এক ক্লিকেই ধরা পড়বে বিয়ে-তালাকের গোপন তথ্য
বিয়ে- জীবনের নতুন অধ্যায়ের শুরু। আর তালাক, সেই অধ্যায়ের আকস্মিক সমাপ্তি। দুটিই মানুষের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। অথচ এতদিন এসব ঘটনার সরকারি নথি মূলত কাগজের খাতা আর রেজিস্টারের পাতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে তথ্য গোপন, জাল সনদ, বয়স নিয়ে কারসাজি কিংবা একাধিক বিয়ের মতো ঘটনায় তৈরি হয়েছে জটিলতা। এবার সেই পুরোনো ব্যবস্থার খোলস ভেঙে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন যাচ্ছে ডিজিটাল ব্যবস্থায়। বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, জাল বিবাহ সনদসহ বিবাহসংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি রোধে চালু হচ্ছে অনলাইন নিবন্ধন পদ্ধতি।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অক্টোবর মাসেই বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনে ডিজিটাল পদ্ধতির প্রথম ধাপ চালু হবে। প্রাথমিকভাবে দেশের ১০টি জেলার ১০টি উপজেলার ১০২টি ইউনিয়নে অনলাইনে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হবে। এরপর ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের বিবাহ ও তালাকের তথ্য ডিজিটালাইজেশনের আওতায় এনে অনলাইনে প্রকাশ করা হবে। এর ফলে জনগণ দ্রুত বিবাহ ও তালাকের তথ্য যাচাই এবং ডিজিটাল সনদ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের বিচার শাখা-৭-এর একটি সূত্র ভিউজ বাংলাদেশকে জানায়, সমগ্র বাংলাদেশের নিকাহ (বিবাহ) ও তালাক রেজিস্ট্রার-সংক্রান্ত সব নথি ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারদের ফি ও কমিশন নির্ধারণ-সংক্রান্ত কার্যাবলি এবং উদ্ভূত বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ও এ ব্যবস্থার আওতায় আসছে। পাশাপাশি মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রি-সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালাও অনলাইনে প্রকাশের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
পাইলট প্রকল্পের আওতায় থাকা উপজেলাগুলো হলো—গাজীপুরের কালীগঞ্জ, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, শেরপুরের ঝিনাইগাতী, কুড়িগ্রাম সদর, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, নড়াইল সদর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, সিলেট সদর, কক্সবাজারের চকরিয়া এবং কিশোরগঞ্জ সদর। এসব এলাকার অভিজ্ঞতা ও কারিগরি সক্ষমতা মূল্যায়নের পর পর্যায়ক্রমে সব জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের আওতায় ‘সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিক্স: বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের মাধ্যমে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে।
এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, বিবাহের জাল সনদসহ বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেই লক্ষ্যে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনে ডিজিটাল পদ্ধতি করতে যাচ্ছে সরকার। যার প্রথম পর্যায়ের বাস্তবায়ন হবে আগামী অক্টোবরেই।’
বিগত সরকারগুলোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘দেশে নাকি সব ক্ষেত্রে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু হয়েছে। তাহলে বিবাহ ও তালাকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কেন এখনো উপেক্ষিত। এটা কারও চোখে পড়েনি এতদিন?’
তিনি বলেন, ‘আমরা এগিয়ে যেতে চাই। আমাদের সামনে যদি কোনো ইনোভেটিভ আইডিয়া আসে, সেটাকে আমরা গ্রহণ করে জনকল্যাণের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। এটাই আমাদের লক্ষ্য।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘দেশের তৃণমূল পর্যায়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও নারীর অধিকার নিয়ে সরকার কাজ শুরু করেছে। এর আওতায় জাতীয় পরিচয়পত্র এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ডাটাবেজের সঙ্গে আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে বয়স ও পরিচয় যাচাই করা হবে। ফলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পাশাপাশি গোপন বিবাহ, বহুবিবাহ ও জালিয়াতি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সহজ হবে। বিবাহ ও তালাকের তথ্য রিয়েল-টাইমে সংরক্ষণ এবং দ্রুত ডিজিটাল সনদ দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে।’
আইন মন্ত্রণালয়ের বিচার শাখা-৭-এর একজন যুগ্ম সচিব ভিউজ বাংলাদেশকে জানান, অনলাইন বিবাহ নিবন্ধন সফটওয়্যারের উন্নয়ন কাজ প্রায় ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার থেকে ক্লাউড সার্ভার বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ও এনআইডি ডাটাবেজের সঙ্গে এপিআই (API) সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের পেমেন্ট গেটওয়ে ও বায়োমেট্রিক ডিভাইসও পরীক্ষামূলকভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে।
তিনি জানান, ১০ উপজেলায় পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। আর সারা দেশে এযাবৎকালের প্রাপ্ত বিবাহ ও তালাকের ডেটাবেজ তৈরি এবং পূর্বের ও ভবিষ্যতের এ-সংক্রান্ত সব তথ্য ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
ডিজিটাল ব্যবস্থার ফলে শুধু সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়াই সহজ হবে না, একই সঙ্গে একজন ব্যক্তির বৈবাহিক অবস্থার তথ্য যাচাইয়ের সুযোগও বাড়বে। এতে গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার কিংবা তালাকের তথ্য গোপন করে নতুন করে বিয়ের মতো জটিলতা শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। বিশেষ করে নারীর অধিকার ও আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কাগজের রেজিস্টারের ধুলোমাখা পাতা থেকে ক্লাউড সার্ভারের ডিজিটাল পর্দায়—বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের এই পরিবর্তন তাই নিছক প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের পারিবারিক নিরাপত্তা, নারীর অধিকার, শিশুর সুরক্ষা এবং আইনের শাসনের প্রশ্ন। এখন দেখার বিষয়, পরিকল্পনার পাতায় আঁকা এই ডিজিটাল স্বপ্ন বাস্তবে কতটা স্বচ্ছ, দ্রুত ও নির্ভুল হয়ে ওঠে।
মতামত দিন