জনগণের রায় ও নতুন দিগন্ত: সেবার অঙ্গীকার হোক রাজনীতির মূলমন্ত্র
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই বিজয় কেবল একটি রাজনৈতিক দলের সাফল্য নয়, বরং এটি কোটি মানুষের গভীর আস্থা, বিশ্বাস এবং এক নতুন আগামীর স্বপ্ন। জনগণ তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার স্বপ্নটি বিএনপির হাতে তুলে দিয়েছে একরাশ প্রত্যাশা নিয়ে।
বিজয় যখন গুরুদায়িত্বের নাম
ইতিহাস আমাদের শেখায়, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা শুধু শক্তির প্রতীক নয়, এটি অত্যন্ত কঠিন এক পরীক্ষা। এই বিশাল জনসমর্থন যেন আমাদের ইতিহাসের সেই পুরোনো পথে না নিয়ে যায় যেখানে ক্ষমতার দাপটে সংলাপের পথ রুদ্ধ হয়। সংখ্যার জোর যেন বিরোধী কণ্ঠকে শোনার প্রয়োজনীয়তাকে আড়াল না করে। আমরা বিশ্বাস করি, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হবে, যেখানে ক্ষমতার আত্মবিশ্বাসের চেয়ে জবাবদিহিতার গুরুত্ব হবে অনেক বেশি।
জনগণের পরিপক্কতা: রাজনীতির নতুন বার্তা
এই নির্বাচনের ফলাফল আমাদের আরও একটি বিশেষ ও গুরত্বপূর্ণ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ আবারও প্রমাণ করেছে যে, ধর্মের দোহাই বা কেবল পরকালের শান্তির আশ্বাস দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া সম্ভব নয়। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির যে ‘আশার বেলুন’ তৈরি হয়েছিল, ব্যালট বাক্সে জনগণের রায় সেটিকে নাকচ করে দিয়েছে। এটি স্পষ্ট যে, শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতার অংশীদার হতে চাইলে কেবল ধর্মীয় আবেগ দিয়ে মানুষকে প্রভাবিত করার দিন শেষ হয়ে আসছে।
দেশের মানুষ এবার একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেতে হলে কেবল বড় শক্তির অনুপস্থিতিতে কিছু আসন পাওয়াই যথেষ্ট নয়। একাত্তরের নেতিবাচক ভূমিকার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা না চাওয়া এবং নিজেদের রাজনৈতিক চরিত্রে আমূল পরিবর্তন না এনে এ দেশের মানুষের হৃদয়ে স্থান পাওয়া যে অলীক স্বপ্ন। বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন; তারা ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ঠিকই, কিন্তু রাজনীতির ময়দানে তারা বিচার করে দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং প্রগতির নিরিখে। এটি আমাদের আগামীর রাজনীতির জন্য একটি ইতিবাচক ও উৎসাহব্যঞ্জক দিক।
প্রতিশ্রুতি থেকে প্রাপ্তির পথে
বিএনপি তাদের ইশতেহারে একটি সমৃদ্ধ ও আধুনিক বাংলাদেশের রূপরেখা দিয়েছে। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, আইনের শাসন, নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের অবারিত ভোটাধিকার—এগুলো আজ আর কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের বাঁচার আবশ্যিক শর্ত। আমরা আশাবাদী, নতুন সরকার এই প্রতিশ্রুতিগুলোকে কাগজের পাতা থেকে সাধারণ মানুষের আঙিনায় পৌঁছে দেবে। শুরু হবে 'জুলাই-পরবর্তী' এক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের নতুন নির্মাণযাত্রা।
গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য
গণতন্ত্র মানে কেবল ভোটের হিসাব নয়; গণতন্ত্র মানে পরমতসহিষ্ণুতা, স্বচ্ছতা এবং অংশগ্রহণ। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে হয়, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। বিজয় যেন প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়ে পুনর্মিলনের এক প্রশস্ত রাজপথ তৈরি করে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন রাষ্ট্রীয় শত্রুতায় রূপ না নেয়; বরং সবাই মিলে রাষ্ট্রকে জনগণের সম্পত্তিতে পরিণত করার লড়াই শুরু হোক।
সুশাসনের সূর্যোদয়
আমরা চাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ কেবল একটি বাক্য না হয়ে একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপে পরিণত হোক। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্বাচন ব্যবস্থা—সবখানে ফিরে আসুক পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা। ভয় আর আতঙ্কের সংস্কৃতি বিদায় নিয়ে রাষ্ট্রের ভিত্তি হোক পারস্পরিক আস্থা। বিচারহীনতার অন্ধকার ঘুচে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায়বিচারের আলো।
নাগরিকের ভূমিকা: জাগ্রত প্রহরী
একটি কার্যকর গণতন্ত্রে নাগরিকদের দায়িত্বও অনেক। আমরা যেন কেবল অন্ধ সমর্থক বা অকারণ সমালোচক না হই। ভালো কাজের সাধুবাদ এবং ভুল সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সংশোধন—এই ভারসাম্যই হবে আমাদের নতুন বাংলাদেশের শক্তি। নাগরিক হিসেবে আমাদের সজাগ চোখই সরকারকে সঠিক পথে চলতে সহায়তা করবে।
ক্ষমতার নয়, সেবার জয় হোক
আজকের এই মুহূর্তটি আমাদের জন্য দেশকে নতুন করে গড়ার এক সুবর্ণ সুযোগ। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেন একক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ না থেকে জাতীয় ঐক্যের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশ অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা পার করে আজ স্থিতিশীলতার বন্দরে পৌঁছাতে চায়।
আসুন, আমরা সবাই মিলে একটি শপথ করি— ক্ষমতা নয়, সেবাই হোক রাজনীতির মূল সুর। প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নই হোক নতুন সরকারের শ্রেষ্ঠ পরিচয়।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে