বন্যায় যেন থেমে না যায় শিশুর শিক্ষা
বাংলাদেশের মানুষ বন্যার সঙ্গে পরিচিত। বর্ষা এলেই নদী ফুলে ওঠে, চর ডুবে যায়, সড়ক বিচ্ছিন্ন হয়, হাজারো পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেয়। কিন্তু এই পরিচিত দৃশ্যের আড়ালে প্রতিবছর আরেকটি নীরব বিপর্যয় ঘটে, যার দিকে তুলনামূলকভাবে কম নজর দেওয়া হয়। সেটা হলো শিশুদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়া। কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাসের জন্য বিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে ক্ষতি শুধু পাঠ্যসূচির নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি প্রজন্মের শেখার সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশে দুর্যোগ মোকাবিলায় গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কতা, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা- সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আছে। কিন্তু শিক্ষা খাতকে দুর্যোগ-সহনশীল করে তোলার ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। বন্যা শুরু হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়, অনেক স্কুল আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, আর পাঠদান অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত থাকে। দুর্যোগ শেষে স্কুল খুললেও হারিয়ে যাওয়া শিক্ষার ঘাটতি পূরণের কার্যকর ব্যবস্থা খুব কম ক্ষেত্রেই নেওয়া হয়।
এই সংকট আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়, এটা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ শিশুর শিক্ষা কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কোথাও কয়েক দিন, কোথাও কয়েক সপ্তাহ, আবার কোনো কোনো এলাকায় আট সপ্তাহ পর্যন্ত বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক পাঠদান সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ দুর্যোগ এখন শুধু মানুষের ঘরবাড়ি নয়, শিশুদের শ্রেণিকক্ষও কেড়ে নিচ্ছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি শিশু নদীবাহিত বন্যার ঝুঁকিতে বাস করে। প্রতি বর্ষায় লাখ লাখ শিশু এমন এলাকায় বসবাস করে, যেখানে বিদ্যালয়ে পৌঁছানোই অসম্ভব হয়ে পড়ে। শুধু বিদ্যালয় ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াই নয়, বই-খাতা নষ্ট হয়, শিক্ষাসামগ্রী হারিয়ে যায়, অনেক পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়। তখন শিশুদের শিক্ষার চেয়ে খাদ্য, নিরাপত্তা ও জীবিকা টিকিয়ে রাখাই পরিবারের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে। এর ফল হিসেবে বহু শিশুর বিদ্যালয়ে আর ফেরা হয় না।
বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ আছে। দুর্যোগ সেই সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের একটি অংশ শিশুশ্রমে যুক্ত হয়, অনেকে পরিবারকে সহায়তা করতে কাজ শুরু করে, আবার কিশোরীদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অর্থাৎ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ধীরে ধীরে শিক্ষা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার সংকটে রূপ নেয়।
২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় দেশের পূর্বাঞ্চলে ২০ লাখেরও বেশি শিশু সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সিলেট ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও কয়েক লাখ শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে যেতে পারেনি। অনেক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় পাঠদান বন্ধ রাখতে হয়েছিল। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত হলেও, শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় শিশুরাই সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে এখন একটি বিষয় স্পষ্টভাবে স্বীকৃত- শিক্ষা বিলাসিতা নয়, দুর্যোগকালেও এটা মৌলিক অধিকার হিসেবেই স্বীকৃত। তাই ইউনিসেফ, ইউনেসকো এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো এখন Education in Emergencies ধারণার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থাৎ দুর্যোগের সময়ও এমন ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে শিশুদের শেখা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ না হয়ে যায়। কারণ দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশু পরবর্তী সময়ে আর কখনোই আগের অবস্থানে ফিরে যেতে পারে না।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষা পরিকল্পনায় মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি। এখন আর প্রশ্ন শুধু বন্যার সময় কত দিন বিদ্যালয় বন্ধ থাকবে, তা নয়, বরং প্রশ্ন হলো- বিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও কীভাবে শিশুর শেখা অব্যাহত রাখা যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এটাই হবে শিক্ষা নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি।
কিন্তু বন্যার সবচেয়ে গভীর ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ে না। কতটি বিদ্যালয় প্লাবিত হলো, কত দিন পাঠদান বন্ধ থাকল কিংবা কতজন শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হলো- এসবের পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। কিন্তু শেখার যে অদৃশ্য ক্ষতি তৈরি হয়, তার হিসাব করা অনেক কঠিন। কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুর জীবনে শুধু পাঠ্যসূচির ঘাটতি তৈরি করে না, এটা তার শেখার গতি, আত্মবিশ্বাস, মানসিক বিকাশ এবং ভবিষ্যতের শিক্ষাজীবনকে দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রভাবিত করে।
শিক্ষাবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, শিক্ষার ধারাবাহিকতা একবার ভেঙে গেলে তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সহজ হয় না। বিশ্বব্যাংক, ইউনেসকো ও ইউনিসেফের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্যোগের কারণে দীর্ঘদিন বিদ্যালয় বন্ধ থাকলে শিশুদের ভাষা ও গণিতের দক্ষতা কমে যায়, শেখার আগ্রহ হ্রাস পায় এবং বিদ্যালয়ত্যাগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবার, চরাঞ্চল, হাওর, উপকূল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক পরিবার জীবিকা হারিয়ে ফেললে সন্তানদের আবার বিদ্যালয়ে পাঠানোর পরিবর্তে কাজে যুক্ত করতে বাধ্য হয়। কিশোরীদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। ফলে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ধীরে ধীরে শিক্ষা, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যের সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে।
এই বাস্তবতা থেকেই বিশ্বজুড়ে শিক্ষা পরিকল্পনার ধারণায় বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে দুর্যোগের পর বিদ্যালয় মেরামত ও পুনরায় পাঠদান শুরু করাকেই যথেষ্ট মনে করা হতো। এখন আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা (Climate-resilient Education) গড়ে তোলার ওপর। অর্থাৎ এমন একটি শিক্ষা কাঠামো, যা বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা অন্য যেকোনো দুর্যোগের মধ্যেও যতটা সম্ভব শিশুদের শেখার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে। ইউনেসকোও বাংলাদেশসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে শিক্ষা পরিকল্পনার প্রতিটি স্তরে জলবায়ু ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও ভারতের বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে দুর্যোগের সময় অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র, কমিউনিটিভিত্তিক পাঠদান, জরুরি শিক্ষা উপকরণ এবং দ্রুত শিক্ষা পুনরুদ্ধার কর্মসূচি চালু করা হয়। কোথাও বিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টার, উপাসনালয় কিংবা নিরাপদ ভবনে অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ চালু রাখা হয়। কোথাও আবার আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয় জরুরি শিক্ষা কিট, যাতে বই, খাতা ও প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী থাকে। এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য একটিই- শিশু যেন দীর্ঘ সময় শেখার পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশও এ ক্ষেত্রে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করছে না। বহু বছর ধরে দেশের বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে ভাসমান বিদ্যালয়ের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে। নৌকাকে শ্রেণিকক্ষে রূপান্তর করে শিশুদের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার এই মডেল প্রমাণ করেছে, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও সৃজনশীল উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু এমন উদ্যোগ এখনো সীমিত পরিসরে রয়েছে। জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বন্যাপ্রবণ জেলাগুলোতে এই অভিজ্ঞতাকে আরও বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বিকল্প শিক্ষার ধারণাকেও সময়োপযোগী করতে হবে। শুধু অনলাইন শিক্ষার ওপর নির্ভর করলে চলবে না, কারণ দেশের অনেক দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট দীর্ঘ সময় অচল হয়ে থাকে। তাই অফলাইন ডিজিটাল কনটেন্ট, রেডিও ও টেলিভিশনভিত্তিক পাঠ, মোবাইল লার্নিং সেন্টার, স্থানীয় শিক্ষক ও স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে ক্ষুদ্র শিক্ষাগোষ্ঠী এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ আগেভাগে প্রস্তুত রাখার মতো বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিয়ে ভাবতে হবে। দুর্যোগের সময় শিক্ষা চালিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা দুর্যোগ শুরু হওয়ার পরে নয়, বরং দুর্যোগের আগেই প্রস্তুত করতে হয়।
আরেকটি বিষয়ও বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর বিদ্যালয়ের দরজা খুলে দিলেই শিক্ষা স্বাভাবিক হয়ে যায় না। অনেক শিশু তখন পাঠে পিছিয়ে থাকে, কেউ হারিয়ে ফেলে শেখার আগ্রহ, কেউ আবার ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক আঘাত নিয়ে শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসে। আন্তর্জাতিকভাবে তাই এখন Learning Recovery এবং Psychosocial Support-কে দুর্যোগ-পরবর্তী শিক্ষা পুনরুদ্ধারের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য পুনরুদ্ধারমূলক ক্লাস, নমনীয় মূল্যায়ন ব্যবস্থা, মানসিক সহায়তা এবং শেখার ঘাটতি পূরণের বিশেষ উদ্যোগ ছাড়া শিক্ষার ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই বিষয়গুলো আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নয়, এগুলো এখন সময়ের দাবি। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বন্যা যে আরও ঘন ঘন ও তীব্র হবে, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রায় কোনো দ্বিমত নেই। ফলে শিশুদের শিক্ষা রক্ষার প্রশ্নটি এখন শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব নয়, এটা জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি কেন্দ্রীয় নীতিগত বিষয়।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো, বন্যাকে আর কেবল একটি মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে না দেখে শিক্ষা পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যেমন আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র ও উদ্ধারব্যবস্থা এখন প্রতিষ্ঠিত ধারণা, তেমনি শিক্ষা খাতেও একটি কার্যকর দুর্যোগকালীন শিক্ষা পরিকল্পনা (Education in Emergencies) গড়ে তোলার সময় এসেছে। এমন একটি পরিকল্পনা, যা দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি নেবে, দুর্যোগের সময় শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে এবং দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে দ্রুত শেখার ঘাটতি পূরণে উদ্যোগ নেবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং জেলা-উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া এটি সম্ভব নয়। বন্যাপ্রবণ প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য আলাদা ঝুঁকি মূল্যায়ন, বিকল্প পাঠদান পরিকল্পনা, শিক্ষা উপকরণ সংরক্ষণের ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিদ্যালয় পুনরায় চালুর রূপরেখা আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণের মধ্যেও দুর্যোগকালীন পাঠদান, শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা এবং শেখার ক্ষতি মূল্যায়নের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বিদ্যালয় অবকাঠামো নিয়েও নতুনভাবে ভাবতে হবে। প্রতিবছর প্লাবিত হয়- এমন এলাকায় শুধু ভবন নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বিদ্যালয়গুলোকে ধীরে ধীরে জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোয় রূপান্তর করতে হবে, যাতে সেগুলো নিরাপদ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেও কাজ করতে পারে। কোথাও উঁচু প্লিন্থ, কোথাও বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য ভবন, কোথাও নৌকা-বিদ্যালয় বা ভাসমান শিক্ষাকেন্দ্র,- স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন সমাধান গ্রহণ করতে হবে। একটি দেশের শিক্ষা নীতি তখনই কার্যকর হয়, যখন সেটা দেশের ভৌগোলিক বাস্তবতাকেও স্বীকার করে।
শিশুদের শিক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, পরিবার, স্থানীয় সমাজ, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দুর্যোগের সময় খাদ্য, নিরাপদ পানি ও চিকিৎসার পাশাপাশি শিক্ষা যে সমান গুরুত্বপূর্ণ- এই সচেতনতা সমাজে গড়ে তুলতে হবে। কারণ শিক্ষা বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও কয়েক বছর পর সেই ক্ষতি জাতীয় উন্নয়নেই প্রতিফলিত হয়।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে আজকের শিশুরা। অথচ প্রতিবছর যদি লাখ লাখ শিশুর শিক্ষা বন্যার কারণে বারবার ব্যাহত হয়, তবে মানবসম্পদ উন্নয়নের সেই স্বপ্ন পূরণ কঠিন হয়ে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন বা আশ্রয়কেন্দ্র বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, শিশুদের শেখার অধিকার রক্ষা করাও সেই লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশ অতীতে বহু কঠিন চ্যালেঞ্জকে সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেছে। প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি বৃদ্ধি, মেয়েদের বিদ্যালয়ে আনা, বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কিংবা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা- এসব অর্জন আমাদের আত্মবিশ্বাস জোগায়। এখন প্রয়োজন সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতেও ভেঙে পড়বে না। কারণ একটি বিদ্যালয় কয়েক দিনের জন্য বন্ধ হতে পারে, কিন্তু একজন শিশুর শেখা কখনো থেমে থাকা উচিত নয়।
মনে রাখতে হবে, বন্যার পানি একসময় নেমে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়িও আবার নির্মিত হয়। কিন্তু যে শিশু দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষের বাইরে থেকে শেখার সুযোগ হারায়, তার হারানো সময় আর কখনো পুরোপুরি ফিরে আসে না। তাই বন্যা মোকাবিলার জাতীয় প্রস্তুতির তালিকায় খাদ্য, আশ্রয় ও স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিক্ষার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ আজ একজন শিশুর শিক্ষা রক্ষা করা মানে আগামী দিনের বাংলাদেশকে রক্ষা করা।
মতামত দিন