Views Bangladesh Logo

বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নতুন শঙ্কা

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ রহিত করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বিচার বিভাগের কাঠামো ও স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আইনজ্ঞদের আশঙ্কা, এর ফলে বিচার বিভাগ আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে এবং বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার স্বপ্নে বড় ধরনের ধাক্কা খেলো।


তাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-এর প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত করা এবং আদালতের প্রশাসনিক কার্যক্রমকে স্বাধীনভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু এই সচিবালয় বিলুপ্ত হলে সেই কাঠামো ভেঙে পড়বে এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আবারও সরকারের হাতে ফিরে যাবে।


বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার প্রশ্নটি নতুন নয়। বাংলাদেশের সংবিধানেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়েই এই স্বাধীনতা সীমিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বিচারক নিয়োগ এবং অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা চলে আসছে।


বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হচ্ছে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ। বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই নিয়ন্ত্রণ আবারও চলে যাবে আইন মন্ত্রণালয়-এর অধীনে। এর ফলে বিচারকদের পদায়ন, বদলি এবং শৃঙ্খলাজনিত বিষয়গুলো নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এতে বিচারকদের ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে এবং বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। অন্যদিকে, উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে ফিরে যাওয়ার বিষয়টিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো, তা এই সিদ্ধান্তের ফলে কার্যত স্থগিত হয়ে যাচ্ছে। আগে বিচারক নিয়োগে নির্বাহী বিভাগের সরাসরি প্রভাব কমানোর জন্য আলাদা একটি কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন পরিস্থিতিতে সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত হচ্ছে না।


গত বছরের ১১ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ছিল বিচার বিভাগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার একটি বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। সচিবালয়টি আদালতের বাজেট, জনবল ব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বতন্ত্র ভূমিকা রাখার কথা ছিল। কিন্তু সেটি বিলুপ্ত হলে বিচার বিভাগের সেই স্বায়ত্তশাসনের পথ আবার সংকুচিত হয়ে পড়বে।


সংসদীয় বিশেষ কমিটির এই সুপারিশের পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, অধ্যাদেশগুলো যথাযথ পর্যালোচনা ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রণয়ন করা হয়নি। তাই সেগুলো আইনে পরিণত করার আগে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তবে আইনজ্ঞরা বলছেন, এই যুক্তি দেখিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো বাতিল করা হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অর্জনের পথ আরও দীর্ঘ হয়ে যাবে। তবে আইনজ্ঞরা বলেন, সরকার চাইলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, যেখানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জবাবদিহিতাও বজায় থাকবে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা।
এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই অধ্যাদেশগুলো বাতিলের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করার যে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা কার্যত শেষ হয়ে গেল। এটি বিচার বিভাগের জন্য একটি বড় ধরনের পশ্চাৎপদতা।’ তার মতে, বিচার বিভাগকে কার্যকরভাবে স্বাধীন করতে হলে প্রশাসনিক ও নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নির্বাহী বিভাগের বাইরে রাখতে হবে।


প্রায় একই ধরনের মত প্রকাশ করেছেন আরেক আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখে আসছি। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত সেই স্বপ্নকে অনেকটাই ধূলিসাৎ করে দিল। এখন বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব আরও বাড়বে, যা ন্যায়বিচারের জন্য ভালো সংকেত নয়। এই ধরনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থাকে দুর্বল করতে পারে।’


সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম ভিউজ বাংলাদেশকে, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ছিলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু সেগুলো বাতিল হওয়ায় সেই অগ্রযাত্রা থেমে গেল। এখন আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা আমাদের আতঙ্কিত করছে। একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে না। আর এখন বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকবে কি-না তা নিয়ের সংশয় দেখা দিয়েছে।’


তবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এ বিষয়ে ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, এর সংশোধনী এবং বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হলেও স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার পথে কোনো বাধা সৃষ্টি হবে না।’ তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল কোনো একটি অধ্যাদেশের ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি সংবিধান, বিচারিক নীতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়। বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই বিচার বিভাগের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা সম্ভব। এখন বিচার বিভাগের দক্ষতা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই অধ্যাদেশ বাতিলকে নেতিবাচকভাবে না দেখে, সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার উন্নয়নের দিকেই নজর দেওয়া উচিত।’

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ