Views Bangladesh Logo

নাসার আর্টেমিস-২: ৫৩ বছর পর কেন চাঁদে ফিরছে মানুষ?

প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক পর আবারও চাঁদের পথে পা বাড়ালো মানুষ। গত ১ এপ্রিল নাসার আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারীকে নিয়ে ওরিয়ন মহাকাশযানটি উড়ে গেছে চাঁদের উদ্দেশ্যে। তাদের ১০ দিনের যাত্রা শেষে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসার কথা।

যদিও আর্টেমিস-২ নামক নভোযানের চারজন মহাকাশচারীর কেউই চাঁদের পৃষ্ঠে পা রাখবেন না। একারনে, চাঁদে আবার কোনো মানুষের পা পড়তে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে অন্তত আর্টেমিস-৪ এর জন্য, যা ২০২৮ সালের বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে নাসা'র। চাঁদে পদচারণা না হলেও বেশকিছু বিষয়ের কারনে আর্টেমিস-২ অন্যান্য অভিযান থেকে আলাদা। সব পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, এই অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি হবে সোমবার (৬ এপ্রিল) যখন ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের দূরবর্তী অংশটি দেখতে পাবেন, এবং ছবি তুলতে পারবেন আর্টেমিস-২ এর নভোচারীরা।

শেষবার মানুষ চাঁদের কাছাকাছি গিয়েছিল ১৯৭২ সালে, অ্যাপোলো ১৭ মিশনের সময়। এরপর দীর্ঘ ৫৩ বছর কেটে গেলেও কেউ পৃথিবীর কক্ষপথ পেরিয়ে যাননি। তাই প্রশ্ন থেকেই যায় কেনই বা নাসা আবারও চাঁদে যাওয়ার উদ্যোগ নিল। 

কেন আবার চাঁদে যাচ্ছে নাসা?
নাসা বলছে, আর্টেমিস-২ শুধু অতীতের পুনরাবৃত্তি নয়, এটি নতুন প্রযুক্তির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ওরিয়নের জীবনধারণ ব্যবস্থা, ইঞ্জিন, বিদ্যুৎ ও নেভিগেশন—সবকিছু বাস্তব মহাকাশ পরিস্থিতিতে প্রথমবারের মতো পরীক্ষা হবে এই অভিযানে।

নভোচারীরা প্রথমে পৃথিবীর কক্ষপথে ওরিয়ন চালাবেন, অন্যান্য যানের সঙ্গে ডকিংয়ের মহড়াও দেবেন। এরপর প্রায় ৪৬ হাজার মাইল দূর পাড়ি দিয়ে চাঁদের চারপাশে ঘুরে ফিরে আসবেন। এই মিশনের তথ্যই আগামী দিনের অভিযানের ভিত গড়বে। ২০২৭ সালে আর্টেমিস-৩ চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নামার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে নাসা। আর ২০২৮ সালে আসবে আর্টেমিস-৪, যা নিয়ে চাঁদে আবারও নামার পরিকল্পনা করছে নাসা।

নতুন মুখ, নতুন উদ্যম
নভোচারী দলেও এসেছে বৈচিত্র্য। ক্রুতে আছেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রিস্টিনা কক ও ভিক্টর গ্লোভার, সঙ্গে রয়েছেন কানাডীয় মহাকাশ সংস্থার জেরেমি হ্যানসেন। অ্যাপোলো যুগের সাদা-কালো পুরুষ আধিপত্যের বাইরে এসে নাসা দেখাতে চায়, এখন মহাকাশ সবার জন্য উন্মুক্ত। এই মিশনে রিড ওয়াইজম্যান কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ভিক্টর গ্লোভার পাইলট হিসেবে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে চাঁদের মিশনে গিয়েছেন। ক্রিস্টিনা কচ মিশন স্পেশালিস্ট হিসেবে প্রথম নারী হিসেবে চাঁদে পাড়ি জমিয়েছেন। জেরেমি হ্যানসেন মিশন স্পেশালিস্ট হিসেবে প্রথম অ-মার্কিন হিসেবে এই অনন্য গৌরবের অংশীদার হয়েছেন।

ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট
নভোচারীদের বহন করছে স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেট। এটি এখন পর্যন্ত তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট। উৎক্ষেপণের সময় এটি ৮.৮ মিলিয়ন পাউন্ড থ্রাস্ট তৈরি করে যা প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার কর্ভেট ইঞ্জিনের শক্তির সমান।

অত্যাধুনিক ক্যামেরায় ঝকঝকে চাঁদ
১৯৬০-এর দশকের ঝাপসা দৃশ্য আর নয়। আর্টেমিস-২ তে বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক ক্যামেরা। সেসব থেকে পৃথিবীতে প্রেরিত হবে চাঁদের অতি-উচ্চ মানের ভিডিও। দর্শকেরা চাঁদের গর্ত আর তারার আলো দেখতে পাবেন যেন তারা নিজেরাই ককপিটে বসে আছেন। 

এই মিশনে নভোচারীরা চাঁদের এমন অংশ দেখবেন, যা সবসময় পৃথিবীর বিপরীত দিকে থাকে এবং মানুষ আগে সরাসরি চোখে দেখেনি। এর মধ্যে রয়েছে বিশাল ‘ওরিয়েন্টালে বেসিন’, যার বিস্তৃতি প্রায় ৯৬৫ কিলোমিটার। এই গহ্বরটি চাঁদের নিকট ও দূরবর্তী অংশের মাঝামাঝি একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর এলাকা, যা আগে মানুষের চোখে দেখা হয়নি।


মঙ্গল যাত্রার প্রস্তুতি
চাঁদই শেষ লক্ষ্য নয়। নাসা আর্টেমিস মিশনকে ব্যবহার করছে মঙ্গল অভিযানের মহড়া হিসেবে। ২০৩০-এর দশকে মানুষকে মঙ্গলে পাঠানোর জন্য প্রতিটি সিস্টেমকে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই ১০ দিনের অভিযান সেই দীর্ঘ পথেরই প্রথম ধাপ।

নীরব প্রতিযোগিতা
মহাকাশ প্রতিযোগিতা আবার জেগে উঠেছে। সম্প্রতি চীনের একাধিক মনুষ্যবিহীন নভোযান চাঁদে অবতরণ হয়েছে এবং তারাও এ দশকের শেষ নাগাদ নিজেদের নভোচারী পাঠানোরও পরিকল্পনা করছে। নাসা স্পষ্ট জানিয়েছে, প্রতিযোগীর কথা মাথায় রেখেই তাদের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। চাঁদে ফেরা বিজ্ঞানের জন্য যেমন, তেমনি নেতৃত্ব ধরে রাখার জন্যও জরুরি।

২০৩০ সালে একই অঞ্চলের জন্য চীনের পরিকল্পিত মানববাহী অভিযানের চেয়ে নিজেদের এগিয়ে রাখতে চাইছে নাসা। একারণেই মহাকাশ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই বেশি প্রাচুর্যপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে প্রবেশাধিকার চায়, কেননা চাঁদে দুর্লভ মৃত্তিকা মৌল, ধাতু ও জলের মতো সম্পদ রয়েছে। যদিও, ১৯৬৭ সালের জাতিসংঘ মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী, কোনো দেশই চাঁদের মালিক হতে পারবে না।


চাঁদে পানি, সম্ভাবনা নতুন বসতির
বিজ্ঞানীরা আগে ভাবতেন চাঁদ সম্পূর্ণ শুষ্ক। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে চাঁদের স্থায়ী ছায়াপাতিত গহ্বরে বরফ আকারে পানি রয়েছে। এই পানি ভবিষ্যতে ব্যবহার করা যেতে পারে—পান করার জন্য, অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনে ভাঙার মাধ্যমে জ্বালানি ও শ্বাস-প্রশ্বাসের উপকরণ তৈরি করতে। সেই সম্ভাবনাই চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে নাসাকে।

বিজ্ঞানীরা চাঁদকে একটি টাইম ক্যাপসুলও মনে করেন। বায়ুমণ্ডল ও ভূত্বকের চলাচল না থাকায় চাঁদের পৃষ্ঠে অক্ষত অবস্থায় সুরক্ষিত আছে বিলিয়ন বছর পুরনো উল্কাপাতের ইতিহাস। সেই ইতিহাস থেকে সৌরজগতের শুরুর দিনগুলোরও খোঁজ মিলতে পারে।

১৯৭২ সালে অ্যাপোলো-১৭ অভিযানে সর্বশেষ ২ নভোচারী চাঁদে নেমেছিলেন। তাদের আগে আরও ১০ জন এই গৌরবের অংশীদার হন। প্রথম মানুষসহ চন্দ্রাভিযান হয়েছিল ১৯৬৯ সালে, অ্যাপোলো ১১ ক্যাপসুলের মাধ্যমে।

আপাতত আর্টেমিস-২ যাত্রা করছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছর চাঁদে অবতরণ, এরপর দশকের শেষ নাগাদ চাঁদে স্থায়ী ক্যাম্প এবং শেষ পর্যন্ত মঙ্গলযাত্রা—এটা গল্পের শুরু মাত্র।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ