Views Bangladesh Logo

বিচার বিভাগের ইতিহাসে ঘটনাবহুল বছর

দেশের ইতিহাসে বিচার বিভাগের জন্য অন্যতম ঘটনাবহুল বছর হিসেবে বিবেচিত হবে ২০২৪ সাল। বিচার বিভাগে আমূল পরিবর্তন এসেছে বিদায়ী বছরটিতে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে অর্পণ এবং জাতীয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’ স্থগিতসহ বেশ কয়েকটি আলোচিত রায়, আদেশ, পর্যবেক্ষণ দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ।

অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হত্যা-গণহত্যার অভিযোগে বিচার শুরু হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মন্ত্রী, এমপি, আমলাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের। চট্টগ্রাম আদালতে হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকার আন্দোলনের নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর পর সংঘর্ষে আইনজীবী নিহত হওয়ার ঘটনাও আলোড়ন তোলে বিশ্বজুড়ে।

গুরুত্বপূর্ণ এসব ঘটনা ঘটে ৫ আগস্টের আকষ্মিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। গণআন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে এর আঁচ সবচেয়ে বেশি লাগে বিচার বিভাগে। সুপ্রিম কোর্ট ও দেশের সব বিচারিক আদালতের বিচারপতি ও বিচারক থেকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী- সব ক্ষেত্রে ব্যাপক রদবদল আনে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার। এসব পদের অনেকেই পদত্যাগ করেন, দেয়া হয় নতুন নিয়োগ।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবির মুখে ১০ আগস্ট পদত্যাগ করেন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির সবাই। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন, বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি কাশেফা হোসেনেরও পদত্যাগে সম্পূর্ণ বিচারপতিশূন্য হয়ে পড়ে সর্বোচ্চ আদালত। পদত্যাগের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতি অনুমোদন করলে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। ওই দিনই বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদকে দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর ১২ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত চার বিচারপতিকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। তারা হলেন- বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল করিম, বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক।

১৬ অক্টোবর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবিতে হাইকোর্টের ১২ জন বিচারপতিকে ছুটিতে পাঠান নতুন প্রধান বিচারপতি। তারা হলেন- বিচারপতি নাইমা হায়দার, বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ, বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাস, বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার, বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামান, বিচারপতি আতাউর রহমান খান, বিচারপতি শাহেদ নূর উদ্দিন, বিচারপতি মো. আক্তারুজ্জামান, বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলাম, বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলন, বিচারপতি খিজির হায়াত, বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামান। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল আজিজ আহমেদ ভূঞা জানান, ১২ জন বিচারপতিকে বেঞ্চ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি।

১৯ নভেম্বর পদত্যাগ করেন হাইকোর্টের তিন বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক। রাষ্ট্রপতি তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন। প্রায় পাঁচ বছর ধরে বিচারকাজ থেকে বিরত রাখা হয়েছিলো তাদেরকে।

জুলাই-আগস্টের হত্যা ও গণহত্যার কয়েকটি মামলায় ১৭ অক্টোবর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজার নেতৃত্বে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তাদেরকে ১৮ নভেম্বরের মধ্যে ট্রাইবুনালে হাজিরেও নির্দেশ দেয়া হয়। ১৮ নভেম্বর কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, লে. কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) ফারুক খান, তৌফিক এলাহী চৌধুরী, গাজী গোলাম দস্তগীর, কামাল আহমেদ মজুমদার, শাজাহান খান, সাবেক সচিব জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবং জুনাইদ আহমেদ পলককে। একটি গণহত্যার মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তদন্ত রিপোর্ট দিতে একমাসের সময় এবং অন্য মামলায় শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রী-উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রীসহ মোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের জেরে ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে হট্টগোল হয়। এমনকি রায়ে বিরূপ মন্তব্যকারী একজন সিনিয়র বিচারপতিকে লক্ষ্য করে ডিম ছুড়ে মারেন এক আইনজীবী। ২৮ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বিবৃতিতে জানান, গত ২৭ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে যে নজিরবিহীন অনভিপ্রেত ঘটনাবলি সংঘটিত হয়েছে এবং দেশের জেলা আদালতগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেসব বিষয় সম্পর্কে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন তিনি। বলেন, ‘দেশের আদালতগুলো যেন বিচারপ্রার্থীদের নির্বিঘ্নে বিচারসেবা দিতে পারেন, সে লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট সামগ্রিক বিষয়াবলী নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন’। এতে আরও বলা হয়, ‘সুপ্রিম কোর্ট আশ্বস্ত করছেন যে, সব প্রতিকূলতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সত্ত্বেও দেশের আদালতগুলোতে বিচারসেবা প্রদান অব্যাহত রয়েছে। দেশের আদালতগুলোতে এরূপ পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন এবং দেশের সব আদালত ও ট্রাইব্যুনালকে তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রেখে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বিচারপ্রার্থী জনগণকে বিচারসেবা দেয়ার ধারা অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি’।

সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পঞ্চদশ সংশোধনী কিছু অংশ অবৈধ বলে ১৭ ডিসেম্বর রায় দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ রায়ে বলেন, ‘সংবিধানের যে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করা হয়েছিল, তার কিছু অংশ বাতিল করা হলো। তার জায়গায় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরল’।

পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, ‘৭ মার্চ, জাতির পিতা ও ২৬ মার্চ ইস্যু বহাল থাকবে। এগুলো পরবর্তী সংসদের বিষয়’।

জাতীয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’ঘোষণা দিয়ে হাইকোর্টের রায় গত ১০ ডিসেম্বর স্থগিত করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানি নিয়ে এ আদেশ দেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে আপিল বেঞ্চ।

৭ ডিসেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘বিদ্বেষমূলক বক্তব্য’ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থাকা বিদ্বেষমূলক বক্তব্যগুলো সরিয়ে ফেলতে বিটিআরসিকে নির্দেশ দেয়া হয়। প্রসিকিউশনের আবেদনের শুনানি নিয়ে এসব আদেশ দেন চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

১ ডিসেম্বর একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলার আপিলের রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সব আসামিকে খালাস দেন বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ। রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, ‘গ্রেনেড হামলার এই মামলায় কোনো চাক্ষুষ সাক্ষী ছিলেন না। ২৫ জন সাক্ষীর কেউই বলেননি, আমি গ্রেনেড ছুড়েছি বা ছুড়তে দেখেছি। শোনা সাক্ষীর ওপর ভিত্তি করে রায় দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত। তাই ওই রায় বাতিল করা হলো।’

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নভেম্বর ও ডিসেম্বরে অব্যাহতি দিয়েছেন উচ্চ আদালত।

বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছ থেকে সংসদ সদস্যদের হাতে আনা-সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে করা রিভিউ আবেদন ২০ অক্টোবর নিষ্পত্তি করেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারপতির আপিল বেঞ্চের ওই রায়ে দীর্ঘ আট বছর পর নিষ্পত্তি হয় গুরুত্বপূর্ণ এ রিভিউ মামলার। ফলে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে চলে আসে।

২৪ নভেম্বর রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মারা যান সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. রুহুল আমিন। ১৬ নভেম্বর ভোর চারটা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান সাবেক প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ