Views Bangladesh Logo

শোনা গেল আগাম বর্ষার আগমনী বার্তা

তীব্র গরমে পুরছে দেশ। তাপপ্রবাহ বইছে প্রায় সারা দেশে। সবার প্রাণ যেন ওষ্ঠাগত। এরই মধ্যে সুখবর দিলো আবহাওয়া অফিস। দিলো বর্ষার আগাম আগমনী বার্তা। সঙ্গে দিলো তাপপ্রবাহ প্রশমনের পূর্বাভাস।

বাংলা বর্ষপঞ্জির আষাঢ় ও শ্রাবণ- এই দুই মাস বর্ষাকাল হিসেবে পরিচিত। সাধারণত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রবেশের মাধ্যমে দেশে বর্ষার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। তবে এবার স্বাভাবিক সময়ের আগেই বর্ষার আগমনের খবর দিলো আবহাওয়া অধিদফতর। আগামী ১০ জুন (বর্ষা ঋতু শুরু হওয়া আগেই) টেকনাফ উপকূল দিয়ে মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে এবং ১৬ জুনের মধ্যে তা সারা দেশে বিস্তার লাভ করবে- ভিউজ বাংলাদেশেকে এমনটাই জানিয়েছে ঢাকা আবহাওয়া অফিস।

আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, লা নিনা সক্রিয় থাকায় এ বছর দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু স্বাভাবিক সময়ের একটু আগেই বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করছে। তার মতে, জুন দ্বিতীয় সপ্তাহেই দেশের অধিকাংশ এলাকায় মৌসুমি বায়ুর প্রভাব বিস্তার লাভ করতে পারে। এ পরিস্থিতির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে ‘লা নিনা’। এটি ‘এল নিনো’র বিপরীত জলবায়ুগত অবস্থা। লা নিনা সক্রিয় থাকলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বায়ুপ্রবাহের স্বাভাবিক ধরণে পরিবর্তন ঘটে এবং উষ্ণ জলরাশি পশ্চিম দিকে সরে যায়। ফলে সমুদ্রের গভীর থেকে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা পানি উপরের স্তরে উঠে আসে। এতে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যায়।

কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ গত ৩ জুন নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের টেকনাফ উপকূল দিয়ে প্রবেশ করবে। এরপর পর্যায়ক্রমে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, কুমিল্লা, ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে মৌসুমি বায়ুর বিস্তার ঘটবে এবং তা ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে উঠবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হওয়ার পর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা, ঝিনাইদহ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, মাগুরা, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, বরগুনা, বরিশাল, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলায় তুলনামূলক বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এরই মধ্যে দেশে প্রাক-মৌসুমি বায়ুর প্রভাব শুরু হয়েছে। এর ফলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রশমিত হতে পারে চলমান তাপপ্রবাহ।

আবহাওয়াবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, এল নিনো সাধারণত তাপপ্রবাহ ও শুষ্ক আবহাওয়ার জন্য দায়ী হলেও লা নিনা বৃষ্টিপাত বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এর প্রভাবে আগাম বর্ষা এবং স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এ বছর লা নিনার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় থাকায় আবহাওয়ার স্বাভাবিক চক্রেও পরিবর্তনের আভাস মিলছে। এ কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশেই আগাম বর্ষার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস ও ভিয়েতনামেও মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক সময়ের আগেই শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, আবহাওয়াবিদ খন্দকার হাফিজুর রহমান বলছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৌসুমি বায়ুর আগমন ও প্রস্থানের স্বাভাবিক সময়সূচিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং বায়ুমণ্ডলীয় অস্থিতিশীলতা এর প্রধান কারণ। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ও বায়ুপ্রবাহের গতিপথ বদলে যাচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকায় মৌসুমি বায়ু দ্রুত শক্তিশালী হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরে সক্রিয় লা নিনার প্রভাব বর্ষাকে এগিয়ে আনতে সহায়তা করেছে।’ আগাম বর্ষার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি একদিকে কৃষকদের জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে বোরো ধান চাষিরা সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে পারলে ক্ষতির ঝুঁকি কমবে। তবে অতিবৃষ্টি বা অসময়ে ভারী বৃষ্টিপাত কৃষির জন্য নতুন ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, আগাম বর্ষার কারণে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এছাড়া আগাম বর্ষা শুরু হলেও তা আগেভাগে শেষ হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং বর্ষাকাল দীর্ঘায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদি বন্যার ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে। তবে বৃষ্টিপাত যদি স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে এবং অস্বাভাবিক অতিবৃষ্টি না হয়, তাহলে প্রকৃতি ও কৃষির জন্য আগাম বর্ষা ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে বলেও মত দেন তিনি।

এদিকে প্রতিবেশী ভারতেও মৌসুমি বায়ুর আগমন ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) কেরালা উপকূল দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করায় দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ষাকাল শুরু হয়েছে। ভারতের আবহাওয়া অধিদফতর (আইএমডি) জানিয়েছে, ৪ জুন থেকে কেরালা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে মৌসুমি বায়ুর অগ্রগতির জন্য অনুকূল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ফলে রাজ্যটির বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে ব্যাপক বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভারত ও বাংলাদেশের ওপর একযোগে সক্রিয় হওয়া মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চলতি মৌসুমে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি হতে পারে। ফলে একদিকে যেমন তাপপ্রবাহ থেকে স্বস্তি মিলবে, অন্যদিকে বন্যা ও ভূমিধসের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতিও জরুরি হয়ে উঠেছে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ