Views Bangladesh Logo

ভারত মহাসাগর জুড়ে মহা কর্মযজ্ঞ

সমুদ্রের বুকে বন্দর, দিগন্তে শক্তির ছায়া

য়তনে বিশাল কিন্তু স্বভাবে শান্ত। ভারত মহাসাগরকে দূর থেকে দেখলে এমনটাই মনে হয়। নীল জল। দীর্ঘ নৌপথ। সারি সারি বাণিজ্যিক জাহাজ। কিন্তু গত এক দশকে দৃশ্যটি বদলেছে। সমুদ্রের চারদিকে শুরু হয়েছে বড় বড় নির্মাণকাজ। কোথাও গভীর সমুদ্রবন্দর। কোথাও দীর্ঘ রানওয়ে। কোথাও সামরিক ঘাঁটি। সরকারি ভাষায় এগুলো বাণিজ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তার প্রকল্প। তবে বন্দর নির্মাণের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত হিসাবও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

ভারত বন্দর বানাচ্ছে। চীনও বসে নেই। অস্ট্রেলিয়া বিমানঘাঁটির রানওয়ে বড় করছে। ভারত মহাসাগরের মাঝখানে দিয়েগো গার্সিয়ায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি। দেশের নাম আলাদা। যুক্তিও আলাদা। শব্দগুলো প্রায় একই—বাণিজ্য, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও কৌশলগত স্বার্থ। এই শক্তি প্রদর্শনের নতুন কেন্দ্র ভারতের 'গ্রেট নিকোবর দ্বীপ'। সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নতুন জনপদ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে নয়াদিল্লি।

ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো বা পিআইবি বলছে, এই প্রকল্প বিদেশি ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের ওপর ভারতের নির্ভরতা কমাবে। একই সঙ্গে শক্তিশালী হবে দেশটির প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক উপস্থিতি। গ্রেট নিকোবর আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের সর্বদক্ষিণের দ্বীপ। এর কাছেই মালাক্কা প্রণালির পশ্চিম প্রবেশপথ। জায়গাটি বেছে নেওয়ার পেছনে ভূগোলের বড় ভূমিকা রয়েছে। পিআইবির তথ্য বলছে, গ্যালাথিয়া উপসাগরে প্রস্তাবিত বন্দরটি পূর্ব-পশ্চিম আন্তর্জাতিক নৌপথ থেকে প্রায় ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে। সেখানে পানির স্বাভাবিক গভীরতা ২০ মিটারের বেশি। বড় জাহাজ চলতে গভীর পানি দরকার। পরিকল্পনাকারীরা সেই গভীর পানিতে অর্থনীতির সুযোগ দেখেছেন। নিরাপত্তার প্রয়োজনও দেখেছেন।

প্রকল্পটির সরকারি নাম গ্রেট নিকোবর প্রকল্প। এর প্রধান অবকাঠামো হবে আন্তর্জাতিক কনটেইনার ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনাল। পিআইবির হিসাবে, বন্দরটির বার্ষিক সক্ষমতা হবে ১ কোটি ৪২ লাখ টিইইউ। টিইইউ বলতে ২০ ফুট দীর্ঘ একটি কনটেইনারের সমমান বোঝায়। এর সঙ্গে থাকবে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ব্যস্ত সময়ে সেটি ঘণ্টায় চার হাজার যাত্রী সামলাতে পারবে। নির্মাণ করা হবে ৪৫০ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার ক্ষমতার গ্যাস ও সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র। ১৬ হাজার ৬১০ হেক্টর এলাকাজুড়ে গড়ে উঠবে নতুন জনপদ। একটি দ্বীপ। আয়োজন বিরাট। বন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শহর—সব একসঙ্গে। একে নির্মাণকাজ বললে কম বলা হয়। এটি মহা কর্মযজ্ঞ।

ভারত সরকারের অর্থনৈতিক যুক্তিও পরিষ্কার। পিআইবি জানিয়েছে, ভারতের অনেক বন্দরে বড় কনটেইনারবাহী জাহাজ ভেড়ানোর মতো গভীর জেটি নেই। ফলে ভারতীয় পণ্যের একটি অংশ প্রথমে ছোট জাহাজে করে শ্রীলঙ্কার কলম্বো, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্লাং বন্দরে যায়। সেখানে কনটেইনার বড় জাহাজে তোলা হয়। এই ব্যবস্থার নাম ট্রান্সশিপমেন্ট। এতে সময় লাগে। খরচ বাড়ে। বন্দরসেবার আয়ও চলে যায় অন্য দেশে। পিআইবি বলছে, গ্রেট নিকোবর বন্দর নির্মাণের অন্যতম লক্ষ্য এই নির্ভরতা কমানো। তবে বন্দরে শুধু কনটেইনার গোনা হবে না। পিআইবির বক্তব্যেই তার ইঙ্গিত রয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রকল্পের উদ্দেশ্যের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা উপস্থিতি এবং আন্দামান সাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের অবস্থান শক্তিশালী করার বিষয়ও রয়েছে। বাণিজ্যিক বন্দর ও সামরিক সুবিধা পাশাপাশি থাকলে জাহাজের সঙ্গে নজরদারিও আসে। আধুনিক ভূরাজনীতিতে ক্রেন আর রাডারের দূরত্ব খুব বেশি নয়।

জিওপলিটিক্যাল মনিটর গ্রেট নিকোবর প্রকল্পকে ভারতের অর্থনৈতিক ও সামরিক কৌশলের সমন্বিত উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণ বলছে, মালাক্কা প্রণালির কাছে দ্বীপটির অবস্থান ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের পাশে উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ দেবে। এই নৌপথ দিয়ে পূর্ব এশিয়া ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। দ্বীপটি মানচিত্রে ছোট। কিন্তু তার পাশ দিয়ে চলা জাহাজের সংখ্যা ছোট নয়।

ভারতের তৎপরতার একটি কারণ দেখা যায় প্রতিবেশী অঞ্চলে চীনের কার্যক্রমে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বা সিএসআইএস জানিয়েছে, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পে যুক্ত।

সিএসআইএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে চীনের সিআইটিআইসি গ্রুপের নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে বন্দর ও শিল্পাঞ্চল নির্মাণের দায়িত্ব পায়। কিয়াউকপিউ থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত তেল ও গ্যাসের পাইপলাইনও রয়েছে। অর্থাৎ বন্দরের সঙ্গে সড়ক আছে। পাইপলাইন আছে। জ্বালানি আছে। বাণিজ্য আছে। কৌশলও আছে। জিওপলিটিক্যাল মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের গোয়াদার ও শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরেও চীনের বিনিয়োগ রয়েছে। এসব বন্দরকে ঘিরে চীনের কার্যক্রম বহুদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। নয়াদিল্লির কাছে গ্রেট নিকোবর তাই বিচ্ছিন্ন কোনো নির্মাণ প্রকল্প নয়। ভারত মহাসাগরে চলা বন্দরকেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতারই একটি অংশ।

এদিকে অস্ট্রেলিয়াও নিজের জায়গা গুছিয়ে নিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারত মহাসাগরের কোকোস বা কিলিং দ্বীপপুঞ্জের বিমানঘাঁটির রানওয়ে সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী করা হচ্ছে। বড় সামরিক বিমান পরিচালনার উপযোগী করতে উন্নত করা হচ্ছে রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, আলোকব্যবস্থা ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা। সেখানে একটি স্থায়ী নির্মাণঘাটও তৈরি হচ্ছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে প্রাথমিক নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ভারত মহাসাগরের মধ্যভাগে রয়েছে দিয়েগো গার্সিয়া। যুক্তরাজ্য সরকারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

যুক্তরাজ্য সরকার ঘাঁটিটিকে মধ্যপ্রাচ্য, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও আফ্রিকায় দুই দেশের সামরিক উপস্থিতি ও রসদ সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছে। ফলে ভারত মহাসাগরের জলে এখন বাণিজ্যিক জাহাজের সঙ্গে সামরিক বিমানের ছায়াও পড়ে।

গ্রেট নিকোবর প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে কয়েক বছর আগে। ভারতের ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালের নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির পরিবেশগত সমীক্ষার কাজের পরিধি ২০২১ সালের ২৫ মে অনুমোদন পায়। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে আন্দামান অ্যান্ড নিকোবর আইল্যান্ডস ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন লিমিটেড। পিআইবির তথ্য অনুযায়ী, পুরো প্রকল্পের আয়তন ১৬৬ দশমিক ১০ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে ৩৫ দশমিক ৩৫ বর্গকিলোমিটার সরকারি রাজস্বভুক্ত জমি। বাকি ১৩০ দশমিক ৭৫ বর্গকিলোমিটার বনভূমি। কাজ হবে তিন ধাপে। প্রথম ধাপ ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সাল। দ্বিতীয় ধাপ ২০৩৬ থেকে ২০৪১ সাল। শেষ ধাপ ২০৪২ থেকে ২০৪৭ সাল।

অর্থাৎ পরিকল্পনাটি আজকের। শেষ হতে সময় লাগবে দুই দশকের বেশি। বড় প্রকল্পের ঘড়ি ধীরে চলে। তবে তার প্রভাব অনেক আগেই শুরু হয়ে যায়। ভারত সরকারের কাছে গ্রেট নিকোবর অর্থ গভীর সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থান, ট্রান্সশিপমেন্ট আয় ও শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ