আদালতের বাইরে হবে মামলা নিষ্পত্তি
সারা দেশে বাধ্যতামূলক হচ্ছে মেডিয়েশন পদ্ধতি
ইংল্যান্ডে ১২১৫ সালে চালু হয় ম্যাগনাকার্টা আইন। এই আইনের কিছুটা পরিবর্তন করে চলছে দেশের ফৌজদারি ও দেওয়ানি আইন, যার অধীনে দেশের বিচারালয়ে প্রায় ৪২ লাখ মামলার স্তূপ জমে আছে। অথচ ব্রিটিশ আইনেই বলা হয়েছে ‘বিচার বিলম্বিত হলে ন্যায়বিচার অস্বীকার করা হয়।’ এমন পরিস্থিতিতে বিচারপ্রার্থীদের সময়, শ্রম ও অর্থের সাশ্রয় করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মামলার জট কমাতে মেডিয়েশন (মধ্যস্থতা) মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি সারা দেশে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জারি করা নির্দেশিকার আলোকে সরকার দেশের সব বিচারিক আদালতে মধ্যস্থতা ব্যবস্থা চালু করছে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৮৯ (এ) ও ৮৯ (সি) ধারা এবং অর্থঋণ আদালতের ২২ ধারাসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনে থাকা মধ্যস্থতা-সংক্রান্ত বিধি-বিধান পালনে নির্দেশিকা জারি করে সুপ্রিম কোর্ট। নির্দেশিকায় মামলার বাদী ও বিবাদীকে নিয়ে আদালতের অনুমতিক্রমে আদালতের বাইরে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিবাদ মীমাংসা করতে বলা হয়। যাতে আদালতে মামলার চাপ কমে। এই পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে তা আদালতকে জানাতে হয় এবং জমা দেয়া কোর্ট ফি পর্যন্ত ফেরত দেয়া হয়। আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকার আলোকে মধ্যস্থতা (মেডিয়েশন) ব্যবস্থা দেশের সব আদালতে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যাতে অধিকাংশ দেওয়ানি মামলা ও কিছু ফৌজদারি মামলাও এই পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি করার জন্য বলা হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত প্রাথমিক ও প্রস্তুতিমূলক দির্দেশনা এরই মধ্যে দেশের সব বিচারিক আদালতে পাঠানো হয়েছে। যেখানে মধ্যস্থতার (মেডিয়েশন) মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সব প্রস্তুতি নেয়ার জন্য বলা হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনা দেয়া হতে পারে। আইন কমিশন থেকে মেডিয়েশনের বিষয়টি আগেই চূড়ান্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আইন কমিশন সূত্র জানায়, কীভাবে মেডিয়েশন পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হবে, তা সুনির্দিষ্ট।
মেডিয়েশন হচ্ছে এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে বাদী ও বিবাদী আদালতের নিয়োগ দেয়া একজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করবেন। বিরোধ নিষ্পত্তির আইন অনুযায়ী বর্ণিত মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ এবং নির্ধারিত দিনের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি না হলে সময় বাড়ানো সুযোগ রয়েছে। বিরোধ নিষ্পত্তি না হলে আবার মামলা করার জন্য পক্ষগণ আদালতে যেতে পারবেন। যিনি মেডিয়েটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তিনি বাদী ও বিবাদীকে তাদের মধ্যকার সমস্যা সমাধানের জন্য একজন সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করেন। মেডিয়েটর সাধারণত একজন নিরপেক্ষ ও প্রশিক্ষিত ব্যক্তি হন।
বাংলাদেশে দুধরনের মেডিয়েশন হয়ে থাকে। একটি হলো ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে। অপরটি হলো কোর্ট অ্যানেক্স (আদালত সংযোজন) মেডিয়েশন। ব্যক্তি পর্যায়ের মেডিয়েশনে পক্ষগণ আদালতে না গিয়ে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে একজন মেডিয়েটর বা মধ্যস্থতাকারীর সহযোগিতা নিয়ে সমস্যার সমাধান করেন। পরে বিরোধ নিষ্পত্তি-সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করেন। উভয় পদ্ধতিতেই হওয়া যে কোনো সিদ্ধান্ত আদালতকে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কোর্ট অ্যানেক্স (আদালত সংযোজন) মেডিয়েশন পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে তা আদালতকে জানালে জমা দেয়া কোর্ট ফিও ফেরত দেয়া হয়। কোর্ট অ্যানেক্স মেডিয়েশন হলো কোনো পক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করলে আদালত সন্তুষ্টচিত্তে পক্ষগণকে মেডিয়েশনে বসার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে আদালত একজন মেডিয়েটরকে ওই মোকদ্দমার বিবদমান বিষয় নিষ্পত্তির জন্য দায়িত্ব অর্পণ করেন।
এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘মেডিয়েশন হচ্ছে একটি পথ, যার মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ পদ্ধতি ব্যাপকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে এবং মামলার জট কমাতে ভূমিকা রাখছে। এই পদ্ধতি সারা দেশে দ্রুত চালু করার সিদ্ধান্তকে অবশ্যই স্বাগত জানাই। তবে দক্ষ মেডিয়েটর প্রতিটি জেলায় রাখতে হবে। নইলে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিরোধ নিষ্পত্তিতে মেডিয়েশন আগামী দিনের বিচার-ব্যবস্থায় সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতিতে পরিণত হবে বলেই আমি মনে করি। আদালতে না ঘুরে দ্রুত ও কম খরচে মামলার নিষ্পত্তি কেবল এই পদ্ধতিতেই সম্ভব। আশা করি আগামী দু-এক মাসের মধ্যেই মেডিয়েশন পদ্ধতি সারা দেশে বাধ্যতামূলকভাবে চালু করা সম্ভব হবে।’
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রচলিত বিচারের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তিতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। লেগে যায় বছরের পর বছর। তবুও মামলার নিষ্পত্তি হয় না। অন্যদিকে মেডিয়েশন পদ্ধতিতে বিরোধ মীমাংসা হলে উভয়পক্ষ বিজয়ী হন। কেউ পরাজিত হন না। উভয় পক্ষের মধ্যে ‘উইন উইন সিচুয়েশন’ বিরাজ করে। তাই মেডিয়েশন পদ্ধতি বাধ্যতামূলক হলে মামলা নিষ্পত্তিতে গতি ফিরে কমবে জট। উপকৃত হবে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষ।’

মতামত দিন