Views Bangladesh Logo

ওপেন এআই এর বিরুদ্ধে নিউইয়র্ক টাইমসের মামলা: পরিণতি কোন পথে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশিক্ষণে সংবাদমাধ্যমের কনটেন্ট ব্যবহার বৈধ কি-না, এ প্রশ্নে বিশ্বজুড়ে আলোচিত নিউইয়র্ক টাইমস বনাম ওপেন এআই ও মাইক্রোসফট মামলাটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিন বছর ধরে চলা এই মামলায় সম্প্রতি একের পর এক নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে। একদিকে আদালতে জমা পড়া গোপন নথি প্রকাশ্যে এসেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সরাসরি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান দুটির পক্ষ নিয়েছে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে মামলাটি করে নিউইয়র্ক টাইমস। পত্রিকাটির অভিযোগ, তাদের সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও মতামত অনুমতি বা অর্থ পরিশোধ ছাড়াই ব্যবহার করে ওপেনএআই ও মাইক্রোসফট বিকল্প বাণিজ্যিক পণ্য তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের মার্চে বিচারক সিডনি স্টেইন কিছু দাবি খারিজ করলেও মামলার মূল অংশ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন। পরে ডেইলি নিউজ, সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং, দ্য ইন্টারসেপ্টসহ আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ও লেখকদের মামলা এর সঙ্গে যুক্ত হয়।

গোপন নথিতে যা মিলল
গত ১৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক টাইমসের জমা দেওয়া একটি নথির অসম্পাদিত সংস্করণ প্রকাশ্যে আসে। এতে দুই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের অভ্যন্তরীণ মন্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। নথিতে মাইক্রোসফটের ডিরেক্টর অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স ব্রেন্ট হেখটের ২০২৩ সালের একটি অভ্যন্তরীণ মেমো থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে বিপুল পরিমাণ কনটেন্ট সংগ্রহকে “নজিরবিহীন মাত্রার বিস্ময়কর চুরি” এবং “মানব ইতিহাসের বৃহত্তম শ্রমচুরি” হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

তবে পূর্ণ বাক্যটির প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। মেমোতে আসলে বলা হয়েছিল, বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ অচিরেই বড় এআই মডেলগুলোর এই কনটেন্ট সংগ্রহকে এভাবেই দেখবে। অর্থাৎ এটি ছিল জনমনোভাব নিয়ে একটি পূর্বাভাস। এ কারণেই উদ্ধৃতিটির ব্যাখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের বিতর্ক রয়েছে।

বাদীপক্ষের নথিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, পেইড কনটেন্টের প্রতিবন্ধক বা পেওয়াল এড়িয়ে ব্যাপক হারে কনটেন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে এবং প্রশিক্ষণ তথ্যভান্ডার থেকে কপিরাইট নোটিশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

নথি অনুযায়ী, ওপেনএআইয়ের শুধু মিড-ট্রেনিং ডেটাসেটেই নিউইয়র্ক টাইমস, ডেইলি নিউজ ও সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিংয়ের প্রকাশিত কনটেন্টের ৯১ হাজার ৬৯২টির বেশি কপি রয়েছে। কমন ক্রল থেকে তৈরি আরেকটি ডেটাসেটে রয়েছে ২০ লাখের বেশি নথি। বাদীপক্ষের দাবি, প্রতিষ্ঠান দুটি নিজেরাই বুঝতে পেরেছিল যে এআই পণ্য সংবাদমাধ্যমের জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করবে এবং ওয়েবের জন্য একটি “ডুম লুপ” ডেকে আনবে।

উল্লেখ্য, প্রকাশিত তথ্যের বড় অংশ এসেছে বাদীপক্ষের নিজস্ব যুক্তিপত্র থেকে। এর ভিত্তি হিসেবে থাকা মূল প্রামাণিক দলিলগুলো এখনো আদালতের নির্দেশে গোপন রাখা হয়েছে। নথির কিছু অংশ, বিশেষ করে আর্থিক অঙ্ক সংক্রান্ত তথ্য, এখনো ঢাকা রয়েছে।

আসামিপক্ষের যুক্তি
ওপেনএআই ও মাইক্রোসফট শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। আদালতে জমা দেওয়া আবেদনে মাইক্রোসফট যুক্তি দিয়েছে, বিদ্যমান কপিরাইট আইন রূপান্তরকারী প্রযুক্তিকে আটকানোর অধিকার স্বত্বাধিকারীদের দেয় না। ওপেনএআইয়ের বক্তব্য, তাদের প্রযুক্তি বিশ্বের তথ্যভান্ডারকে যে কারও নাগালে এনে দিচ্ছে এবং কপিরাইট আইন এই অগ্রগতির পথে বাধা নয়।

গত ৪ সেপ্টেম্বর তিন পক্ষই সংক্ষিপ্ত বিচারের (সামারি জাজমেন্ট) জন্য আনুষ্ঠানিক যুক্তি পেশ করে। নিউইয়র্ক টাইমস দায় নির্ধারণের বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত চেয়েছে। বিচারক অনুকূল রায় না দিলে মামলাটি জুরি ট্রায়ালে গড়াতে পারে।

সরকারের অবস্থান
মামলার মোড় ঘোরানো ঘটনাটি ঘটে ২ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আদালতে একটি বিবৃতি জমা দিয়ে ওপেনএআই ও মাইক্রোসফটের অবস্থানকে সমর্থন করে। বিচার বিভাগের যুক্তি, কপিরাইটযুক্ত লেখা দিয়ে এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়াকে সাধারণভাবে কপিরাইট লঙ্ঘন বলা যায় না। বিবৃতিতে বলা হয়, বাদীপক্ষের অনুকূলে রায় হলে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে এবং বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বীরা সুবিধা পাবে। এআই প্রশিক্ষণে কপিরাইট প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক অবস্থান।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক মুখপাত্র এর প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, সরকার মার্কিন সৃজনশীল মানুষদের স্বার্থের বিনিময়ে হাতেগোনা কয়েকটি ট্রিলিয়ন ডলারের এআই কোম্পানির পক্ষ নিয়েছে।

কেন এই মামলা গুরুত্বপূর্ণ
আইন বিশ্লেষকেরা বলছেন, এআই-সংক্রান্ত অধিকাংশ কপিরাইট মামলা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে এবং একটিও বিচারে গড়ায়নি। ফলে এই মামলার রায় ভবিষ্যতের নজির হয়ে দাঁড়াবে। বাদীপক্ষ জিতলে এআই কোম্পানিগুলোকে প্রশিক্ষণ তথ্যের জন্য অর্থ পরিশোধ করতে হতে পারে, যা তাদের ব্যবসায়িক মডেলে বড় ধাক্কা দেবে। আর আসামিপক্ষ জিতলে সংবাদমাধ্যমের হাত থেকে নিজেদের কনটেন্টের নিয়ন্ত্রণ ও তা থেকে আয়ের সুযোগ অনেকটাই ফসকে যাবে।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের জন্যও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। দেশের সংবাদ ওয়েবসাইটগুলোর কনটেন্টও বিভিন্ন এআই মডেলের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু দেশের কপিরাইট আইনে এআই প্রশিক্ষণে কনটেন্ট ব্যবহারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। এ ধরনের ব্যবহারের অনুমতি, ক্ষতিপূরণ বা লাইসেন্সিং নিয়ে দেশের সংবাদ শিল্পে আলোচনাও তেমন শুরু হয়নি।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ