Views Bangladesh Logo

নরওয়ের ইংলিশ পরীক্ষা, পারবে কি আর্জেন্টিনা?

বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন আর ভুলের সুযোগ নেই। স্বপ্ন আর বিদায়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চার দল লড়বে সেমিফাইনালের টিকিটের জন্য। মায়ামি ও কানসাসে লেখা হবে নতুন দুটি গল্প— স্বপ্নের, সাহসের আর বেঁচে থাকার। রোববার ভোরে মায়ামিতে ব্রাজিল বধের আত্মবিশ্বাস নিয়ে আরলিং হল্যান্ডের নরওয়ে মুখোমুখি হবে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডের। আর কানসাসে মিশরকে হারিয়ে আসা তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সামনে অপেক্ষা করছে টাইব্রেকারে উজ্জীবিত, কঠিন প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড।

মায়ামির আলোয় সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে আরলিং হল্যান্ড। আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকারদের একজন তিনি। প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের সামান্য ভুলও গোলের উৎসবে পরিণত করার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে তার। তবে নরওয়ের শক্তি কেবল হল্যান্ডে সীমাবদ্ধ নয়। মাঝমাঠে অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড দলের ছন্দের নিয়ন্ত্রক। তার পাসিং, দৃষ্টিশক্তি এবং আক্রমণ তৈরির দক্ষতা নরওয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। রক্ষণে ক্রিস্টোফার আজের শারীরিক শক্তি ও আকাশে আধিপত্য ইংল্যান্ডের আক্রমণ ঠেকানোর মূল ভরসা। ডান প্রান্তে জুলিয়ান রিয়ারসন আক্রমণ ও রক্ষণে সমান কার্যকর, আর গোলবারের নিচে অরইয়ান নাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা নরওয়েকে আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে।

অন্যদিকে ইংল্যান্ডের আক্রমণের প্রাণভোমরা হ্যারি কেইন। বড় ম্যাচে গোল করার অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্ব তাকে আলাদা করে। উইঙ্গার বুকায়ো সাকার গতি ও এক-অন-ওয়ান দক্ষতা নরওয়ের রক্ষণকে বারবার পরীক্ষায় ফেলতে পারে। মাঝমাঠে ডেকলান রাইস প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে নিজের দলকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে থাকবেন। সৃজনশীলতার বড় দায়িত্ব থাকবে জুড বেলিংহামের কাঁধে, যিনি মুহূর্তেই ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারেন। আর রক্ষণে জন স্টোনসের অভিজ্ঞতা ইংল্যান্ডকে স্থিরতা এনে দেবে।

এই লড়াইয়ে কাগজে-কলমে ইংল্যান্ড কিছুটা এগিয়ে থাকলেও নরওয়ে ইতোমধ্যেই ব্রাজিলকে হারিয়ে প্রমাণ করেছে, তারা আর কোনো ‘ডার্ক হর্স’ নয়। যদি ওডেগার্ড মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেন এবং হল্যান্ড সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে ইংল্যান্ডকে কঠিন মূল্য দিতে হতে পারে। তবে ইংল্যান্ডের স্কোয়াডের গভীরতা, বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা এবং ভারসাম্য তাদের সামান্য এগিয়ে রাখছে।

কানসাসে দ্বিতীয় কোয়ার্টার ফাইনালটি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের। আর্জেন্টিনা এখনও বিশ্বকাপের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও মানসিকভাবে শক্তিশালী দলগুলোর একটি। মিশরের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে তাদের। দলের সবচেয়ে বড় ভরসা অধিনায়ক লিওনেল মেসি। বয়স বাড়লেও তার দৃষ্টি, পাস এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এখনও অনন্য। স্ট্রাইকার হুলিয়ান আলভারেসের নিরন্তর দৌড় এবং গোল করার প্রবণতা আর্জেন্টিনার আক্রমণে বাড়তি ধার যোগ করে। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করবেন, আর রদ্রিগো ডি পল প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দলের ভারসাম্য রক্ষা করবেন। রক্ষণে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর দৃঢ়তা সুইস আক্রমণ সামলানোর মূল চাবিকাঠি।

সুইজারল্যান্ডও কম ভয়ংকর নয়। গোলবারের নিচে ইয়ান সোমারের অভিজ্ঞতা বহুবার বড় ম্যাচে দলকে রক্ষা করেছে। রক্ষণে ম্যানুয়েল আকাঞ্জি আধুনিক ডিফেন্ডারের আদর্শ উদাহরণ, যিনি বল নিয়েও আত্মবিশ্বাসী। মাঝমাঠে গ্রানিত জাকা নেতৃত্ব, আগ্রাসন ও নিখুঁত পাসিংয়ে দলের হৃদস্পন্দন। আক্রমণভাগে ব্রিল এম্বোলোর শারীরিক শক্তি এবং দ্রুতগতির দৌড় যেকোনো রক্ষণকে চাপে ফেলতে পারে। আর ডান প্রান্তে দান এনডোয়ের গতি ও ড্রিবলিং আর্জেন্টিনার ফুলব্যাকদের ব্যস্ত রাখবে।

এই ম্যাচে আর্জেন্টিনা অভিজ্ঞতা, তারকাসমৃদ্ধ স্কোয়াড এবং বড় মঞ্চে সাফল্যের কারণে ফেভারিট। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের শৃঙ্খলা, সংগঠিত রক্ষণ এবং সুযোগের অপেক্ষায় থাকা। যদি সোমার দুর্দান্ত একটি দিন কাটান এবং জাকা মাঝমাঠে মেসিদের গতি কমিয়ে দিতে পারেন, তবে ম্যাচটি সহজ হবে না মোটেও।

বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ভবিষ্যদ্বাণী অনেক সময় অর্থহীন হয়ে যায়। এখানে এক মুহূর্তের অনুপ্রেরণা, একটি নিখুঁত পাস কিংবা একটি ভুলই বদলে দেয় ইতিহাস। মায়ামি আর কানসাস—দুটি শহর রোববার ভোরে শুধু চারটি দলের লড়াই নয়, ফুটবলের চারটি ভিন্ন দর্শনের সাক্ষী হবে। শেষ পর্যন্ত কে হাসবে, কে কাঁদবে, সেটিই এখন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত প্রশ্ন।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ