Views Bangladesh Logo

স্প্যানিশ ঝড় সামলাতে পারবে তো পর্তুগীজরা?

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এমন কিছু রাত আসে, যখন একটি ম্যাচ শুধু দুই দলের লড়াই হয়ে থাকে না; হয়ে ওঠে দুই প্রজন্ম, দুই দর্শন এবং দুই সময়ের মুখোমুখি দাঁড়ানোর গল্প। যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে আজ (৬ জুলাই) রাত ১টায় ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর আইবেরিয়ান ডার্বি ঠিক তেমনই এক অধ্যায়ের অপেক্ষায়। একদিকে ইউরোপের সবচেয়ে ধারাবাহিক দল স্পেন, অন্যদিকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নেতৃত্বে লড়াকু পর্তুগাল।

মাত্র এক বছর আগে উয়েফা নেশন্স লিগের ফাইনালে স্পেনকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল পর্তুগাল। সেই স্মৃতি এখনও টাটকা। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চ অন্য গল্প লেখে। এখানে অতীতের গৌরব নয়, বর্তমানের শক্তিই শেষ কথা।

স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের আক্রমণভাগের বহুমাত্রিকতা। ডান প্রান্তে লামিন ইয়ামাল প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ছিন্নভিন্ন করার ক্ষমতা রাখেন। তার গতি, এক-অন-এক ড্রিবলিং এবং ভেতরে ঢুকে সুযোগ তৈরি করার দক্ষতা স্পেনের আক্রমণের প্রধান অস্ত্র। যদিও এবারের বিশ্বকাপে এখনও নিজের সেরা ছন্দে ফিরতে পারেননি, তবু বড় ম্যাচে বিস্ফোরণের জন্য একটি মুহূর্তই যথেষ্ট।

বাম দিক থেকে নিকো উইলিয়ামস গতি ও সরাসরি আক্রমণে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখেন। দুই উইং থেকেই যখন স্পেন আক্রমণ গড়ে তোলে, তখন প্রতিপক্ষের ফুলব্যাকদের জন্য পুরো ম্যাচটাই হয়ে ওঠে দুঃস্বপ্ন। মাঝমাঠে পেদ্রি যেন স্পেনের হৃদস্পন্দন। বলের নিয়ন্ত্রণ, ছোট ছোট পাসে খেলার গতি নির্ধারণ এবং আক্রমণ ও মাঝমাঠের সংযোগ তৈরি করার দায়িত্ব তার কাঁধে। আর সামনে মিকেল ওইয়ারসাবাল শুধু একজন স্ট্রাইকার নন; বক্সের ভেতরে ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়া এবং সুযোগকে গোলে পরিণত করার ক্ষেত্রে তিনি এখন স্পেনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অস্ত্র। রক্ষণে রবিন লে নরমাঁ পুরো ডিফেন্স লাইনের সংগঠক। তার অবস্থানজ্ঞান ও আকাশে আধিপত্য স্পেনকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

অন্যদিকে পর্তুগালের আশা এখনও ঘুরে দাঁড়ায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে। বয়স ৪১ ছুঁলেও বড় ম্যাচে গোলের গন্ধ শোঁকার ক্ষমতা খুব কমেনি। বক্সের ভেতরে তার উপস্থিতি এখনও প্রতিপক্ষের রক্ষণকে অস্বস্তিতে রাখে। তবে রোনালদোকে কার্যকর করতে হলে মাঝমাঠকে আরও প্রাণবন্ত হতে হবে।

সেই দায়িত্ব মূলত ব্রুনো ফার্নান্দেজ ও ভিতিনহার। ব্রুনো আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে শেষ পাস, দূরপাল্লার শট এবং আক্রমণের গতি বাড়ানোর দায়িত্ব পালন করেন। ভিতিনহা গভীর মিডফিল্ড থেকে খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেন। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে এই দুই তারকা এখনও নিজেদের মানের ফুটবল উপহার দিতে পারেননি। ফলে রোনালদোও অনেক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

রক্ষণে রুবেন দিয়াশ পর্তুগালের সবচেয়ে বড় ভরসা। কিন্তু পুরো ডিফেন্স ইউনিটের সমন্বয় প্রত্যাশিত নয়। ফুলব্যাকদের পেছনের ফাঁকা জায়গা এবং দ্রুত ট্রানজিশনে বারবার সমস্যায় পড়েছে দলটি। গোলপোস্টের নিচে দিয়াগো কোস্তা একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে দলকে টিকিয়ে রেখেছেন। বলা যায়, তার পারফরম্যান্স না থাকলে পর্তুগালের বিশ্বকাপ যাত্রা আরও আগেই শেষ হয়ে যেতে পারত।

এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রশ্নও এখানেই। স্পেন যেভাবে দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ গড়ে তোলে, তা পর্তুগালের দুর্বল রক্ষণভাগের জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠতে পারে। ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস যদি উইং থেকে নিয়মিত কাট-ইন করতে পারেন, আর রদ্রি এবং পেদ্রি যদি মাঝমাঠ থেকে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণে রাখেন, তাহলে রুবেন দিয়াশদের ওপর প্রবল চাপ তৈরি হবে। বিশেষ করে পর্তুগালের ডিফেন্সিভ ট্রানজিশনের ধীরগতি স্পেনের দ্রুত পাসিং ফুটবলের বিপক্ষে ভয়াবহ দুর্বলতা হয়ে দেখা দিতে পারে। সেই সুযোগে ওইয়ারসাবালের মতো বক্স শিকারি একাধিক সুযোগ পেয়ে যেতে পারেন।

পর্তুগালের সামনে অবশ্য পাল্টা অস্ত্রও আছে। ব্রুনো ফার্নান্দেজের নিখুঁত থ্রু বল কিংবা ভিতিনহার দূরদর্শী পাস যদি রোনালদোকে বক্সের ভেতরে খুঁজে পায়, তাহলে এক মুহূর্তেই ম্যাচের চিত্র বদলে যেতে পারে। নকআউটের চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতায় এখনও রোনালদোর সঙ্গে তুলনা চলে খুব কম ফুটবলারের।

ইতিহাস অবশ্য স্পেনের পক্ষেই কথা বলে। ১৯২১ সাল থেকে ৪১ ম্যাচের মুখোমুখিতে স্পেন জিতেছে ১৮টি, পর্তুগাল মাত্র ৭টি। বিশ্বকাপেও পর্তুগাল কখনো স্পেনকে হারাতে পারেনি। তবে নকআউট ফুটবলে পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি মূল্য পায় মুহূর্তের সাহস, কৌশল আর মানসিক দৃঢ়তা।

ডালাসের সবুজ ঘাসে তাই আজ শুধু একটি টিকিটের লড়াই নয়; এটি হয়তো এক যুগের বিদায় আর আরেক যুগের আগমনের প্রতীক। এক পাশে কিংবদন্তি রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ স্বপ্ন, অন্য পাশে ইয়ামালের হাত ধরে স্পেনের নতুন সোনালি অধ্যায়ের আহ্বান। প্রশ্ন একটাই—অভিজ্ঞতার শেষ আলো জ্বলবে, নাকি তারুণ্যের সূর্য আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে?

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ