ক্যামেরার সাক্ষী: রঘু রাই ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ
ইতিহাস লেখা হয় কলমে। কিন্তু কখনো কখনো একটি ছবি সেই কলমকেও নির্বাক করে দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ফ্রেমবন্দী করার দুঃসাধ্য কাজটি করেছিলেন রঘু রাই — এবং সেই ছবিগুলোকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক অসামান্য মহাকাব্যে। তাঁর ক্যামেরা শুধু মুহূর্ত ধারণ করেনি, ধারণ করেছিল একটি জাতির যন্ত্রণা, সংগ্রাম ও বিজয়ের সমগ্র আখ্যান।
একজন প্রকৌশলী, যিনি আলো দিয়ে লিখতেন
রঘুনাথ রায় চৌধুরী, যিনি রঘু রাই নামে পরিচিত, জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর, ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের ঝং গ্রামে। পরিবার চেয়েছিল তিনি প্রকৌশলী হবেন, এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে সরকারি চাকরিও নিয়েছিলেন। কিন্তু ভালো লাগেনি। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার অনুপ্রেরণায় ক্যামেরা হাতে তুলে নেন, এবং সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর আজীবনের পথ। ১৯৬৫ সালে কলকাতার ইংরেজি দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান-এর দিল্লি কার্যালয়ে প্রধান ফটোগ্রাফার হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। এই পদেই কর্মরত থাকাকালে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে ইতিহাসের এক নৃশংস অধ্যায়।
তিনি ভারতের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে ঘুরে ঘুরে উদ্বাস্তু বাংলাদেশিদের অবর্ণনীয় কষ্ট ও দুর্বিষহ জীবনযাত্রা নিজের ক্যামেরায় তুলে ধরেন। পাশাপাশি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি যুদ্ধের দৃশ্য, চূড়ান্ত বিজয়ের পর তাদের বিজয়যাত্রা, দেশে ফেরা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্যও ধারণ করেন।
তার তোলা এসব ছবি একদিকে যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল হয়ে আছে, তেমনি তাকে আলোকচিত্রী হিসেবে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও খ্যাতি।
একাত্তরের মাঠে
১৯৭১ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাস ধরে রঘু রাই ভারত ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চলজুড়ে ছবি তুলে গেছেন। বন্দুকের নলের সামনে নয়, তিনি দাঁড়িয়েছিলেন মানুষের পাশে — ক্যামেরা হাতে।
সেই মানুষগুলোর কথা ভাবলে বুকের ভেতর কোথাও মোচড় দেয়। ছায়াঘেরা গ্রাম থেকে, শহর থেকে, লাখ লাখ মানুষ প্রাণভয়ে ছুটছে সীমান্তের দিকে। আকাশ থেকে বোমা, নিচে জ্বলছে গ্রামের পর গ্রাম — তারপরও মানুষের মিছিল এগিয়ে চলেছে। বৃদ্ধ, শিশু, নারী — সবার মুখে একটিই আকুতি : বেঁচে থাকা। রঘু রাই সেই আকুতিকে তাঁর ক্যামেরায় ধরে রেখেছেন অক্ষয় করে।
তবে শুধু দুর্দশার ছবি নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যয়দীপ্ত মুখও তিনি ক্যামেরাবন্দি করেছেন। এই মুক্তিযোদ্ধারা — যারা সুশিক্ষিত, সুসজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল — তাদের মুখের দৃঢ়তা রঘু রাইয়ের ছবিতে আজও জীবন্ত। এবং তিনি সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিও ক্যামেরায় ধরে রেখেছেন — রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি জেনারেলদের যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের দৃশ্য।
রঘু রাইয়ের ছবিতে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রাম, দেশের জন্য তাদের লড়াই, শরণার্থীদের হৃদয়বিদারক মুহূর্ত, ক্ষুধার্তদের আহার প্রাপ্তির হাহাকার, বিজয়ের আনন্দ — সমস্ত কিছুই ফুটে উঠেছে জীবন্তভাবে। তাঁর একেকটি ছবি একেকটি গল্প — যা ছবিতে আছে, যা নেই, উভয় মিলিয়ে এক অন্তহীন আখ্যান।
সংবাদচিত্র থেকে শিল্পের পথে
রঘু রাইয়ের একাত্তরের ছবির একটি বিশেষ মাত্রা আছে, যা তাঁকে সাধারণ ওয়ার ফটোগ্রাফার থেকে আলাদা করে। ১৯৭১ সালে তিনি যখন স্টেটসম্যান-এ কাজ করছিলেন, তাঁর তোলা ছবি পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়েছিল সংবাদচিত্র হিসেবে। কিন্তু সেসব ছবি সংবাদের সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিল — মেলে ধরেছিল আরো বড় একটি মানবিক মাত্রা। সংবাদচিত্রে বাস্তবতার তথ্যানুগ উপস্থাপনের যে চাহিদা, তা যেন ছাপিয়ে গিয়েছিল সেই ছবিগুলো।
পরবর্তী জীবনে রঘু রাই ক্রমেই তাঁর আলাদা সত্তা নিয়ে আলোকচিত্রজগতে নতুন ধারার প্রতিনিধিত্ব করতে থাকেন — তাঁর হাতে সংবাদচিত্র হয়ে উঠতে থাকে চিত্রভাষ্য, ক্রমে আরো প্রসারিত হয়ে সংবাদচিত্র ও শৈল্পিক চিত্রের মধ্যে ফারাক ধূসর করে দেয়।
হেনরি কার্তিয়ে-ব্রেসঁ ও ম্যাগনামের দরজা
১৯৭১ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত একটি প্রদর্শনীতে রঘু রাইয়ের কাজ দেখে মুগ্ধ হন ফরাসি মানবতাবাদী ফটোগ্রাফার হেনরি কার্তিয়ে-ব্রেসঁ। ফটোগ্রাফির ইতিহাসে এই নামটি এক কিংবদন্তি — 'নির্ণায়ক মুহূর্ত'-এর তাত্ত্বিক ও অনুশীলক। সেই প্রদর্শনীতে মুগ্ধ হয়েই কার্তিয়ে-ব্রেসঁ রঘু রাইকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা ম্যাগনাম ফটোজে মনোনীত করেন। ম্যাগনাম পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফটোজার্নালিজম সংস্থা — সেখানে ঠাঁই পাওয়া মানে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্রীদের কাতারে স্বীকৃতি।
হারানো নেগেটিভ, ফিরে আসা ইতিহাস
একাত্তরের ছবিগুলো নিয়ে একটি বেদনার গল্পও আছে। নিয়ম অনুসারে রঘু রাইয়ের তোলা ছবির নেগেটিভ জমা ছিল স্টেটসম্যান দপ্তরে। কিন্তু পত্রিকার পড়তি দশায় কর্তৃপক্ষ দপ্তরের জমি বিল্ডারদের হাতে তুলে দিলে সেই সময়ের ফটো-আর্কাইভের কোনো হদিস আর পাওয়া যাচ্ছিল না। দিল্লিতে রঘু রাই এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই আক্ষেপ করে এই কথা জানান।
তবে শেষপর্যন্ত সব হারিয়ে যায়নি। বিজয়ের ৪১তম বার্ষিকীতে ঢাকায় বেঙ্গল গ্যালারির উদ্যোগে রঘু রাইয়ের একাত্তরের ছবির বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন হয় — কিছু নেগেটিভ পাওয়া গিয়েছিল। সেই প্রদর্শনী শুধু ছবির প্রদর্শনী ছিল না, ছিল ইতিহাসের পুনর্জন্ম।
স্বীকৃতি ও পুরস্কার
১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর প্রশংসনীয় কাজের জন্য ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে 'বর্ষসেরা ফটোগ্রাফার' পুরস্কার লাভ করেন তিনি। ২০০৯ সালে ফরাসি সরকার তাঁকে অফিসার দেস আর্টস এ দে লেতর উপাধিতে ভূষিত করে। ২০১৯ সালে 'অ্যাকাডেমি দে বোজার'-এর প্রথম ফটোগ্রাফি পুরস্কারের বিজয়ী হন।
প্রয়াণ
২৬ এপ্রিল ২০২৬, দিল্লিতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন রঘু রাই। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত ছিল তাঁর সমৃদ্ধ কর্মজীবন। তাঁর প্রয়াণে কেবল একজন ফটোগ্রাফারকে হারানো নয় — হারিয়ে গেল এক জীবন্ত স্মৃতি। তাঁর সাদা-কালো ছবিগুলো আমাদের কেবল অতীতে ফিরিয়ে নেয় না, মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় অসংখ্য উদ্বাস্তু নারী-পুরুষ-শিশুর সামনে, দেখিয়ে দেয় মানবের অতল বেদনার রূপ। সেই ছবিগুলোয় আছে সাধারণ যোদ্ধার প্রত্যয়, সম্মুখ সমরের ভয়াবহতা, মুক্তি অভিযানে যৌথ বাহিনীর সম্পৃক্ততা এবং বিজয়ী বাংলাদেশের উচ্ছ্বাস — আর ভালোবাসার জনস্রোতে ভেসে বঙ্গবন্ধুর রাজসিক প্রত্যাবর্তন।
রঘু রাইয়ের আলোকচিত্র তাই শুধু সংবাদচিত্র নয়, মুক্তিযুদ্ধের এক বলিষ্ঠ শিল্পকর্ম। সাদা-কালো ফ্রেমে তিনি যা ধারণ করেছেন, তা অক্ষয় — ইতিহাসের প্রস্তরপ্রতিমা। ক্যামেরা এখন নিথর। কিন্তু যা একবার আলোয় ধরা দিয়েছে, তা আর অন্ধকারে ফেরে না।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে