এবার দীর্ঘ হবে গরম, তবে নেই একটানা তাপদাহের শঙ্কা
বাংলাদেশে গ্রীষ্ম মানেই দীর্ঘস্থায়ী গরম আর মাঝেমধ্যে স্বস্তি এনে দেওয়া বজ্রঝড়— এই চক্রের মধ্যেই আবর্তিত হয় আবহাওয়া। ২০২৬ সালেও সেই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তবে এবারের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, গরমের সময়কাল দীর্ঘ হলেও ২০২৪ সালের মতো একটানা তীব্র তাপপ্রবাহের আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস বলছে, মার্চ থেকেই তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে এবং এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত একাধিক দফায় তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। তবে এই তাপপ্রবাহ একটানা দীর্ঘস্থায়ী না হয়ে বিরতি দিয়ে আসবে, যার প্রধান কারণ হলো বজ্রঝড় ও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাস দেশের সবচেয়ে উষ্ণ সময় এবং এ মাসে গড় তাপমাত্রা প্রায় ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকে। তাপপ্রবাহের সময় এই তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যে দেশের পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও কুষ্টিয়ায় তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘২০২৬ সালে তাপমাত্রা স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই থাকার সম্ভাবনা বেশি। তবে তাপপ্রবাহের সময় কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। কিন্তু এটি ২০২৪ সালের মতো দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ বছর বজ্রঝড়ের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে, যা তাপমাত্রা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গরম থাকবে, কিন্তু মাঝেমধ্যে বৃষ্টি এসে স্বস্তি দেবে।’
আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসও একই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সম্প্রতি জানিয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের সময়কাল ধীরে ধীরে দীর্ঘ হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বজ্রঝড়ের ঘটনাও বাড়তে পারে, যা স্থানীয়ভাবে তাপমাত্রা কমাতে সহায়ক হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (নোয়া) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়ায় অস্থিরতা থাকতে পারে। এর ফলে কখনো তীব্র গরম, আবার হঠাৎ বজ্রঝড়— এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রহমান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা ও জলীয় বাষ্পের পরিমাণ এ বছর গরমের চরিত্র নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২৬ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে বাষ্পীভবন বাড়ে, যা মেঘ সৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। বজ্রঝড় হলে তাপমাত্রা হঠাৎ করে ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ভেঙে মানুষের জন্য স্বস্তি তৈরি হয়। এ কারণেই ২০২৬ সালে গরমের দাপট দীর্ঘ হলেও তা বিরামহীন হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাপপ্রবাহের সময়কাল ধীরে ধীরে দীর্ঘ হচ্ছে। আগে যেখানে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তাপপ্রবাহ সীমাবদ্ধ থাকত, এখন তা অনেক সময় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়াচ্ছে।’ এর পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও স্থানীয় পরিবেশগত পরিবর্তনকে দায়ী করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক এবং জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. খোন্দকার আশরাফুল ইসলাম ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘‘দেশে প্রতি বছরই তাপমাত্রার পাশাপাশি বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণও বাড়ছে। ফলে গরমের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠছে, যা ‘হিট ইনডেক্স’ বাড়িয়ে দেয়। তবে ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের কাছাকাছি থাকবে। তাপপ্রবাহের সময়কাল কিছুটা দীর্ঘ হলেও ঘন ঘন বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়ার কারণে তাপমাত্রা মাঝে মাঝে কমে আসবে। অর্থাৎ তীব্র গরম থেকে পুরোপুরি স্বস্তি না মিললেও তা একটানা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে না।’’
তিনি আগাম সতর্কতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘তাপপ্রবাহের সময় পর্যাপ্ত পানি পান, রোদে কম বের হওয়া এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা বজায় রাখা দরকার। এবার ২০২৪ সালের মতো রেকর্ডভাঙা একটানা তাপদাহ না হলেও দীর্ঘ সময় ধরে গরমের প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে।’

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে