বগুড়ায় নিয়ন্ত্রণহীন এলপিজির বাজার, বাড়ছে জনদুর্ভোগ
ছোট্ট একটি চায়ের দোকান চালান খোকন। সেই দোকানের আয়ে কোনো মতে সংসার চলে তার। অর্থনৈতিক টানাপোড়নই যেন তার নিত্যসঙ্গী।
বগুড়ার জাহাঙ্গীরাবাদ ফুলতলা এলাকার বাসিন্দা খোকন হাসান বুধবার (১ এপ্রিল) রাতে একটি এলপি গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে পড়েন চরম বিপাকে। কয়েকটি দোকান ঘুরেও তিনি সিলিন্ডার কিনতে পারেননি। ১২ কেজি এলপি গ্যাসের একটি সিলিন্ডারের দাম চাওয়া হয় ১ হাজার ৯০০ টাকা। এত বেশি দাম শুনে হতবাক হয়ে খালি হাতেই ফিরে আসেন খোকন।
খোকন ভিউজ বাংলাদেশকে জানান, এত দামে গ্যাস সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য তার নেই। মাটির চুলাতেই রান্না করতে হবে। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
এর পরদিন বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) আসে এলপিজির দাম বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। এতে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে নিম্নআয় ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষদের মধ্যে। একদিকে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি তাদের জীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। সেইসাথে জ্বালানি তেলের সংকট তো রয়েছেই।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ২ এপ্রিল এলপি গ্যাসের নতুন দাম ঘোষণা করে। ১২ কেজির একটি এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা থেকে বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৭২৮ টাকা।
তবে অভিযোগ উঠেছে, ঘোষণার আগেই বাজারে বাড়তি দামে গ্যাস বিক্রি শুরু হয়। এমনকি ঘোষণার পরেও নির্ধারিত মূল্যের চাইতে বেশি দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করা হচ্ছে।
সরেজমিনেও এমন অভিযোগের বাস্তব চিত্র উঠে আসে।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বিকেলে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের খোঁজ করছিলেন বগুড়া শহরের বাসিন্দা শাহজামাল হোসেন।
তিনি জানান, বাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার শেষের দিকে। তাই কেনার জন্য বের হয়েছিলেন। তিনটি দোকান ঘুরে একটাতে পান। তবে দাম চাওয়া হয় ১৯০০ টাকা। একারণে আর নেওয়া হয়নি তার। তিনি আশায় আছেন, দাম কমলে গ্যাস সিলিন্ডার কিনবেন।
ভোক্তারা বলছেন, গত তিন মাস ধরেই নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। সরকার দাম নির্ধারণ করলেও মাঠ পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন হয় না।
বগুড়ার শহরের গ্যাস সিলিন্ডারের অন্তত ১০ জন খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা নিজেরাই পাইকারি পর্যায়ে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
জরিমানার আশঙ্কা ও জটিলতা এড়াতে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, ১ এপ্রিল বসুন্ধরা ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার কিনেছেন ১ হাজার ৮২০ টাকায়, যমুনা ১ হাজার ৮৫০ টাকায় এবং ওমেরা ১ হাজার ৮৯০ টাকায়।
খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, এসব সিলিন্ডার কেনার সময় কোনো রশিদ দেওয়া হয় না। রশিদ চাইলে কোম্পানি ও ডিলারের পক্ষ থেকে বলা হয় রশিদ ছাড়াই কিনলে কেনেন, নইলে ফিরে যান।
তারা আরও জানান, পাইকারি পর্যায়েই যখন দাম বেশি, তখন সরকার নির্ধারিত দামে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করা অসম্ভব।
খুচড়া ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজার ব্যবস্থাপনায় তদারকির অভাবেই এলপি গ্যাসে এমন অস্থিরতা শুরু হয়েছে। বাড়তি দামে কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন খুচরা বিক্রেতারাও। কারণ তাদেরকেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে জরিমানা দিতে বাধ্য করা হয়। এছাড়াও ভোক্তারাও তাদের ওপর বিরক্ত হন। অন্যদিকে
নির্ধারিত দামে গ্যাস না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন ক্রেতারা।
জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বগুড়ার সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, পাইকারি পর্যায়ে নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি না হওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এ বিষয়সহ গ্যাস সিলিন্ডারের দাম নিয়ন্ত্রণ রাখতে আগামীকাল (শনিবার) আমরা একটি সিদ্ধান্ত নেব। এরপরই বাজারে অভিযান চালানো হবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে