতাদেরও ভূমিকা রাখতে হবে। নইলে চাপ গিয়ে পড়বে ছোট ও মাঝারি কারখানার ওপর, যার পরিণতি আরও বন্ধ কারখানা ও আরও ছাঁটাই।

মালিক, শ্রমিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় আলোচনা নিয়মিত না হলে পুরোনো চক্র ফিরে আসবে। বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, কারখানা বন্ধ, তারপর সমঝোতা, যা পরে আবার অবাস্তবায়িত থেকে যায়। বাজার ও পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া কম মজুরির ওপর ভর করে টিকে থাকার দিন ফুরিয়ে আসছে। উচ্চমূল্যের পণ্যে গেলে মজুরি বাড়ানোর সক্ষমতাও তৈরি হবে।

শ্রমিক অসন্তোষ শুধু মজুরির প্রশ্ন নয়। এটি সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অংশীদারিত্বের প্রশ্ন। যে শ্রমিকেরা দেশের রপ্তানি আয়ের চাকা সচল রেখেছেন, তাঁদের মাস শেষে নিশ্চিন্তে বেতন পাওয়ার ভরসাটুকুও যদি অনিশ্চিত থাকে; তাহলে কোনো খাতই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হতে পারে না। নতুন আইন ও আসন্ন মজুরি পুনর্বিবেচনা সরকার, মালিক ও ক্রেতা সবার জন্যই এক পরীক্ষা। এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে অস্থিরতার চক্র থেকে বেরোনো সম্ভব। না পারলে বছরের শেষে আবার রাস্তায় নামবেন শ্রমিকেরা, আর তার মাশুল দিতে হবে পুরো অর্থনীতিকেই।

অঞ্জন কর
সহ-সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ