Views Bangladesh Logo

পীর শামীম হত্যা: রাষ্ট্রই বাদী, পরিবার না চাইলেও মামলা করতে বাধ্য পুলিশ

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীর হত্যার ঘটনায় ৪৮ ঘণ্টা পার হলেও এখনো কোনো মামলা হয়নি। এমন তথ্য সামনে আসার পর এই ধরনের ঘটনায় মামলা দায়ের করার আইনগত বাধ্যবাধকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

নিহতের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা মামলা করবেন না। তিনি বলেন, ‘যিনি মারা গেছেন, তাকে তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। অযথা ঝামেলায় জড়াতে চাই না।’

তবে দেশের প্রচলিত আইন বলছে- পরিবার মামলা না করলেও খুনের মতো গুরুতর অপরাধে পুলিশ নিজ উদ্যোগে মামলা করতে এবং তদন্ত শুরু করতে বাধ্য।

বাংলাদেশের আইনে হত্যা একটি আমলযোগ্য অপরাধ। এর অর্থ হলো, এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে- এমন তথ্য পেলেই পুলিশ কোনো পূর্বানুমতি ছাড়াই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারে এবং নিতে হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারা অনুযায়ী- আমলযোগ্য অপরাধের বিষয়ে তথ্য পেলে সংশ্লিষ্ট থানাকে অবশ্যই এফআইআর গ্রহণ করতে হবে। একইভাবে পুলিশ রেগুলেশন, বেঙ্গল (PRB)-এও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযোগ গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘‘খুনের ঘটনার দুই দিন পরও মামলা না হওয়া শুধু দায়িত্বে অবহেলা নয় বরং তা সরাসরি বেআইনি। কারণ, এ ধরনের অপরাধে রাষ্ট্রের স্বার্থ জড়িত থাকে। একজন ব্যক্তির জীবনহানি কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি সামাজিক ও আইনি শৃঙ্খলার ওপর আঘাত। তাই এখানে রাষ্ট্র নিজেই বিচার প্রক্রিয়ার পক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই পরিবার মামলা করতে না চাইলে বা না পারলেও আইন থেমে থাকে না। পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হলো, কোনো খুনের ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পেলে তাৎক্ষণিকভাবে একটি মামলা রুজু করা এবং তদন্ত শুরু করা। এ ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিজেই বাদী হয়ে মামলা করতে পারেন। বাস্তবে এ ধরনের মামলাকে সাধারণত জিআর (General Register) মামলা বলা হয়, যেখানে রাষ্ট্র কার্যত বাদী হিসেবে বিবেচিত হয় এবং মামলাটি ‘রাষ্ট্র বনাম আসামি’ আকারে পরিচালিত হয়।’’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার নেত্রী এলিনা খান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী- পুলিশ কয়েকটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নিজেই বাদী হয়ে মামলা করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে, ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা করতে অস্বীকৃতি জানালে, কোনো কারণে অভিযোগকারী না থাকলে, পুলিশ নিজে অপরাধ প্রত্যক্ষ করলে অথবা নির্ভরযোগ্য সূত্রে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলে। এসব ক্ষেত্রে পুলিশের নিষ্ক্রিয় থাকার কোনো সুযোগ নেই। বরং দ্রুত মামলা নেওয়া এবং অপরাধস্থল পরিদর্শন, আলামত সংগ্রহ ও সাক্ষ্যপ্রমাণ নিশ্চিত করা জরুরি দায়িত্ব।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি শামসুন্নাহার রুমা এ ব্যপারে বলেন, ‘পুলিশ সদর দফতর থেকেও বারবার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, খুনের মতো গুরুতর মামলায় কোনো ধরনের গাফিলতি সহ্য করা হবে না। তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করা, প্রযুক্তিনির্ভর প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা-এসব বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্তে বিলম্ব হলে প্রমাণ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, যা বিচার প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিতে পারে।’

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘দৌলতপুরের পীর হত্যার ঘটনার দুই দিন পার হলেও এখনো মামলা না হওয়া বেআইনী। একটি খুনের ঘটনায় মামলা না হওয়া মানে হলো অপরাধের আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়াই শুরু না হওয়া। এতে অপরাধীরা শনাক্ত ও গ্রেপ্তার না হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, একই সঙ্গে আইনের শাসন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার সামাজিক, আর্থিক বা নিরাপত্তাজনিত কারণে মামলা করতে চায় না। কিন্তু আইন সেই শূন্যতা পূরণ করার জন্যই পুলিশকে বিশেষ ক্ষমতা ও দায়িত্ব দিয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘পুলিশ যদি কোনো কারণে মামলা নিতে গড়িমসি করে বা এড়িয়ে যায়, তাহলে সেটি চ্যালেঞ্জ করারও সুযোগ রয়েছে। আর ভুক্তভোগী পক্ষ মামলা না করলে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ মামলা করতে বাধ্য।’

দৌলতপুর থানা অফিসার ইনচার্জ মো. আরিফুর রহমান এ ব্যপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না জানিয়ে বলেন, ‘বিষয়টি দেখছি।’ তবে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীর হত্যার ঘটনায় পরিবার মামলা না করলেও আইনগত প্রক্রিয়া থেমে থাকবে না। খুন একটি গুরুতর আমলযোগ্য অপরাধ হওয়ায়, এ ধরনের ঘটনায় পুলিশ নিজ উদ্যোগে মামলা করতে বাধ্য। পরিবার অভিযোগ দায়ের না করলে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিজেই বাদী হয়ে মামলা করবেন এবং আইন অনুযায়ী তদন্ত শুরু হবে।’

তিনি জানান, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়।

গত শনিবার দুপুরে ফিলিপনগর দরবার শরিফে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে হামলা হয়। ওই ঘটনায় দরবারে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি পীর শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পুরোনো ভিডিওকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। এরপর শতাধিক মানুষ মিছিল নিয়ে দরবারে হামলা চালায়। পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই হামলা’ ভাঙচুর ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, শতাধিক মানুষ স্লোগান দিতে দিতে দরবারের দিকে অগ্রসর হয় এবং পরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ