রেকর্ডের রাজত্বে কিলিয়ান এমবাপ্পে: বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলে ছাড়িয়ে গেলেন মেসিকে
ফুটবল ইতিহাস মাঝেমধ্যে নীরবেই মুকুট বদলায়। কোনো ঘোষণা থাকে না, থাকে না রাজ্যাভিষেকের বাজনা। শুধু বলের জালে জড়ানোর একটা মুহূর্ত আর তাতেই বদলে যায় শতাব্দীর হিসেব। মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ঠিক তেমনই এক মুহূর্তের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব। যে সিংহাসনে দীর্ঘদিন ধরে একচ্ছত্র রাজত্ব করছিলেন লিওনেল মেসি, বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণীর রোমাঞ্চকর রাতে নিঃশব্দে সেই আসনে বসে পড়লেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ২১ গোলের যে রেকর্ড এতদিন ছুঁতে পারেনি কেউ, ২৭ বছর বয়সী এই ফরাসি তারকা তা পেরিয়ে গেলেন এক ম্যাচের দুই গোলে। বিশ্ব ফুটবল পেল তার সর্বকালের সেরা গোলদাতাকে।
তবে গল্পটা শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে। ম্যাচের প্রথমার্ধ জুড়ে যেন এক অপ্রতিরোধ্য ইংল্যান্ডের রাজকীয় দাপট দেখল মায়ামি। বুকায়ো সাকার জোড়া গোলে ভর করে বিরতির বাঁশি বাজার আগেই চার-চারটি গোল আদায় করে নেয় থ্রি লায়ন্স। ৪-০ ব্যবধানের সেই স্কোরলাইন দেখে মনে হচ্ছিল, ফরাসিদের জন্য রাতটা বুঝি এক নিঃশব্দ বিদায়ের গল্প হয়ে থাকবে। কিন্তু ফুটবল তো ঠিক এখানেই সবচেয়ে নিষ্ঠুর, আবার এখানেই সবচেয়ে সুন্দর। এই দ্বৈত সত্তাই তো এই খেলার আসল সৌন্দর্য। যেখানে হতাশার মেঘ সবচেয়ে ঘন হয়ে জমাট বাঁধে, ঠিক সেই অন্ধকারতম মুহূর্ত থেকেই মাঝে মাঝে জন্ম নেয় সবচেয়ে অবিস্মরণীয় প্রতিরোধ, সবচেয়ে বিস্ময়কর পুনরুত্থানের গল্প।
বিরতির পর মাঠে ফিরেই যেন অন্য এক এমবাপ্পেকে দেখল বিশ্ব। ৫২ মিনিটে মাইকেল ওলিসের নিখুঁত সহযোগীতায় জালে বল জড়িয়ে প্রতিরোধের প্রথম সুর বাজান তিনি। মাত্র দুই মিনিটের মাথায় অর্থাৎ ৫৪ মিনিটে, এবার নিজে স্রষ্টা হয়ে ব্র্যাডলি বারকোলাকে দিয়ে গোল করিয়ে নেন। তারপর ৬৬ মিনিটে এলো সেই মুহূর্ত, যা শুধু একটি গোল নয় বরং ইতিহাসের পাতা উল্টে দেওয়া এক আঘাত। নিজের দ্বিতীয় গোলে স্কোরলাইন ৪-৩ করার পাশাপাশি নিজের ক্যারিয়ারের সামগ্রিক বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা নিয়ে গেলেন ২২-এ। ছাড়িয়ে গেলেন মেসির ২১ গোলের সেই দুর্ভেদ্য রেকর্ড, যা এতদিন মনে হচ্ছিল অস্পর্শনীয়। মাত্র ১৪ মিনিটের ব্যবধানে তিনটি গোল করে ফরাসিরা যেন প্রমাণ করে দিল, পরাজয়ের মুখেও গর্ব বিসর্জন দেয় না প্রকৃত যোদ্ধারা।
এই এক গোলেই বদলে গেল অনেক হিসেব। ফুটবলের সবচেয়ে সমৃদ্ধ তালিকায়, যেখানে এতদিন সবার ওপরে ছিল মেসির নাম, সেখানে এবার খোদাই হলো এমবাপ্পের নাম। শুধু তা-ই নয়, ফাইনালের আগেই চলতি আসরের গোল্ডেন বুটের দৌড়েও নিজের গোলসংখ্যা ১০-এ নিয়ে গিয়ে মেসিকে (৮ গোল) পেছনে ফেলে দিলেন তিনি। যদিও ফাইনালের মঞ্চে মেসির সামনেও সুযোগ থাকছে সেই ব্যবধান ঘুচিয়ে দেওয়ার।
তবে ফুটবল বড়ই নির্মম এক খেলা, ব্যক্তিগত মহিমার সবচেয়ে উজ্জ্বল রাতেও দলগত সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। এমবাপ্পে যেদিন ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করলেন, ঠিক সেদিনই দলগত জয়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত থাকল তার দল ফ্রান্স। ব্যক্তিগত মহাকাব্যের এই অসামান্য অর্জনও শেষ পর্যন্ত রূপান্তরিত হতে পারল না সম্মিলিত বিজয়ের আনন্দে। শেষদিকের নাটকীয়তার পর ৬-৪ ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ইংল্যান্ড, আর চতুর্থ স্থান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে।
ম্যাচ হয়তো হেরেছেন এমবাপ্পে, কিন্তু ইতিহাসের আদালতে তিনি পরাজিত হননি এতটুকুও। ফুটবল বিধাতা তার খাতায় লিখে দিলেন সাফল্যের শ্রেষ্ঠ গল্প। স্কোরবোর্ডের সংখ্যাগুলো মিলিয়ে যায় সময়ের অবিরাম স্রোতে, ম্যাচের ফলাফল হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। কিন্তু রেকর্ড বই কখনো ভোলে না, চিরকালই মনে রাখে সেই বিরল মুহূর্তগুলোকে; যেখানে সময়কে হার মানিয়ে কেউ একজন খোদাই করে যান নিজের নাম।
মেসির দীর্ঘ ছায়া, যে ছায়ায় বছরের পর বছর ঢাকা পড়ে ছিল ফুটবলবিশ্বের অসংখ্য প্রতিভা। সেই ছায়া পেরিয়ে মায়ামির রাতে নিজের আলোয় উজ্জ্বল হলেন এক তরুণ ফরাসি রাজপুত্র। জয়ের উল্লাস তার সঙ্গী হয়নি ঠিকই, কিন্তু ইতিহাস তাকে দিয়েছে তার চেয়েও বড় স্বীকৃতি; অমরত্বের সেই আসন, যেখানে বসে থাকেন শুধু হাতেগোনা কয়েকজন।
আর ফুটবল! যে খেলাটি প্রতিনিয়ত জন্ম দেয় নতুন নায়কের, বারবার লেখে নতুন কিংবদন্তির গল্প। এমন গল্প লেখা রাতেই খুঁজে পেয়েছে তার নতুন অধিপতিকে। এ যেন এক রাজার নীরব প্রস্থান নয় বরং আরেক রাজার মহিমান্বিত অভিষেক।
মতামত দিন