বগুড়ায় টিএমএসএসের 'দখল-দূষণে' হুমকিতে করতোয়ার অস্তিত্ব
একসময় উত্তরাঞ্চলের প্রাণ ছিল করতোয়া নদী। এই নদীর বুক চিরে চলত নৌকা, জেলেদের জালে উঠত নানা প্রজাতির মাছ। দুই তীরের মানুষ বেঁচে থাকত নদীকেন্দ্রিক জীবন ও জীবিকায়। সেই করতোয়া আজ মৃতপ্রায় এক নদী। কোথাও নদী ভরাট, কোথাও পানির রঙ কালচে, কোথাও দুর্গন্ধে দাঁড়ানো দায়। দখল, দূষণ আর শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে ধীরে ধীরে মৃত্যু হচ্ছে নদীটির।
স্থানীয়দের অভিযোগ, করতোয়ার নাব্যতা হারানোর পেছনে অন্যতম বড় ভূমিকা রয়েছে ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘের (টিএমএসএস) বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের।
সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় বগুড়া শহরের বনানী এলাকায় একটি চায়ের দোকানে আড্ডা চলছিল। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করতোয়া নদী।
সেখানে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলছিলেন, করতোয়ার পানি এখন বিষাক্ত। নদীতে আর আগের মতো মাছ নেই। টিএমএসএসের কারখানাগুলো করতোয়াকে মেরে ফেলেছে। শুধু করতোয়াই না, ভদ্রাবতীকেও শেষ করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, করতোয়া নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা টিএমএসএসের শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার সুজাবাদ এলাকায় অবস্থিত বিসিএল সিরামিকস বা বিসিএল টাইলস কারখানার পাশ দিয়ে নদীতে নামানো হয় বর্জ্য। কারখানাটির কেমিক্যালযুক্ত তরল পদার্থ সরাসরি নদীর পানিতে মিশছে। বর্জ্যের কারণে নদীর পানির রঙ পরিবর্তিত হয়ে কালচে হয়ে গেছে।
করতোয়া নদীতে মাছ শিকার করেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়।
তারা জানান, করতোয়া নদীর সুজাবাদ অংশে একসময় প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন সেখানে মাছ নেই বললেই চলে। বিষাক্ত পানিতে মাছ থাকতে পারে না।
বগুড়া শহরের বাসিন্দা নাসির প্রমাণিক নামে একজন সৌখিন মৎস্য শিকারি জানান, প্রায় এক যুগ আগে করতোয়া নদীর সুজাবাদ অংশে অনেক বড় বড় রুই, কাতল মাছ পাওয়া যেত। এখন সারাদিন বরশি ফেলে বসে থাকলেও মাছ টোপ খায় না। পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। নদীর এই মৃত্যুর পেছনে দায়ী টিএমএসএস।
মৎস্য শিকারিরা জানান, টিএমএসএস প্রতিষ্ঠানটির নদী দখল-দূষণের কারণে করতোয়া নদী আজ শুধু নামেই রয়েছে। সুজাবাদ এলাকার টাইলস কারখানা কারণে এ অংশে নদীকে মৃত বলা চলে। অবশ্য এর আগে থেকেও বগুড়া সদরের ঠেঙ্গামারা এলাকায় টিএমএসএস এর পেপার মিলের বিষাক্ত বর্জ্য নদী ফেলা হয়। তখন থেকেই বগুড়ার অংশের করতোয়া নদী মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
কানাডায় পানিসম্পদ প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন সাবরিনা রশিদ সেঁওতি।
করতোয়া নদীর ব্যাপারে তিনি ভিউজ বাংলাদেশকে জানান, নদীতে শিল্পবর্জ্য ফেলা, গৃহস্থালির বর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে নদীতে নিক্ষেপ পানি দূষণের প্রধান কারণ।
তিনি আরও জানান, এ সমস্যা সমাধানে কঠোর আইন প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। কোনো শিল্পবর্জ্য বা দূষিত পদার্থ নদীতে মিশতে না পারে সেদিকে নজর রাখতে হবে। পাশাপাশি মানুষকে পানি ও স্যানিটেশন বিষয়ে সচেতন ও প্রশিক্ষিত করতে হবে। সেইসাথে গৃহস্থালির বর্জ্য নদীতে না ফেলার জন্য উৎসাহিত করতে হবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বগুড়া সদরের ঠেঙ্গামারা এলাকায় টিএমএসএস এর প্রতিষ্ঠান বিসিএল পেপার মিলের সমস্ত বর্জ্য করতোয়া নদীতে ফেলা হয়। এছাড়াও বগুড়ার বাঘোপাড়া এলাকায় আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলে নদীর কিছু অংশ ভরাট করেছে টিএমএসএস। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির প্রাইভেট পুন্ড্র ইকোনমি জোন(প্রস্তাবিত) রয়েছে। ওই এলাকায় রয়েছে টিএমএসএস এর বিসিএল গ্লাস ফ্যাক্টরি। এই কারখানারও সকল বর্জ্য করতোয়া নদীতেই ফেলা হয়।
বাঘোপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, করতোয়া নদীর সঙ্গে সংযুক্ত একটি খালের কিছু অংশে মাটি ফেলে ভরাট করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তার ওপর দিয়ে শ্রমিকরা যাতায়াত করছেন। এর কিছুটা সামনেও একই চিত্র দেখা যায়। তবে করতোয়া নদী থেকে বেরিয়ে যাওয়া ওই খালের ওপর দিয়ে সেতু নির্মাণ করছে টিএমএসএস। এর আগে খালটি ভরাট করে দখলের চেষ্টা করে প্রতিষ্ঠানটি। সেই চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে।
বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার সাজাপুর এলাকায় রয়েছে টিএমএসএস এর বিসিএল বোর্ড মিল।
সাজাপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেই কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য পাশের ভদ্রাবতী নদীতে ফেলা হয়। এই নদীও দখল ও দূষণের কারণে অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। টিএমএসএসের এই বোর্ড কারখানার বর্জ্য ভদ্রাবতী হয়ে করতোয়া নদীর পানিতে মিশে যাচ্ছে।
টিএমএসএস প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শ্রমিক জানান, টিএমএসএসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বর্জ্য ফেলার নির্ধারিত স্থানও রয়েছে। নদীতে ফেলার পাশাপাশি তরল বর্জ্য ও আবর্জনা সেখানেও ফেলা হয়। পরবর্তীতে অবশ্য সেই নির্ধারিত জায়গা থেকে বর্জ্য তুলে করতোয়া নদীতেই ফেলা হয়।
টিএমএসএসের করতোয়া নদী দখল ও দূষণের বিষয়টি এর আগেও উঠে আসে সরকারি তদন্তে।
২০১৮ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বগুড়ায় করতোয়া নদীর দখল-দূষণের চিত্র পরিদর্শন করেন। সে সময় তিনি জেলা প্রশাসনকে নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তদন্তে টিএমএসএসের বিরুদ্ধে করতোয়া নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং বর্জ্য ফেলার অভিযোগ উঠে আসে। ওই সময় তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব কর্মকাণ্ড নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করছে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করছে।
এছাড়া ২০১৯ সালে বগুড়া জেলা প্রশাসনের করা একটি তালিকায় উল্লেখ করা হয়, সদর উপজেলার ঠেঙ্গামারা এলাকায় প্রায় ৪ দশমিক ৯০ একর করতোয়া নদীর জমি টিএমএসএস দখলে রেখেছে।
তবে অভিযোগ ও সরকারি তালিকায় দখলদার হিসেবে নাম ওঠার পরও টিএমএসএস প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ বিষয়ে টিএমএসএস প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র সহকারি পরিচালক নজিবুর রহমান ভিউজ বাংলাদেশকে জানান, এসব ব্যাপারে আমি কথা বললে হবে না। নদী দখল-দূষণের যে অভিযোগই থাকুক, এসব ব্যাপারে ম্যাডামের (টিএমএসএস প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা বেগম) সঙ্গে কথা বলতে হবে। ম্যাডামই বক্তব্য দেবেন।
জানতে চাইলে টিএমএসএস প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা বেগম ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, আমরা নদী দখলে রেখেছি এটা জেলা প্রশাসনের ভুল তথ্য। তবে কিছু জমি আমাদের মধ্যে ছিল, তা নদী খননের সময় বের করে দেওয়া হয়েছে। আর আমাদের বিসিএল প্রতিষ্ঠানের কোনো বর্জ্য নদীতে ফেলা হয় না। আমাদের ইটিপি (ইফিসিয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) আছে, তা দিয়ে বর্জ্য পরিশোধিত করে আমরা আবার তা ব্যবহার করছি।
জানতে চাইলে বগুড়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. তৌফিকুর রহমান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, করতোয়া নদী দূষণের বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তর রয়েছে, তারা দেখবে। তারা যদি আমাদের সহযোগিতা চায় সেক্ষেত্রে আমরা সহায়তা করব। আর নদী দখলের যে বিষয় রয়েছে, আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি৷ অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযান এটা আমাদের নিয়মিত অভিযানের অংশ।
তবে, জেলা প্রশাসনের তালিকায় টিএমএসএস নদী দখলদারের তালিকায় ২০১৯ সাল থেকে থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা প্রশাসন টিএমএসএস প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাই নিতে চায় না। তাদের চোখের সামনে করতোয়া নদী মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে। এই নদীতে শুধু বর্ষাকালেই পানির রঙ কিছুটা ভালো দেখা যায়। বর্ষা শেষে নদী থেকে দুর্গন্ধে আসে, পানির রং হয়ে যায় কালচে। দখল-দূষণে ধুঁকছে করতোয়া।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে