একটি যুগের শেষ রাত, মনুমেন্টালে আজ মেসিকে বিদায়ের বিষণ্ন ক্ষণ
কিছু বিদায় কেবল বিদায় নয়—একটি যুগের দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাওয়া। কিছু রাত কেবল রাত নয়—স্মৃতি, আবেগ আর অশ্রুর দীর্ঘ এক মহাকাব্যের শেষ পৃষ্ঠা। আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্সে আজ তেমনই এক রাত নামছে। এস্তাদিও মনুমেন্তালের ঘাসে শেষবারের মতো আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে নামবেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৫টায় বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি তাই নিছক আরেকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ নয়। প্রতিপক্ষের নামটি হয়তো ম্যাচের স্কোরবোর্ডে থাকবে, কিন্তু রাতটির আসল গল্পজুড়ে থাকবেন একজনই—১০ নম্বর জার্সির সেই মানুষটি, যাঁর পায়ের জাদুতে দুই দশক ধরে কোটি মানুষের হৃদয়ে ফুটবল নতুন অর্থ পেয়েছে।
মনুমেন্টালের ৮৫ হাজার আসন যেন আজ গ্যালারি নয়, স্মৃতির এক বিশাল সমুদ্র। কেউ আসবেন শেষবারের মতো মেসিকে দেখতে, কেউ তাঁর দিকে তাকিয়ে নিজেদের কৈশোর খুঁজবেন, কেউ হয়তো চোখ মুছতে মুছতে মনে করবেন সেই প্রথম দিনের কথা—যেদিন এই মাঠেই এক কিশোরের স্বপ্নের শুরু হয়েছিল।
সময়টা ২০০৫। বয়স মাত্র ১৮। আর্জেন্টিনার জার্সিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রথম অধ্যায় শুরু হয়েছিল হাঙ্গেরির বিপক্ষে, কিন্তু অভিষেকটি হয়েছিল দুঃস্বপ্নের মতো। মাঠে নেমে মাত্র এক মিনিটের মধ্যেই লাল কার্ড। অথচ সেই লজ্জার রাত পেরিয়েই শুরু হয়েছিল এক অবিশ্বাস্য যাত্রা।
মনুমেন্টালের মাটিতে পরের অধ্যায়ে অবশ্য মেসিকে আর থামানো যায়নি। পেরুর বিপক্ষে ঘরের মাঠে তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক ম্যাচে আর্জেন্টিনা জিতেছিল ২-০ গোলে। সেদিন হয়তো কেউ জানতেন না, এই মাঠই একদিন হয়ে উঠবে তাঁর ফুটবল-জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন ঠিকানাগুলোর একটি।
পরিসংখ্যানও যেন সেই সম্পর্কের সাক্ষী। মনুমেন্তালে মেসি খেলেছেন ২৮টি ম্যাচ। কোনো ম্যাচেই হারেনি আর্জেন্টিনা। এই মাঠে তাঁর গোল ১৯টি, অ্যাসিস্ট ১১টি। একই ভেন্যুতে এর চেয়ে বেশি গোল আর কোনো মাঠে করেননি তিনি। সংখ্যাগুলো তাই শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি গোল যেন ছিল নিজের মানুষের জন্য ফেরত দেওয়া এক টুকরো ভালোবাসা।
দুই দশক পর আজ সেই একই মাঠে গল্পটির বৃত্ত পূর্ণ হতে যাচ্ছে।
একসময় যে কিশোর এই মাঠে স্বপ্নের দরজা খুলেছিলেন, আজ সেই তিনিই দাঁড়িয়ে আছেন বিদায়ের দরজায়। বয়সের কাঁটা চল্লিশের কাছাকাছি। শরীর আগের মতো সাড়া দেয় না, কিন্তু পায়ের জাদু এখনো হারিয়ে যায়নি। তবে সময় কাউকে চিরকাল একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার অনুমতি দেয় না।
মেসির গল্পটা শুধু গোল, ট্রফি আর রেকর্ডের গল্প নয়। এর ভেতরে আছে পরাজয়ের দীর্ঘ ছায়া, হতাশার রাত, অবসরের ঘোষণা, ফিরে আসার সাহস এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের সেই বহুল প্রতীক্ষিত সোনালি স্পর্শ।
আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতার নাম। ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে সেই অপূর্ণতা পূর্ণ হওয়ার পর যেন গল্পটি পেয়েছিল তার কাঙ্ক্ষিত পূর্ণচ্ছেদ। দেশকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে মেসি তখন শুধু একটি ট্রফি জেতেননি; নিজের সঙ্গে চলতে থাকা দীর্ঘ এক যুদ্ধও জিতে নিয়েছিলেন।
তারপরও বিদায়ের মুহূর্তটি সহজ নয়। নিউজার্সির হৃদয়ভাঙা ফাইনালের পর যে অবসরের ভাবনা তাঁকে ছুঁয়ে গিয়েছিল, তার পেছনে ছিল ক্লান্তি, বেদনা ও ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শূন্যতা। বাবার ছায়া হারানোর বেদনা, প্রিয় জার্সির জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম, সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেও সময়ের নির্মম বাস্তবতা—সব মিলিয়ে মেসির বিদায় যেন একজন ফুটবলারের নয়, একজন মানুষেরও দীর্ঘ পথচলার শেষ বাঁক।
তাই আজ মনুমেন্টালে যখন বাঁশি বাজবে, ৯০ মিনিটের হিসাব হয়তো খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ থাকবে না। গুরুত্বপূর্ণ হবে প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি পাস। গুরুত্বপূর্ণ হবে গ্যালারি থেকে উঠে আসা সেই একসঙ্গে উচ্চারিত নাম—‘মেসি! মেসি! মেসি!’
কারণ মেসিকে বিদায় জানানো মানে শুধু একজন ফুটবলারকে বিদায় বলা নয়। মানে নিজের জীবনের একটি সময়কে বিদায় বলা। যে শৈশব মেসির গোল দেখে কেটেছে, যে কৈশোর তাঁর ড্রিবলে মুগ্ধ হয়েছে, যে যৌবন তাঁর বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে কেঁদেছে, আজ সেই প্রজন্মের চোখেই জমবে বিদায়ের জল।
বেনিন থাকবে প্রতিপক্ষ হিসেবে। কিন্তু আজ প্রতিপক্ষের চেয়েও বড় হয়ে উঠবে সময়।
মনুমেন্টালের ঘাসে আজ একটি যুগের শেষ দৃশ্য মঞ্চস্থ হবে। আকাশি-সাদা জার্সির ১০ নম্বরটি হয়তো আর কখনো একইভাবে মাঠে ফিরবে না। তবে মেসির গল্প কি সত্যিই শেষ হবে?
না। কিছু মানুষ অবসর নেন, কিন্তু তাঁদের গল্প অবসর নেয় না। আজ শুধু শেষবারের মতো বলা হবে— গ্রাসিয়াস, মেসি।
দুই দশকের মায়া, কোটি হৃদয়ের ভালোবাসা আর একটি দেশের ফুটবল-স্বপ্নকে নিজের পায়ের জাদুতে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য—ধন্যবাদ গ্রাসিয়াস, মেসি।
মতামত দিন