বিচারাধীন ৪৬ লাখ মামলার পাহাড় দেশের আদালতে
ন্যায়বিচার কেবল আদালতের রায়ে সীমাবদ্ধ নয়; সময়মতো বিচার পাওয়াও ন্যায়বিচারের অন্যতম শর্ত। কিন্তু বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সামনে দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে মামলার ক্রমবর্ধমান জট। নতুন মামলা দায়েরের গতি যত দ্রুত, নিষ্পত্তির হার অনেক ক্ষেত্রেই তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না। ফলে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা মামলার সংখ্যা এখন পৌঁছেছে প্রায় ৪৬ লাখ ৪০ হাজারে। এর প্রভাব পড়ছে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষসহ সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার ওপর।
আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে ৫ লাখ ৬১ হাজার ৪৪টি দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা। অন্যদিকে দেশের সব অধস্তন আদালত মিলিয়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি। সব মিলিয়ে দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি। চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩৮ হাজার ৭১৩টি। এর মধ্যে ২১ হাজার ৬৫২টি দেওয়ানি এবং ১৭ হাজার ৬১টি ফৌজদারি মামলা। অন্যদিকে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১টি মামলা। এর মধ্যে ১ লাখ ১ হাজার ১৬৮টি দেওয়ানি এবং ৪ লাখ ২১ হাজার ১৬৩টি ফৌজদারি মামলা। অর্থাৎ হাইকোর্টের বিচারাধীন মামলার বড় অংশই ফৌজদারি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ আদালতে বিপুলসংখ্যক রিট, আপিল, জামিন আবেদন, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এবং গুরুত্বপূর্ণ ফৌজদারি মামলার চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। একই সঙ্গে অধস্তন আদালতের অনেক মামলাও পর্যায়ক্রমে উচ্চ আদালতে চলে আসায় মামলার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বিচারকদের ওপর কর্মচাপও বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে।
তবে মামলার জটের মধ্যেও নিষ্পত্তির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে আইনমন্ত্রীর মো. আসাদুজ্জা্মান এ ব্যাপারে ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘২০২৫ সালে আপিল বিভাগে ৭ হাজার ৫৫৩টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৫৫ হাজার ৭৫৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। দুই বিভাগ মিলিয়ে মোট নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৩ হাজার ৩০৯টি মামলা। যদিও একই সময়ে নতুন মামলা দায়েরের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকায় বিচারাধীন মামলার মোট সংখ্যা এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে দেশের অধস্তন আদালতগুলোতেই মামলার সবচেয়ে বড় চাপ বহন করতে হচ্ছে। ৩১ মার্চ পর্যন্ত এসব আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি। এর মধ্যে ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৩টি দেওয়ানি এবং ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮৯টি ফৌজদারি মামলা। অর্থাৎ মোট বিচারাধীন মামলার অর্ধেকেরও বেশি ফৌজদারি মামলা।’ তিনি জানান, গত এক বছরে অধস্তন আদালতগুলোতে মোট ২ লাখ ৭৫ হাজার ৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ হাজার ৭৩টি দেওয়ানি এবং ২ লাখ ২৬ হাজার ১১টি ফৌজদারি মামলা।
তবে আইনমন্ত্রীর এই সংখ্যাটি ইতিবাচক হলেও বিচারাধীন মামলার মোট পরিমাণের তুলনায় তা এখনও সীমিত উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মো. ওমর ফারুক ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘মামলার জট তৈরি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বিচারকের স্বল্পতা, নতুন আদালতের সীমিত সক্ষমতা, বারবার সময় প্রার্থনা, তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, সরকারি সংস্থার বিপুলসংখ্যক মামলা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপের জটিলতা—সব মিলিয়ে একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় লেগে যায়। বিশেষ করে দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আদালতের দ্বারস্থ থাকার ঘটনাও বিরল নয়।’
এই বাস্তবতায় মামলার জট কমাতে সরকার বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কাঠামোগত উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিচার বিভাগের সক্ষমতা বাড়াতে বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে ৫৩৬টি বিচারকের পদ সৃষ্টি করেছে। এছাড়া ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে আদালতের সহায়ক কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে। সরকার সম্প্রতি বিচারিক অবকাঠামো সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ৬৫০টি সিভিল জজ ও সিনিয়র সিভিল জজ আদালত, ৪০৬টি যুগ্ম দায়রা জজ আদালত এবং ২০৪টি অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব আদালতের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন বিচারকের পদ সৃষ্টির বিষয়টিও সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। এসব পদ পূরণ হলে মামলার নিষ্পত্তির গতি আরও বাড়বে বলে আশা করছি।’
এদিকে বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে আদালতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, ই-ফাইলিং, ভার্চুয়াল শুনানি, ডিজিটাল কজলিস্ট, মামলার তথ্য অনলাইনে পর্যবেক্ষণ এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতির কার্যকর প্রয়োগের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আদালতের সংখ্যা বা বিচারক বাড়ালেই হবে না; বিচার ব্যবস্থার দক্ষতা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং মামলার অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমাতে সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। কারণ, বিচারপ্রার্থী মানুষের কাছে ন্যায়বিচারের মূল্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই বিচার আসে যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে। আর প্রায় ৪৬ লাখ বিচারাধীন মামলার ভারে ন্যায়ের সেই পথ এখনো দীর্ঘ এবং কঠিন।
মতামত দিন