Views Bangladesh Logo

নিমতলি ট্র্যাজেডির ১৬ বছর, পোড়া দাগ মুছে গেলেও সারেনি ক্ষত

Ahmad  Sifat

আহমাদ সিফাত

২০১০ সালের ৩ জুন। ঘড়ির কাটায় রাত ৯টা বাজতে আর কিছুক্ষণ বাকি। তখনও বেশ জমজমাট পুরান ঢাকার অলিগলি। আর ঠিক সেসময়ই ঘটে যায় দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক অগ্নি দুর্ঘটনা। যে ঘটনায় ঝরে যায় ৭২টি পরিবারের ১২৪ তাজা প্রাণ। আহত হন দুই শতাধিক মানুষ। ভয়ানক সে দিনে নির্মম এক দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিল দেশবাসী। আপনজনকে চোখের সামনে পুড়তে দেখেছেন অনেকেই। চোখের সামনে নিজের শিশু সন্তানকে পুড়ে ছাই হতে দেখেন বাবা। আহত স্বামী-সন্তানের মৃত্যু কামনা করতে থাকেন স্ত্রী ও মায়েরা।

৪৩ নবাব কাটারার বাসিন্দা গুলজার আলীর পাঁচতলা বাড়ির নিচতলার রাসায়নিকের গুদাম থেকে লাগা সেই আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকায়। ওই আগুন জ্বলেছিলো তিন ঘণ্টারও বেশি সময়। আগুনের লেলিহান শিখায় ছাই হয়ে যায় পুড়ে ২৩টি বসতবাড়ি, দোকানপাট ও কারখানা। ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে উদ্ধার কাজ।

মর্মান্তিক সেই নিমতলি ট্রাজেডির ১৬ বছর পূর্ণ হলো আজ। ভয়াবহ সেই আগুনের ক্ষত অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে নিমতলি। বিধ্বস্ত পাঁচতলা সেই ভবন মেরামত করে একতলা বাড়িয়ে ছয়তলা করা হয়েছে। ওই ভবন ঘেঁষে পশ্চিম পাশে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। পোড়াবাড়ি গুলো মেরামত করে রং করা হয়েছে। দগ্ধ মানুষগুলোর শরীরের পোড়া ক্ষতও শুকিয়েছে। কিন্তু মুছে যায়নি সেইদিনের দুঃসহ স্মৃতি। ভয়াবহ সেই অগ্নিকাণ্ডের কথা স্মরণ করে প্রতিবছর হারানো স্বজনদের কথা মনে করে কাঁদেন নিমতলীবাসী।

১৬ বছর পার হয়ে গেলেও ভয়াবহ এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার পাননি নিমতলীবাসী। হয়নি কোনো মামলা। শনাক্ত করা যায়নি দায়ীদের। শাস্তিও হয়নি কারও। কেবল বংশাল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। ক্যালেন্ডারের পাতার পর পাতা উল্টেছে কিন্তু সে জিডির আর তদন্ত হয়নি। বংশাল থানা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, নিমতলির ঘটনায় হওয়া জিডির সূত্র ধরে ১২৪ জনের মরদেহ ঢাকা জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের জন্য স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। আগুনের ঘটনায় করা সেই জিডির কপি এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জিডির বিষয়ে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে ৭২টি পরিবারকে এক লাখ করে টাকা দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ-সদস্য হাজি সেলিমের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল এক মাসের বাজার ও অন্য সহায়তা। কিন্তু এরপর আজ পর্যন্ত আর কেউ এই এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খোঁজ নেননি। সেই ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অধিকাংশই এই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, রাজধানীর পুরান ঢাকায় রাসায়নিকের গুদাম ও দোকান রয়েছে ২৫ হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে অনুমোদন বা লাইসেন্স আছে মাত্র ৮০০টির বাকি সব গুলোই অবৈধ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন দোকান কর্মচারী বলেন, বড় বড় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন বাড়িতে গোপনে কেমিক্যাল মজুত করে রাখেন। পুরান ঢাকার লালবাগ, চকবাজার, আরমানিটোলা, বাবুবাজার, মিটফোর্ড এলাকায় বসতবাড়িসহ অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গোডাউন করে রাখা হয় কেমিক্যাল। তবে গোডাউনের কথা বরাবরই অস্বীকার করেন ব্যবসায়ীরা।

নিমতলী ট্রাজেডির পর টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিলো। পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল রাজধানী থেকে রাসায়নিকের গুদাম-কারখানা সরিয়ে দেয়ার। গঠন করা হয় দুইটি কমিটিও। সেই কমিটি কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে জায়গা ঠিক করার সুপারিশ করে। একই সঙ্গে উচ্চ মাত্রার বিপজ্জনক পাঁচ শতাধিক রাসায়নিকের তালিকা করে শিল্প মন্ত্রণালয়কে প্রতিবেদন জমা দেয়৷ তখন রাসায়নিকপল্লি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রকল্প অনুমোদন হতেই প্রায় ৯ বছর পেরিয়ে যায়। এর মধ্যেই চুড়িহাট্টায় ‘ওয়াহেদ ম্যানশন’ ভবনে থাকা রাসায়নিকের গুদামে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। মারা যান ৭১ জন। চুড়িহাট্টার ঘটনার পর শিল্প মন্ত্রণালয় রাসায়নিকের কিছু গুদাম টঙ্গীর কাঁঠালদিয়া ও ঢাকার শ্যামপুরের বন্ধ হয়ে যাওয়া উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরির জমিতে সরানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু তাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাসায়নিকের গুদাম সরানোর প্রকল্পটি ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুলাই মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৯১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়ন করতে না পারায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু এই সময়েও কাজ শেষ করতে পারেনি বিএসইসি। পরে আরও এক বছর বৃদ্ধি করে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। দুই দফা সময় বাড়ানোর পরেও কাজ শেষ করতে পারেনি বিএসইসি। চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির পর ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। পরে এফবিসিসিআইর অনুরোধে উচ্ছেদ অভিযান সাময়িক স্থগিত করা হয় কিন্তু এর পর আর অভিযান শুরু হয়নি।

প্রাণের পর প্রাণ ঝরে কিন্তু পুরান ঢাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল সরে না। নিমতলী দুর্ঘটনার পর আবাসিক এলাকা থেকে সব ধরনের রাসায়নিক পদার্থের দোকান, গুদাম ও কারখানা অপসারণ করার কথা ছিল। কিন্তু ১৬ বছর পার হয়ে গেলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। প্রতিবারই বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটলে কেমিক্যাল গোডাউন অপসারণের কথা বলা হয়। কিন্তু তা কাজীর গরুর মতো কেতাবেই রয়ে যায়। কেবল মরে যায়, গরুর মতো বেঁচে থাকা কিছু মানুষ।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ