Views Bangladesh Logo

অভিবাসন: এক অন্তহীন আলোচনার বিষয়

Parvez  Babul

পারভেজ বাবুল

বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ জেলার বাসিন্দা হতদরিদ্র বজলুর রহমানের (২৮) দুরবস্থার কথা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলাম। তিনি সম্প্রতি আফ্রিকার দেশ উগান্ডা থেকে তিন সপ্তাহ পর দেশে ফিরেছেন। ইতালিতে অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে যাওয়ার জন্য তিনি গ্রামের বাড়ির সংলগ্ন তার সমস্ত জমি বিক্রি করেছিলেন এবং ঢাকার একটি ভুয়া ট্রাভেল এজেন্সির দালালের হাতে ১০ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই দালাল প্রতারণা করে তাকে ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে উগান্ডায় পাঠিয়ে দেয়! সেখানে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে এবং ১৭ দিন কারাভোগের পর তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে আমি শুধু তার গল্পই শুনিনি, বরং এমন আরও অনেক নারী-পুরুষের কথা জেনেছি যারা প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন এবং নানাবিধ দুর্ভোগ, অর্থক্ষতি ও হয়রানির পর দেশে ফিরে এসেছিলেন।

বাংলাদেশে বজলুরের মতো মানুষের গল্প খুবই সাধারণ ঘটনা। হাজার হাজার নারী-পুরুষ বিদেশে যাওয়ার জন্য নিজেদের সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করেছেন, চড়া সুদে ঋণ নিয়েছেন এবং দালালদের হাতে টাকা তুলে দিয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, শেষ পর্যন্ত তারা সেই হতভাগ্য মানুষে পরিণত হয়েছেন যাদের সঙ্গে অসাধু দালালরা ইতালি, মালয়েশিয়া, কাতার, সিঙ্গাপুর, ক্রোয়েশিয়া ও অন্যান্য দেশে পাঠানোর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারা দালালদের কাছ থেকে আর কখনোই সেই টাকা ফেরত পাননি; পরিস্থিতি যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ এমনকি আত্মহত্যাও করেছেন, আবার কেউ কেউ দালালদের হাতে প্রাণও হারিয়েছেন!

তাই পরিস্থিতি বিবেচনা করে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, ঝুঁকি এবং জানমালের ক্ষতি এড়াতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সর্বোপরি, মানুষকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে—অসাধু দালাল ও মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে সমুদ্রপথে নৌকায় করে প্রাণঘাতী যাত্রার চেয়ে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসন নিঃসন্দেহে অনেক ভালো একটি সুযোগ।

বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত অভিবাসনের বর্তমান পরিস্থিতি
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত অভিবাসন একটি ক্রম-তীব্রতর সংকট হয়ে উঠছে। ধীরগতিতে চলমান বিভিন্ন প্রক্রিয়া এবং আকস্মিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ১ কোটি ৩৩ লক্ষ (১৩.৩ মিলিয়ন) পর্যন্ত মানুষ অভ্যন্তরীণ অভিবাসীতে পরিণত হতে পারে।

উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লোনা পানির আগ্রাসন কৃষিজমি ধ্বংস করছে ও সুপেয় পানিকে দূষিত করছে। পূর্বাভাস বলছে যে, উপকূলীয় এলাকার ১৭ শতাংশ পর্যন্ত ভূমি তলিয়ে যেতে পারে, যার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে।

নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের সন্ধানে প্রতিদিন হাজার হাজার স্বল্প আয়ের অভিবাসী শহরের কেন্দ্রগুলোতে—বিশেষ করে ঢাকায়—আসে। মানুষের এই বিপুল আগমন অনানুষ্ঠানিক বসতি বা বস্তি এলাকার দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটায়; আর এসব বস্তির বাসিন্দাদের মধ্যে জলবায়ুজনিত অভিবাসীরাই প্রায়শই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে থাকে।
ঘনবসতিপূর্ণ শহরে আগত অভিবাসীরা চরম দারিদ্র্য, সরকারি সেবাপ্রাপ্তির অভাব এবং মানবপাচার বা আধুনিক দাসত্বের উচ্চ ঝুঁকির সম্মুখীন হন।
স্থানচ্যুতির ঘটনা নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর অসম প্রভাব ফেলে, যা তাদের আর্থ-সামাজিক বঞ্চনাকে আরও তীব্র করে তোলে।
তাই জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য প্রকৃতি ও সম্প্রদায়-ভিত্তিক অভিযোজন এবং অন্যান্য টেকসই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন অপরিহার্য।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শারমিন্দ নীলোর্মি বলেন, জেন্ডার -সংবেদনশীল জলবায়ু কার্যক্রম এবং এর শাসনব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের সাথে যুক্ত করতে হবে। জলবায়ু অভিযোজন বিষয়টি প্রেক্ষাপট-নির্ভর; তাই এর সমাধানে কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবই নয়, বরং অবকাঠামো, পানি ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত বিষয়গুলোকেও বিবেচনায় নিতে হবে। কার্যকর বাজেট প্রণয়ন ও জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে এসব চালিকাশক্তির সুস্পষ্ট চিহ্নিতকরণ এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও বিশদ উপাত্তের (disaggregated data) জোরালো ব্যবহার প্রয়োজন।

নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসনের জন্য বৈশ্বিক কমপ্যাক্ট
নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসনের জন্য বৈশ্বিক কমপ্যাক্ট (GCM) বিশ্বজুড়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত বিষয়, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা কাজ করে যাচ্ছেন। ‘শরণার্থী ও অভিবাসীদের জন্য নিউইয়র্ক ঘোষণা’ গ্রহণের মাধ্যমে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো মানুষের চলাচলের ক্ষেত্রে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিয়েছে।

এই বৈশ্বিক কমপ্যাক্ট হলো প্রথম আন্তঃসরকার চুক্তি যা আন্তর্জাতিক অভিবাসনের সকল দিককে অন্তর্ভুক্ত করে। এটি আইনত বাধ্যতামূলক নয় এমন একটি সহযোগিতামূলক কাঠামো, যা রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তাদের দায়বদ্ধতাকে সমুন্নত রাখে।

বৈশ্বিক কমপ্যাক্ট অভিবাসন ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করা, বর্তমান বিশ্বে অভিবাসন-সংশ্লিষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা এবং টেকসই উন্নয়নে অভিবাসনের অবদানকে কাজে লাগানোর এক অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করে। এই কমপ্যাক্টটি ‘টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ এজেন্ডা’র ওপর ভিত্তি করে প্রণীত হয়েছে; উক্ত এজেন্ডায় সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসন সহজতর করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিকভাবে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।
‘ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন’ (WARBE Development Foundation) বাংলাদেশে ‘নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসন বিষয়ক বৈশ্বিক কমপ্যাক্ট’ বা জিসিএম (GCM) নিয়ে কাজ করে। ওয়ারবি একটি শীর্ষস্থানীয় সুশীল সমাজ সংগঠন, যা জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে থাকে।
সম্প্রতি ঢাকায় ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন আয়োজিত অংশীজনদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত একটি কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। এই কর্মশালাটি ছিল GCM এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বজুড়ে অভিবাসন সংক্রান্ত বিষয়গুলোর ওপর প্রস্তুতকৃত একটি ‘শ্যাডো রিপোর্ট’ বা বিকল্প প্রতিবেদন বিষয়ক।
অংশগ্রহণকারীরা GCM -এর লক্ষ্যসমূহ (objectives), নির্দেশক নীতিসমূহ (guiding principles) এবং প্রতিশ্রুতির তালিকা অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তাদের মতামত ও পরামর্শ প্রদান করেন। বাংলাদেশ যেসব লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, সেগুলোর মূল সূচকগুলোও স্থানীয় প্রেক্ষাপট ও ভাষায় উপস্থাপন করা হয়। অভিবাসন চক্র এবং GCM -এর সাথে প্রাসঙ্গিক পর্যাপ্ত ও বিশদ তথ্য-উপাত্ত (disaggregated data) এখনও পুরোপুরি লভ্য নয়, তাই সেগুলো পর্যালোচনা করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশের অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, GCM বাস্তবায়নে ‘চ্যাম্পিয়ন দেশ’ হিসেবে বাংলাদেশের অগ্রগতির বিষয়টি পর্যালোচনা করলে অভিবাসী ও সুশীল সমাজের মধ্যে একটি প্রধান ধারণা উঠে আসে—তা হলো, ভালো নীতিমালা থাকলেও সেগুলোর যথাযথ ও আনুপাতিক বাস্তবায়ন ঘটেনি। অভিবাসীরা নিজেরাও জানিয়েছেন যে, তাদের অধিকার, সুরক্ষা ও কল্যাণের জন্য সরকার কী করছে, সে সম্পর্কে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবগত নন। তবে তারা যা জানেন তা হলো, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলো অভিবাসীদের সহায়তার ক্ষেত্রে খুব একটা তৎপর নয়—এমনকি তাদের আচরণও অভিবাসীবান্ধব নয়।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারের প্রতিবেদন ও আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতিগুলোতে নীতিমালার অগ্রগতির চিত্র ফুটে উঠলেও, যেসব ক্ষেত্রে সরকার পিছিয়ে আছে সেগুলোর প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না। এখন সময় এসেছে সেই ঘাটতিগুলো স্বীকার করার এবং GCM-এর লক্ষ্য ও নীতিসমূহ অর্জনের পথে অধিকতর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি গ্রহণের।

বস্তুত, অভিবাসন একটি চিরন্তন ঘটনা এবং এক অন্তহীন আলোচনার বিষয়। অর্থনৈতিক, মানবিক ও সামাজিক লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রচেষ্টায় সরকারগুলোকে যেসব জটিল ও কাঠামোগত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা থেকেই এই অন্তহীন বিতর্কের উদ্ভব।

পারভেজ বাবুল, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অভিবাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করেন। ইমেইল: parvezbabul@gmail.com

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ