Views Bangladesh Logo

লক্ষ্য টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়

ম্যারাডোনার অধরা স্বপ্ন পূরণে মাঠে নামছে মেসির আর্জেন্টিনা

বিশ্বকাপ জয়ের চেয়ে কঠিন কাজ যদি কিছু থেকে থাকে, তবে সেটি হলো শিরোপা ধরে রাখা। ফুটবল ইতিহাসে মাত্র দুটি দল সেই কীর্তি গড়তে পেরেছে—১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে ইতালি, এরপর ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে ব্রাজিল। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে আর কোনো দল টানা দুই বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। এবার সেই ইতিহাস বদলানোর লক্ষ্য নিয়েই কাল বুধবার মাঠে নামছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। একই সঙ্গে এটি হতে পারে লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ, আর তাই দিয়েগো ম্যারাডোনার অপূর্ণ রেখে যাওয়া টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণের সুযোগও।

বুধবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় কানসাস সিটির ৭৬ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে লিওনেল স্কালোনির দল। প্রতিপক্ষ আফ্রিকার শক্তিশালী দল আলজেরিয়া। কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকলেও বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের চাপ সব সময়ই আলাদা।

বিশ্বকাপে আসার আগে দারুণ ছন্দে রয়েছে আলবিসেলেস্তেরা। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা দলটি শেষ সাত ম্যাচেই জয় পেয়েছে। এই সময়ে করেছে ২১ গোল, হজম করেছে মাত্র একটি। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের কঠিন বাছাইপর্বেও আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ১৮ ম্যাচে ৩৮ পয়েন্ট নিয়ে সবার আগে থেকেই বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে তারা।

তবে এই যাত্রা একেবারে নিখুঁত ছিল না। ঘরের মাঠে উরুগুয়ের কাছে হার, প্যারাগুয়ের বিপক্ষে পরাজয় কিংবা ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ড্র মনে করিয়ে দিয়েছে, আর্জেন্টিনাও ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। আবার পাঁচটি ম্যাচে মাত্র ১-০ ব্যবধানে জয় দেখিয়েছে, প্রয়োজন হলে ধৈর্য ধরে ফল বের করে আনার মানসিক শক্তিও রয়েছে স্কালোনির দলের।

বাছাইপর্বের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে দুই লেগেই হারানো। রিও ডি জেনিরোতে ১-০ জয়ের পর বুয়েনস আয়ার্সে ৪-১ গোলের বিধ্বংসী জয় শুধু আর্জেন্টিনার শক্তিরই প্রমাণ দেয়নি, বরং ব্রাজিলের কোচ দরিভাল জুনিয়রের বিদায়ের অন্যতম কারণও হয়ে দাঁড়ায়।

গোলপোস্টে দেয়াল এমিলিয়ানো মার্টিনেজ
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অসাধারণ সেভ, পেনাল্টিতে মানসিক দৃঢ়তা এবং ডিফেন্সকে সংগঠিত রাখার দক্ষতায় তিনি এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক। বিশ্বকাপে তার অভিজ্ঞতা দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।

রক্ষণভাগের ভরসা রোমেরো-ওতামেন্দি
রক্ষণে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও নিকোলাস ওতামেন্দির জুটি স্কালোনির অন্যতম নির্ভরতা। রোমেরোর আগ্রাসী ট্যাকল, দ্রুত বল কেটে নেওয়ার ক্ষমতা এবং ওতামেন্দির অভিজ্ঞতা আর্জেন্টিনার ডিফেন্সকে ভারসাম্য দেয়। দুই ফুলব্যাক নাহুয়েল মোলিনা ও নিকোলাস তাগলিয়াফিকো আক্রমণে উঠে গিয়ে বাড়তি প্রস্থ তৈরি করেন, আবার দ্রুত নিচে নেমে রক্ষণও সামলান।

মাঝমাঠে আর্জেন্টিনার ইঞ্জিন
মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও রদ্রিগো ডি পল স্কালোনির কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। ডি পলের নিরলস পরিশ্রম, বল পুনরুদ্ধার এবং মেসিকে সহায়তা করার ক্ষমতা তাকে দলের 'অদৃশ্য নায়ক' বানিয়েছে। ম্যাক অ্যালিস্টার খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করেন, অন্যদিকে এনজো দীর্ঘ পাস, বলের দখল এবং আক্রমণ গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করেন।

আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু মেসি
৩৯ বছরে পা দিলেও লিওনেল মেসিই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আগের মতো গতি না থাকলেও খেলা পড়ার ক্ষমতা, নিখুঁত পাস, ফ্রি-কিক এবং বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার সামর্থ্য তাকে এখনো বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর ফুটবলার করে রেখেছে। তার পাশে জুলিয়ান আলভারেজের নিরন্তর প্রেসিং, অফ দ্য বল দৌড় এবং গোল করার দক্ষতা আর্জেন্টিনার আক্রমণকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। প্রয়োজন অনুযায়ী লাউতারো মার্টিনেজও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।

তবে দুশ্চিন্তার জায়গাও আছে। অ্যাঞ্জেল দি মারিয়া অবসরের কারণে আর দলে নেই। মেসির বয়সও এখন বড় একটি বাস্তবতা। বিশ্বকাপের আগে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচগুলো থেকেও দলের প্রকৃত শক্তি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এমনকি গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজও স্বীকার করেছিলেন, প্রস্তুতি ম্যাচের পারফরম্যান্সে তিনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিলেন না।

অন্যদিকে প্রথম ম্যাচের আগে আত্মবিশ্বাসী আলজেরিয়া। প্রধান কোচ ভ্লাদিমির পেটকোভিচ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মেসিকে আলাদা করে থামানোর পরিকল্পনা নয়, বরং নিজেদের স্বাভাবিক খেলাতেই বিশ্বাস রাখছেন তারা। তাঁর মতে, বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ সব সময়ই অনিশ্চয়তায় ভরা, তাই চমক দেখানোর সুযোগ থাকেই।

সব হিসাব-নিকাশে গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনা স্পষ্ট ফেবারিট। আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানকে নিয়ে গঠিত গ্রুপ থেকে শেষ ষোলোয় ওঠাই প্রথম লক্ষ্য। এরপর শুরু হবে আসল পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় সফল হতে পারলে আর্জেন্টিনা শুধু বিশ্বকাপের মুকুটই ধরে রাখবে না, বরং ইতালি ও ব্রাজিলের পাশে বসে ফুটবল ইতিহাসে টানা দুই বিশ্বকাপজয়ী তৃতীয় দল হিসেবে নিজেদের নামও লিখিয়ে ফেলবে। আর সেটিই হবে মেসির হাত ধরে ম্যারাডোনার অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের সবচেয়ে বড় গল্প।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ