Views Bangladesh Logo

পীর শামীম হত্যা: অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশের আইনী বাধ্যবাধকতা

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ‘মব’ করে গণপিটুনি দিয়ে পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় শনিবার (১৮ এপ্রিল) সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী। স্থানীয়দের অভিযোগ, চিহ্নিত আসামিরা প্রকাশ্যেই এলাকায় ঘোরাফেরা করছে, যা জনমনে আতঙ্ক ও ক্ষোভ বাড়িয়ে তুলেছে। ঘটনার পর থেকে নিহতের পরিবার আবারও মবের শঙ্কায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পীর শামীম জাহাঙ্গীর নিহতের ঘটনায় গত ১৩ এপ্রিল একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। নিহতের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক ফজলুর রহমান বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় ওই মামলাটি করেন। দায়েরকৃত মামলায় চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে পীরের দরবারে হামলায় উস্কানি দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

মর্মান্তিক ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত ফিলিপনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রার্থী ও সাবেক জেলা সভাপতি জনাব মুহাম্মদ খাজা আহমেদকে প্রধান আসামি এবং বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের নেতা আসাদুজ্জামানকে দুই নম্বর আসামি করা হয়েছে। যদিও কুষ্টিয়া জামায়াতের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে বলা হয়েছে- ‘ওই ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বা এর কোনো নেতাকর্মীর ন্যূনতম সম্পৃক্ততা নেই। বরং হামলার দিন ঘটনাস্থলে স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ অন্যান্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি ছিল- যা এ ঘটনাকে ঘিরে জনমনে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।’

এদিকে, স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পূর্ব বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন, ঘটনার সময় একাধিক ব্যক্তি হামলায় অংশ নেয় এবং তাদের অনেককেই এলাকাবাসী শনাক্ত করতে পেরেছে। এই ঘটনায় মামলা হলেও আসামীরা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

মামলার বাদী ফজলুর রহমান জানান, 'আমরা প্রশাসনের কাছে বারবার যাচ্ছি, কিন্তু এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখছি না। যাদের আমরা চিনি, তারা এলাকায় ঘুরছে- এটা আমাদের জন্য ভয়ঙ্কর। ভূক্তভোগীর পুরো পরিবার এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি এবং যেকোনো সময় আবার হামলার আশঙ্কা করছি।'

তবে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন এ ব্যপারে ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। কিছু তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে, যেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘গ্রেফতার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হলেও তা দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। অনেক সময় দেখা যায়, আসামিরা আত্মগোপনে চলে যায় বা প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা করে। তাই আমরা নিশ্চিত হয়ে পদক্ষেপ নিতে চাই, যাতে আদালতে টেকসই মামলা করা যায়।'

তিনি দাবি করেন, পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে এবং খুব শিগগিরই দৃশ্যমান অগ্রগতি পাওয়া যাবে।’

তিনি আরো বলেন, ঘটনার সঙ্গে একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে আসামিদের শনাক্তকরণের কাজ চলছে। ঘটনাস্থল সংশ্লিষ্ট বাড়িতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় তদন্তে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। তাই পাবলিক যে ভিডিওগুলো ছড়িয়েছে, সেগুলো সংগ্রহ করতে হচ্ছে। সেসব ভিডিও থেকে আমরা সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি।’

এক নম্বর আসামির ফেসবুকে সক্রিয় থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের তো অনেক লোক বিদেশে থেকেও ফেসবুকে অ্যাক্টিভ থাকে। এখন সে কোথা থেকে অ্যাক্টিভ হচ্ছে, সেগুলো নিয়েও আমরা কাজ করছি।’

দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, 'পীর শামীম হত্যা মামলার আসামিদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে আসামিদের গ্রেফতারে। আমাদের অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত আছে। শীঘ্রই আসামিদের গ্রেফতার করা যাবে বলে আশা করছি।’

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি আসামিরা সত্যিই আত্মগোপনে থাকে, তাহলে তারা কীভাবে প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে? এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ওসি আরিফুর রহমান বলেন, ‘প্রকাশে আমাদের সামনে কেউ (আসামি) ঘুরে বেড়াচ্ছে না। এমটা হলে সেই আসামীকে অবশ্যই গ্রেফতার করা হতো। পুলিশের কাছে নেতা বলতে কেউ নেই। অপরাধী সব সময় অপরাধীই।’

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম এ ব্যপারে ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হোক বা না হোক, অপরাধীকে গ্রেফতারে পুলিশের আইনি বাধ্যবাধকতা আছে।’ তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, কোনো হত্যার ঘটনা জানার পর পুলিশকে অবশ্যই তদন্ত শুরু করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানে গ্রেফতারে দেরি হওয়া মানে পলিশের গাফলতি বা ব্যর্থতাই প্রতিফলিত।’

তিনি আরও বলেন, চিহ্নিত আসামিরা প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করার বিষয়টি সত্যি হলে তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো অবনতীর ঝুঁকি তৈরী করে।’

মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বিষয়টিকে উদ্বেগজনক হিসেবে আখ্যা দিয়ে ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রভাবশালী আসামিরা দ্রুত আইনের আওতায় আসে না। এতে ভুক্তভোগী পরিবার বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় থাকে।'

তিনি আরও বলেন, ‘কুষ্টিয়ার ঘটনায় আসামিরা দ্রুত গ্রেফতার না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমে যাবে এবং মব সংস্কৃতি আরো উৎসাহিত হতে পারে। যা পুরো রাষ্ট্রের জন্যই বিপজ্জনক হবে। তাই স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে পীর হত্যার আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করা ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, ‘কুষ্টিয়ায় মব করে পীর হত্যার ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে দেশের গ্রামীণ এলাকায় এধরণের সহিংসতার ঘটনা বাড়াতে পারে এবং সারা দেশে আরও মব সৃষ্টি হয়ে তা এমন ভয়াবহ অবস্থায় যেতে পারে যা হতে পারে নিয়ন্ত্রণহীন।’

এ বিষয়ে আইনী ব্যাখ্যা দিয়ে ব্যারিস্টার বাদল বলেন, ‘বাংলাদেশের ফৌজদারি আইনে প্রত্যক্ষ হত্যা মামলার ক্ষেত্রে আসামি গ্রেফতারকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখা হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি হত্যার মতো গুরুতর জ্ঞাত অপরাধে সরাসরি জড়িত বলে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ থাকলে পুলিশ পরোয়ানা ছাড়াই তাকে তাৎক্ষণিক গ্রেফতার করতে পারে। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, ঘটনাস্থলের প্রমাণ বা ভিডিও ফুটেজ থাকলে গ্রেফতারের যৌক্তিকতা আরও জোরালো হয়। একই আইনের ১৫৭ ধারা অনুযায়ী, হত্যার মতো আমলযোগ্য অভিযোগের বিষয় থাকলেপুলিশ বিলম্ব না করে তদন্ত শুরু করতে বাধ্য। তদন্তের স্বার্থে এবং অপরাধী পলাতক হওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত গ্রেফতার আইনগতভাবে সমর্থিত। পর্যাপ্ত প্রমাণ মিললে অভিযুক্তকে চার্জশিটসহ আদালতে পাঠাতে হবে।’

এদিকে বর্তমানে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পরিস্থিতি থমথমে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি কিছুটা বাড়ানো হলেও আতঙ্ক কাটেনি। পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীর হত্যার ঘটনায় নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের এখন একটাই দাবি- প্রকৃত আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

তারা বলেন, এতে শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না বরং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায়ও ইতিবাচক বার্তা যাবে। নইলে মবের বিষাক্ত ছোবলে সারা দেশে এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ