আইনজ্ঞদের অভিমত
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ সংবিধান পরিপন্থি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে মঙ্গলবার শপথ নিলেও একই দিনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি বিএনপি ও তাদের মিত্র দলগুলোর সংসদ সদস্যরা। এ শপথ থেকে বিরত থাকেন ছয়জন স্বতন্ত্র এমপিও। তবে জামায়াত-এনসিপি জোটের সংসদ সদস্যরা এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেন। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ সদস্য ও সংস্কার পরিষদের সদস্য দুই ধরনের শপথই পাঠ করান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের এই উদ্যোগকে সংবিধান পরিপন্থি বলে মন্তব্য করেছেন আইনজ্ঞরা। তাদের মতে, বিদ্যমান সংবিধানে এ ধরনের কোনো পরিষদের সদস্যদের জন্য শপথের বিধান নেই। ফলে সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে এমন শপথ আয়োজন সংবিধান পরিপন্থি। এছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাংবিধানিক দায়িত্ব মূলত নির্বাচন পরিচালনা ও সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করানো পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। অতিরিক্ত কোনো পরিষদের শপথ পাঠ করানো তার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।’
আইনজ্ঞদের অভিমত:
সাংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশের সংবিধানে সংসদ সদস্যদের শপথের বিষয়টি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত আছে। কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে কোনো সাংবিধানিক সংস্থার অস্তিত্ব বা সদস্যদের শপথের বিধান বর্তমান কাঠামোয় নেই।’ তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, স্পিকার, বিচারপতি এবং সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের শপথের বিষয়টি নির্ধারিত। এই বিধান মতে নবনির্বাচিত এমপিদের গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে স্পিকার সংসদ সদস্যদের শপথ না পড়ালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই শপথ পড়াতে পারেন। তবে এর বাইরে কোনো অতিরিক্ত শপথ পড়ানোর ক্ষমতা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেই।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘সংবিধানে যার উল্লেখ নেই, সে ধরনের পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ। আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংসদ চাইলে কোনো উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করতে পারে, কিন্তু সেটি সাংবিধানিক পরিষদ হিসেবে ঘোষণা করতে হলে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন।’ প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের মাধ্যমে উভয় শপথ পাঠ করানো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই আইনজ্ঞ। তার মতে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাংবিধানিক দায়িত্ব মূলত নির্বাচন পরিচালনা ও সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করানো পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। অতিরিক্ত কোনো পরিষদের শপথ পাঠ করানো তার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।’
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের রয়েছে। তবে সেটি করতে হলে সংবিধানের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে বিল পাস করতে হয় ‘ তাদের মতে, যদি সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে কোনো বিশেষ কমিটি বা কমিশন গঠন করা হয়, সেটি প্রশাসনিক বা আইনগত কাঠামোর মধ্যে থাকতে পারে। কিন্তু সেই কমিটির সদস্যদের জন্য সাংবিধানিক শপথের আয়োজন করা হলে তা বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি আরো বলেন, ‘সংসদ সদস্যরা ইতোমধ্যেই সংবিধান রক্ষা ও সমুন্নত রাখার শপথ নিয়েছেন। একই ব্যক্তিকে আবার আলাদা করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ-এর নামে শপথ পড়ানো আইনগতভাবে অপ্রয়োজনীয় এবং বিভ্রান্তিকর।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই; তবে প্রক্রিয়াটি হতে হবে স্বচ্ছ ও সাংবিধানিকভাবে বৈধ। এর আগে যেকোনো পরিষদের কাঠামো, এখতিয়ার ও কার্যপরিধি সংসদে স্পষ্ট করতে হবে।’
সংবিধানের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার আগে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’–এর সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মঙ্গলবার সকালে জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পর সাংবাদিকদের দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এই মন্তব্য করেন। আমীর খসরু স্পষ্ট করেন যে, ‘রাষ্ট্র পরিচালনা এবং সংসদীয় কার্যক্রম অবশ্যই বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী পরিচালিত হতে হবে। সংবিধানের বর্তমান কাঠামোতে সংস্কার পরিষদের শপথের কোনো বিধান না থাকায় এই মুহূর্তে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়।’
তবে জামায়াত-এনসিপি জোটের এক নেতা বলেন, সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য এবং সে লক্ষ্যেই পরিষদ গঠন করা হয়েছে। তার দাবি, এটি একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক অঙ্গীকারের অংশ। সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই মঙ্গলবারের সবগুলো শপথ আয়োজন করা হয়েছে।
যা হতে পারে আগামীতে:
বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আদালতের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করতে পারে। কেউ যদি রিট আবেদন করেন, তাহলে সুপ্রিম কোর্ট এ শপথের বৈধতা ও সাংবিধানিক অবস্থান নির্ধারণ করতে পারেন। সব মিলিয়ে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের ঘটনা নতুন করে সাংবিধানিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। সংবিধানের স্পষ্ট বিধান ছাড়া এমন উদ্যোগ ভবিষ্যতে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন আইনজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও একই দিনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি বিএনপির নব নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। এ শপথ থেকে বিরত থাকেন ছয়জন স্বতন্ত্র এমপিও। এছাড়া সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেননি নুরুল হক নুর ও জোনায়েদ সাকি। তবে এদিন জামায়াত-এনসিপি জোটের সংসদ সদস্যরা এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেন।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে