অপ্রতিম আর ফিরবে না, ২ হাজার ৩৮ জন শিশু কোথায়!
১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ির বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিম। সপ্তম শ্রেণির এই কিশোরের জন্য এটা ছিল খুব স্বাভাবিক বিকেল। কথা ছিল ছবি তোলা শেষে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করে বাড়ি ফিরবে, মায়ের ফোন মায়ের কাছে দিয়ে দেবে। কিন্তু অপ্রতিম বাড়ি ফেরেনি। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২০ ঘণ্টা পর ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের নির্জন স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এই ২০ ঘণ্টায় পরিবার কী করেছে, সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। ফোনে কল, পরিচিতদের কাছে খোঁজ, রাস্তায় অনুসন্ধান, থানায় জিডি, শেষ অবস্থান জানার চেষ্টা। নিখোঁজ সন্তানের ক্ষেত্রে সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত পরিবারের কাছে আশা আর উৎকণ্ঠার। হয়তো কোনো এক সময় তারা ভেবেছেন, অপ্রতিমকে পাওয়া গেছে। শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল তার মরদেহ।
অপ্রতিমের মৃত্যুর কারণ কী, কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, এর সঙ্গে কারা জড়িত—এসব তদন্তে বের হবে। তবে অপ্রতিমের ঘটনা আমাদের সামনে এমন প্রশ্ন রেখে গেছে, যার উত্তর শুধু তার পরিবারের জন্য নয়, দেশের হাজারো পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ: একজন শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে খুঁজে বের করতে রাষ্ট্র কতটা দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকরভাবে সক্রিয় হয়?
পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান প্রশ্নটিকে আরও বড় করে তোলে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই—মাত্র সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ জন শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। পুলিশের যাচাই অনুযায়ী, ১৩ হাজার ৬৭৯ জন শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। কিন্তু এখনো সন্ধান মেলেনি ২ হাজার ৩৮ জন শিশুর।
১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাত মাসে ১৫ হাজার ২৪৩টি জিডি হয়েছে; ১৩ হাজার ২৭৩ জন উদ্ধার হলেও ১ হাজার ৯৭০ জনের এখনো সন্ধান মেলেনি। শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ৪৭৪টি ঘটনায় ৪০৬ জন উদ্ধার হয়েছে, ৬৮ জন এখনো নিখোঁজ। পুলিশের ব্যাখ্যায়, ছোট শিশুরা পথ হারানো বা পরিচয়-ঠিকানা বলতে না পারার মতো কারণে নিখোঁজ হতে পারে। কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে পারিবারিক অশান্তি, অভিমান, পড়াশোনার চাপ কিংবা বন্ধুদের প্রভাবের মতো কারণ থাকতে পারে। অনলাইন জিডি চালুর ফলে নিখোঁজের রিপোর্ট বেড়েছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
এই ব্যাখ্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন শেষ হয় না। একজন শিশু কেন নিখোঁজ হলো, সেটা যেমন জানা দরকার, নিখোঁজ হওয়ার পর তার কী হলো—সেটা জানা আরও জরুরি।
কারণ নিখোঁজ শিশুদের পরিণতি এক রকম নয়। কেউ পথ হারিয়ে পরে ফিরে আসতে পারে, কেউ অভিমান করে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিরাপদে ফিরতে পারে। আবার কেউ অপহরণ, পাচার, নির্যাতন বা অন্য অপরাধের শিকার হতে পারে। তাই সব নিখোঁজ শিশুকে অপহৃত বা পাচারের শিকার হিসেবে দেখার ভিত্তি নেই। তদন্তের কাজ অনুমান করা নয়—দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে সম্ভাবনাগুলো যাচাই করা।
এখানে সময়ের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। শিশুর ছবি, সর্বশেষ অবস্থান, মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা—নিখোঁজ হওয়ার পর যত দ্রুত এসব তথ্য কাজে লাগানো যায়, অনুসন্ধানের সুযোগ তত বাড়ে।
বাংলাদেশে এ ধরনের দ্রুত অনুসন্ধানের নতুন উদ্যোগ হলো MUN Alert। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে CID ও Amber Alert for Bangladesh যৌথভাবে এটা চালু করেছে। ১৩২১৯ হটলাইনে নিখোঁজ শিশুর তথ্য জানানোর ব্যবস্থা আছে; উদ্যোগটির লক্ষ্যই হলো নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে দ্রুত সতর্কতা ও অনুসন্ধান শুরু করা।
তবে একটামাত্র প্ল্যাটফর্ম যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি জাতীয় সমন্বিত ব্যবস্থা, যেখানে শিশু নিখোঁজ হওয়ার মুহূর্ত থেকে তার কেসের পূর্ণাঙ্গ গতিপথ নথিবদ্ধ থাকবে। সে উদ্ধার হলো, নিজে ফিরে এল, অপহরণের প্রমাণ পাওয়া গেল, পাচারের শিকার হলো, নাকি এখনো নিখোঁজ—প্রত্যেকটা পরিণতি একই ব্যবস্থায় হালনাগাদ হতে হবে।
বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে নিখোঁজ শিশু ও অজ্ঞাত মরদেহের তথ্য মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থায়। দেশের কোথাও অজ্ঞাত কোনো শিশুর মরদেহ পাওয়া গেল, অন্যদিকে কোনো পরিবার সেই বয়স ও বর্ণনার শিশুকে নিয়ে নিখোঁজ জিডি করল—এই দুটো তথ্য যদি একই কাঠামোর মধ্যে নিয়মিতভাবে যাচাই না হয়, তাহলে পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা অকারণেই দীর্ঘ হতে পারে।
INTERPOL নিখোঁজ ব্যক্তিদের জন্য Yellow Notice ব্যবহার করে, যা বিশেষ করে নিখোঁজ শিশুদের অবস্থান শনাক্ত করতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সতর্কতা হিসেবে কাজ করে। অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্ত করার জন্যও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলাদা তথ্য ও ফরেনসিক সহযোগিতার ব্যবস্থা আছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন সেই ধরনের সমন্বিত চিন্তা—শুধু নিখোঁজ শিশুকে খোঁজা নয়, শিশুর পরিণতি পর্যন্ত কেসটিকে সক্রিয় রাখা। থানায় জিডি হওয়ার পর দায়িত্ব শেষ হবে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে, সর্বশেষ সূত্র কী, কী অনুসন্ধান হয়েছে, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ আছে কিনা, নতুন তথ্য পাওয়া গেছে কিনা—এসবের জবাবদিহিমূলক রেকর্ড থাকতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ, হাসপাতাল, মর্গ, সীমান্ত কর্তৃপক্ষ ও শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার তথ্যও সমন্বিত করতে হবে।
অবশ্যই শিশুর ব্যক্তিগত তথ্য ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। সব তথ্য প্রকাশ্যে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের নিজস্ব ব্যবস্থায় কোনো নিখোঁজ শিশুর কেস অন্ধকারে পড়ে থাকা উচিত নয়।
একজন শিশু নিখোঁজ হওয়া কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ঘটনা নয়। এটা শিশু-নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য জরুরি সংকেত।
অপ্রতিম আর ফিরবে না। তবে তার শেষ বিকেল যেন আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়—যে ২ হাজার ৩৮ জন শিশু এখনো ফেরেনি, তাদের খোঁজ কি রাষ্ট্রের প্রতিদিনের অগ্রাধিকারের মধ্যে আছে!
এই জায়গাটিই রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে। একজন শিশু নিখোঁজ হওয়া কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ঘটনা নয়। এটা শিশু-নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য জরুরি সংকেত।
অপ্রতিম আর ফিরবে না। কিন্তু তার শেষ বিকেল যেন আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়—যে ২ হাজার ৩৮ জন শিশু এখনো ফেরেনি, তাদের খোঁজ কি রাষ্ট্রের প্রতিদিনের অগ্রাধিকারের মধ্যে আছে!
মতামত দিন