Views Bangladesh Logo

প্লিজ, আমাদের শিশুদের বাঁচান

Rased Mehedi

রাশেদ মেহেদী

আমরা যারা বার্তাকক্ষে বসে প্রতিদিন খবর লিখি, সম্পাদনা করি, তাদের কাছে মৃত্যু সংবাদ অনেকটাই সহনীয়। আর দশটা বিষয়ের খবরের মতো শুধু একটা খবর হয়ে যায়। স্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা খুব কমই খবর হয়। যদি কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি মারা যান, শুধুমাত্র তখনই স্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় বড় রিপোর্ট হয়। মৃত্যু সংবাদের পাশাপাশি অসংখ্য শোকবার্তা আসে। দশ বাক্যের মৃত্যু সংবাদের সঙ্গে পঞ্চাশ বাক্যের শোকবার্তা যোগ করা হয়। শত শোকবার্তা থেকে বাছাই করে কয়েকটা নির্ধারণ করতে হয় শব্দ সংখ্যার সীমাবদ্ধতার বিষয়টি মাথায় রেখে।

কিন্তু প্রতিদিন আমরা অনেকগুলো মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশ করি যেগুলো অস্বাভাবিক মৃত্যু। অপঘাত, অবহেলা কিংবা দুর্ঘটনাজনিত ‍মৃত্যু। এগুলোর কোনটি আবার রুটিন খবর হয়ে যায়। যেমন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর। প্রতিদিনই একাধিক মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে, কোথাও না কোথাও সংঘাত, সংঘর্ষ কিংবা পারিবারিক বিরোধের কারণে খুনের খবর আসছে। সব মৃত্যুর খবরই আমরা আসলে গুরুত্ব দেই না। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে শিশু মৃত্যুর খবর আমরা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ তৈরির নির্মোহ মানুষগুলোই আর মেনে নিতে পারছি না! অসংখ্য শিশুর নিস্পাপ মুখ আমাদের পাষাণ হৃদয় ফেটে চৌচির করে দিচ্ছে।

হামের উপসর্গে প্রতিদিন শিশু মৃত্যুর খবর এখন সড়ক দুর্ঘটনার মতোই রুটিন খবরে পরিণত হয়েছে। হামের উপসর্গে এভাবে একের পর এক শিশুর মৃত্যু কোনোভাবেই সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। হামের টিকা সময়মতো না দেওয়ার কারণেই এই মৃত্যু হচ্ছে। এর পেছনে রাষ্ট্রীয় চরম অবহেলা, দায়িত্বহীনতা রয়েছে। সেই দায়িত্বহীন কারা সেটা চিহ্নিত করে আইনের কাঠামোর ভেতরে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা সরকারেরই দায়িত্ব। বর্তমান সরকার হামের টিকার ব্যবস্থা করে হাম উপসর্গে শিশু মৃত্যু বন্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, এ জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু শিশুদের জীবন রক্ষার টিকা সরবরাহ বন্ধ করে যারা নোংরা বাণিজ্যের ছক কষেছিলেন, যারা জনগণের টাকায় সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সেই জনগণের কোলেই অসংখ্যা শিশুর লাশ চাপিয়ে দিয়েছেন, তাদের শাস্তির আওতায় না আনলে পুরো জাতিই এই শিশুদের কাছে অপরাধী থেকে যাবে!


ভবিষ্যতেও এ ধরনের দানব সিন্ডিকেটের আরও ভয়ংকর অপকর্ম প্রতিরোধের জন্যও দায়ীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা জরুরি। দায়ীরা কোন রাজনৈতিক দলের দালাল, তথাকথিত সুশীল সমাজের কোন অংশের তাঁবেদার, কোন বিদেশি প্রভু রাষ্ট্রের আদরের পোষা প্রাণী, সেটা বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। এ ধরনের ভয়ংকর অন্যায়ের নায্য বিচার নিশ্চিত হওয়া জরুরি, ভবিষ্যতে আমাদের অনাগত শিশুদের রক্ষার জন্যই। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে দায়ীদের চিহ্নিত করার জন্য সরকারের কোনো পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি, বিচারের আওতায় নিয়ে আসা তো পরের কথা!

হামের উপসর্গে শিশু মৃত্যুর খবরের মধ্যেই প্রতিদিন আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনার খবরও প্রায় প্রতিদিনই আসছে। সেটা হচ্ছে শিশুদের বলাৎকারের খবর। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বলাৎকার করছে তাদের শিক্ষকরাই। কোন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘটছে, কারা ঘটাচ্ছে, তাদের পরিচয়-বিবরণও প্রতিদিন লেখা হচ্ছে। ব্যক্তি অপরাধীরা গ্রেপ্তারও হচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এত বড় সংখ্যায় একই ধরনের অপরাধ সংঘটনের পেছনে শুধু ব্যক্তি অপরাধীরা দায়ী হতে পারে না। এর জন্য প্রধানত দায়ী যে ব্যবস্থার ভেতরে এই ঘটনা ঘটছে, সেই শিক্ষা পদ্ধতি। সেখানে আবাসিক ব্যবস্থা থেকে শুরু করে পুরো শিক্ষা পদ্ধতির ভেতরে বড় ধরনের গলদ আছে বলেই শিক্ষকরা বলাৎকারে মেতে উঠছে, নিস্পাপ শিশুরা এর করুন শিকার হচ্ছে।


বিকৃত রুচি চর্চার শিকার হওয়া এই শিশুদের বড় একটা অংশ ভবিষ্যতে বড় ধরনের মানসিক অসুস্থতায় ভুগতে পারে, সে আশঙ্কাও আছে। এ কারণে সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে, পুরো ব্যবস্থা তদন্ত করে দেখা এবং গলদগুলো কোথায় সেটা চিহ্নিত করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া। না হলে একটা ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা পদ্ধতির কারণে ভবিষ্যতে বিকৃত রুচির চর্চা ও মানসিক অসুস্থতা জাতিকে ভয়াবহ সংকটে ফেলে দিতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের শিশুদের বিকৃত রুচির চর্চা থেকে রক্ষায় এখনই, এই মুহূর্তেই পদক্ষেপ নিতে হবে।

মিরপুরে শিশু রামিসার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আমাদের সবাইকে কাঁদিয়েছে। পুরো সমাজ ব্যবস্থার ভেতরেই বিকৃত রুচি, হিংস্রতা কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তার একটা বড় উদাহরণ রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। স্বস্তির এটাই যে ধর্ষক ও খুনী চিহ্নিত হয়েছে এবং গ্রেপ্তার হয়ে এখন বিচারের মুখোমুখি। আদালতে নেওয়ার সময় এই খুনী উপস্থিত সাংবাদিদের সামনে চিৎকার করে আরও একজনের নাম বলেছে। এ বিষয়টিও দ্রুত তদন্ত করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, যেন কোনো অপরাধীই পার না পায়।

এটা অস্বীকার করার উপায় নাই যে, বিগত অন্তবর্তী সরকারের আমলে বিকৃত রুচি ও হিংস্রতার চর্চা এক ধরনের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। জীবন্ত মানুষকে গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে হত্যা এবং শত শত বিকৃত রুচির মানুষের উল্লাসের নির্মমতম দৃশ্য এই জাতি এর আগে কখনও দেখেনি। কবর থেকে মরদেহ তুলে পুড়িয়ে ফেলার বীভৎস দৃশ্যও দেশের মানুষ আগে কখনও দেখেনি। অসংখ্য ঘটনা আমরা দেখেছি, যেখানে এক দল বিকৃত মানুষ নারীদের নানা অজুহাতে হেনস্তা করে বিকৃত উল্লাস করে, সেই ভিডিও সমামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় অন্তবর্তী সরকার অদ্ভুতভাবে নির্মোহ থেকেছে। মূল অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করে লোক দেখানো কিছু গ্রেপ্তার দেখিয়ে পরে তাদের ছেড়ে দিয়েছে। ফলে ড. মুহম্মদ ইউনূসের অন্তবর্তী সরকারের আমলে বিকৃত রুচি ও হিংস্রতা ছড়িয়ে পড়ার জন্য সমাজটা নারী ও শিশুদের জন্য সবচেয়ে বেশী অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।


বর্তমান নির্বাচিত সরকারের পক্ষে সেই বিকৃতির চর্চা বন্ধ করা চট করে সম্ভব নয়, কিন্তু এ ধরনের হিংস্রতার বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ না করলে এই বিকৃত রুচির চর্চা, হিংস্রতা প্রতিরোধ করাও সম্ভব নয়। অতএব নারী ও শিশুর প্রতি হিংস্রতা, সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ করতেই হবে, এর বিকল্প নেই।

শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় কান্না না থামতেই খবর এলো রাজধানীর আদ দ্বীন হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে শীততাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অবহেলার কারণে একই সঙ্গে ছয়জন নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। এই মর্মান্তিক খবর সম্পাদনার সময় আর কি বোর্ডে আঙুল চলে না! আর কতভাবে শিশুদের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর শুনতে হবে এবং মেনে নিতে হবে! বাংলাদেশে অধিকাংশ হাসাপতালের ব্যবস্থাপনা খুবই খারাপ। ‍কিন্তু একজন নবজাতক সুস্থভাবে জন্ম নেওয়ার পর তার বেঁচে থাকার জন্য হাসপাতালের বেডেই নিরাপদ পরিবেশটুকু আমরা বজায় রাখতে পারি না, এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন চিকিৎসা ব্যবস্থা আর কোন দেশে আছে!


দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, এ ঘটনায় দায়ীদের কাউকে গ্রেপ্তার করা হলো না, কারও বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হলো না। উল্টো আদ-দ্বীন হাসপাতালের অসভ্য, বর্বর কর্মচারীরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া সাংবাদিকদের উপর হামলা করে ক্যামেরা ভেঙ্গে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করল!

সাংবাদিকদের উপর হামলার জন্যও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো না! যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কর্মচারী নামধারী ভাড়া করা সন্ত্রাসী দিয়ে পরিচালিত হয়, সে হাসপতালে একজন রোগীও কি নিরাপদ! একটি অবৈধ বেকারি পরিচালনার জন্য তিন লাখ টাকা জরিমানা করে জাতির সামনে এই প্রহসন বন্ধ করুন! সরকারের দায়িত্ব হবে অবিলম্বে হাসপাতালের পরিচালকসহ শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ী প্রত্যেকেকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুাখি করা। একই সঙ্গে হাসপাতালকে ভাড়া করা সন্ত্রাসীমুক্ত করে হাসপাতালটি সুন্দর ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া।

এ লেখা যখন শেষ করতে যাচ্ছি তখন সম্পাদনার টেবিলে আরও এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর আসল। বগেরহাটে পুকুড়ে গোসল করতে গিয়ে কুমিড়ের আক্রমণে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই পুকুড়টি কোনো সাধারণ পুকুর নয়। এটি হযরত খান জাহান আলীর মাজার সংলগ্ন পুকুর। এই পুকুরে অরক্ষিতভাবে কুমিড় পালন এবং কুমিড়ের আক্রমণে এর আগেও মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কয়েকদিন আগে একটি পোষা কুকুড়ের মৃত্যুর খবরও বেশ হৈ চৈ ফেলেছিল।


সংবাদমাধ্যমে খবর আসল, মাজারের খাদেম নামধারী কিছু ব্যক্তি স্থানীয় সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে মিলে মাজারের কুমির ঘিরে মুরগি বাণিজ্যের সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। প্রতিদিন যত ভক্ত আসে তারা মুরগি নিয়ে আসে। সেই মুরগি খাদেমরা অন্যত্রে বিক্রি করে দেয়। আর কুমিড়ের সামনে পোষা প্রাণী, বা বণ্য প্রাণী তুলে দেয়। ক্ষুধার্ত কুমিড় সুযোগ পেলে অরক্ষিত পুকুরে মানুষের উপরও আক্রমণ করে।

দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, প্রতিবার মর্মান্তিক ঘটনার পর বাগেরহাটের স্থানীয় প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পুকুর সুরক্ষিত করার ঘোষণা দেয়। কিন্তু এরপরই সবশেষ। এবারও বাগেরহাটের ডিসি-এসপি একই ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু, সত্যিই কি মুরগি বাণিজ্যের সিন্ডিকেটের বাইরে কি তারা? যদি সিন্ডিকেটের অংশ না হতো তাহলে ওই মাজারের খাদেম নামধারী প্রতারক মুরগি ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করতেন, করেননি কেন? সরকার যদি দায়িত্বশীল হতো তাহলে লোকালয়ে কুমির থাকা পুকুরে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য বাগেরহাটে দায়িত্ব পালন করা ডিসি-এসপিদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত ছিল। এই শিশু দরিদ্র প্রতিবন্ধী মায়ের সন্তান বলে তার মৃত্যুর জন্য দায়ী মাজারের খাদেম, ডিসি-এসপি-ইউএনও পার পেয়ে যেতে পারে না, কোন সভ্য সমাজে এটা হওয়া উচিত না।

আমরা প্রতিদিন আর শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর লিখতে চাই না। আসলে আমরা পারছি না। বুকে পাষাণ চেপে রাখার যে ভার ক্রমাগত বাড়ছে, সেটা আর বহন করা যাচ্ছে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, প্লিজ আমাদের শিশুদের বাঁচান, শিশু ধর্ষণ, বলাৎকার, হত্যা, অবহেলা ও দায়িত্বহীনতায় মৃত্যু, প্রতিটি ক্ষেত্রে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। এ সমাজকে মা ও শিশুর জন্য নিরাপদ করতে এই মুহূর্তে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিন।


রাশেদ মেহেদী, সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ 

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ