আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগ তিন সংগঠের সভাপতি-সম্পাদকরাই এখন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত
একই রাজনৈতিক পরিবারের তিন সংগঠন। তিন সংগঠনের শীর্ষ ছয় নেতা। এখন তাদের প্রত্যেকেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ—বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই তিন সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা ছয় নেতার সবাই এখন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায়ের মুখোমুখি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছিল গত বছরের ১৭ নভেম্বর। আর আজ, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের চার শীর্ষ নেতাকে।
আজকের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতও মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। সাত আসামির সবাই পলাতক।
অর্থাৎ আওয়ামী লীগের সভাপতি থেকে সাধারণ সম্পাদক, যুবলীগের শীর্ষ দুই পদ এবং ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই পদ—সবগুলোই এখন এমন এক নজিরবিহীন বাস্তবতার মধ্যে পড়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট নেতারা কেউ কারাগারে নেই; বরং প্রত্যেকেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং পলাতক। আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারতে চলে যান। পরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অনুপস্থিতিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে এই গল্পের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এখনও শেষ হয়নি। ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন। দেশে ফিরলে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের মুখোমুখি হতে হবে—এ বাস্তবতা জেনেও তাঁর দেশে ফেরার ঘোষণা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের রাজনৈতিক ইতিহাস অবশ্য শুধু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। ছাত্রলীগের রয়েছে ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। যুবলীগও আওয়ামী লীগের যুবশক্তিকে সংগঠিত করার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কয়েক দশক ধরে রাজনীতিতে সক্রিয়।
সেই দীর্ঘ ইতিহাসের কারণেই আজকের রায় শুধু কয়েকজন ব্যক্তির বিচারিক পরিণতি নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সংগঠন ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে আদালতের রায়ে ব্যক্তির বিরুদ্ধে যে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, তার দায় পুরো সংগঠনের প্রত্যেক নেতা-কর্মীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি কোনো সংগঠনের ঐতিহাসিক ভূমিকা দেখিয়ে আদালতে প্রমাণিত অপরাধের দায়ও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দমনে আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ, প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র এবং অপরাধ প্রতিরোধে ব্যর্থতার মতো অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের বিভিন্ন ধারায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই রায় বাস্তবে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? কারণ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাতজনের সবাই পলাতক। আর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাও দেশের বাইরে। ফলে আদালতের রায় ঘোষণার পরও এর পরবর্তী অধ্যায় অনেকটাই নির্ভর করছে আসামিদের গ্রেপ্তার, প্রত্যর্পণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।
একদিকে তিন সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের সবাই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত; অন্যদিকে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা ভারতে বসে ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগের রাজনীতির ইতিহাসে এমন এক অধ্যায় শুরু হয়েছে, যেখানে সভাপতি থেকে সাধারণ সম্পাদক—শীর্ষ নেতৃত্বের পুরো সারিই এখন মৃত্যুদণ্ডের রায়ের সঙ্গে যুক্ত। ডিসেম্বর শেখ হাসিনার ঘোষিত প্রত্যাবর্তনের মাস। সেই প্রত্যাবর্তন বাস্তবে হয় কি না, আর হলে তার পরিণতি কী হয়—তার ওপরই হয়তো নির্ভর করবে বাংলাদেশের রাজনীতির এই অধ্যায়ের পরবর্তী পৃষ্ঠা।
মতামত দিন