পর্তুগাল আর রোনালদো; এক স্বপ্ন, দুই নাম
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন কিছু গল্প আছে, যেগুলো শুধু একটি দলের নয়, একজন মানুষেরও। পর্তুগাল আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর গল্প তেমনই। একদিকে একটি দেশের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন, অন্যদিকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারের ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতা। দুটি স্বপ্ন যেন একই সুতোয় গাঁথা।
সেই স্বপ্নযাত্রার নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে আজ। বুধবার রাত ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপ ‘কে’-এর ম্যাচে গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর মুখোমুখি হবে রবার্তো মার্তিনেজের পর্তুগাল। প্রথম ম্যাচ থেকেই লক্ষ্য পরিষ্কার- জয় দিয়ে শুরু, এরপর বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত পথচলা।
এই বিশ্বকাপ রোনালদোর জন্য অন্য যেকোনো আসরের চেয়ে আলাদা। ৪১ বছর বয়সে তিনি রেকর্ড ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন। ইউরো ২০১৬, উয়েফা নেশনস লিগ—সব বড় শিরোপাই তাঁর ঝুলিতে আছে। নেই শুধু বিশ্বকাপ। ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটি এখনো অধরাই। তাই এই বিশ্বকাপকে ঘিরে আবেগটা শুধুই ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি অসমাপ্ত ইতিহাস পূরণের লড়াই।
তবে এবারকার পর্তুগালকে শুধু রোনালদোর দল বললে ভুল হবে। বরং গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড নিয়ে এসেছে তারা। রক্ষণে নুনো মেন্দেস, রুবেন দিয়াস ও জোয়াও কানসেলোর অভিজ্ঞতা, মাঝমাঠে ভিতিনিয়া, জোয়াও নেভেস, বের্নার্দো সিলভা এবং ব্রুনো ফার্নান্দেজের সৃজনশীলতা, সামনে রাফায়েল লেয়াও, পেদ্রো নেতো, গঞ্জালো রামোসদের গতি—সব মিলিয়ে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল এখন পর্তুগাল।
এই দলের হৃদস্পন্দন অবশ্য ব্রুনো ফার্নান্দেজ। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড অধিনায়ক গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ২১টি অ্যাসিস্ট করে সবচেয়ে বেশি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন। তাঁর নিখুঁত পাস, দূরদৃষ্টি আর আক্রমণ সাজানোর দক্ষতা পর্তুগালের সবচেয়ে বড় শক্তি। রোনালদোর গোলের ক্ষুধা আর ব্রুনোর সৃজনশীলতা—এই জুটির দিকেই তাকিয়ে থাকবে বিশ্ব।
রোনালদোও যেন সময়কে হার মানিয়ে এগিয়ে চলেছেন। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ছিলেন দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা। কয়েক দিন আগেই আল নাসরের হয়ে জিতেছেন নিজের প্রথম সৌদি প্রো লিগ শিরোপা। বয়স বাড়লেও ফিটনেস, পরিশ্রম আর গোল করার ক্ষুধা—কোনোটিতেই ভাটা পড়েনি। কোচ রবার্তো মার্তিনেজ তাই নির্দ্বিধায় বলেছেন, রোনালদোর মতো পেশাদার ফুটবলার চাইলে আরও একটি বিশ্বকাপও খেলতে পারেন।
তবে প্রথম ম্যাচেই অপেক্ষা করছে কঠিন পরীক্ষা। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো শুধু অংশ নিতে আসেনি, এসেছে চমক দেখানোর লক্ষ্য নিয়েই। কোচ সেবাস্তিয়েন দেসাব্রের দল শক্ত রক্ষণ ও দ্রুত পাল্টা আক্রমণে বিশ্বাসী। ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলা কয়েকজন ফুটবলারও আছেন তাদের দলে। তাই শুরুতেই কোনো ভুলের সুযোগ নেই পর্তুগালের।
পর্তুগালের ইতিহাসে '৬' সংখ্যাটিরও এক অদ্ভুত মাহাত্ম্য রয়েছে। ১৯৬৬ সালে প্রথম সেমিফাইনাল, ২০০৬ সালে আবার শেষ চার, ২০১৬ সালে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। এবার ২০২৬। সেই সংখ্যাই কি আবার সৌভাগ্যের বার্তা বয়ে আনবে? প্রশ্নটা এখন কোটি পর্তুগিজ সমর্থকের।
তবে পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় সত্য হলো—এই বিশ্বকাপে পর্তুগালের সাফল্য আর রোনালদোর স্বপ্নকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পর্তুগাল যদি বিশ্বকাপ জেতে, পূর্ণ হবে রোনালদোর জীবনের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা। আর রোনালদো যদি শেষ পর্যন্ত সেই ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে পারেন, সেটি শুধু একজন কিংবদন্তির অর্জন হবে না; সেটি হবে পর্তুগাল ফুটবলেরও সর্বশ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। তাই হিউস্টনে আজ শুরু হচ্ছে শুধু একটি ম্যাচ নয়, শুরু হচ্ছে এক দেশ আর এক কিংবদন্তির যৌথ স্বপ্নপূরণের অভিযান।
মতামত দিন