Views Bangladesh Logo

সাংবাদিকতাঃ সৃজনশীল না অভিশপ্ত পেশা?

Rased Mehedi

রাশেদ মেহেদী

সাংবাদিকতা সৃনজনশীল পেশা কিনা তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। একটি হচ্ছে, পেশাজীবী সাংবাদিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মাপকাঠি কি হবে? আরেকটি হচ্ছে, সাংবাদিকরা কি আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলীদের মতোই পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃত হবেন, নাকি তারা লেখক, কবি, শিল্পীদের মত বিশেষায়িত ‘সৃজনশীল ব্যক্তি’ হিসেবে বিবেচিত হবেন? এ দুটি প্রশ্নের বাইরেরও আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আমার মনে বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে। সেটি হচ্ছে, সাংবাদিকতা কি অভিশপ্ত পেশা?’ কারণ সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা যেখানে পেশাদারিত্ব আর বস্তুনিষ্ঠতায় একনিষ্ঠ হতে গেলে সাংবাদিককে একা, নিঃসঙ্গ হয়ে যেতে হয়, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন যে পেশার নিত্যসঙ্গী। একজন সত্যিকারের পেশাদার সাংবাদিক প্রশংসিত হন কম, সমালোচিত হন বেশী। প্রায় ৩০ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় বেশ কিছু অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করতে বাধ্য হচ্ছি। কেউ আহত হলে প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

অতি সম্প্রতি তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জাতীয় সংসেদে জানিয়েছেন, চিকিৎসক, আইনজীবীদের মতো সাংবাদিকদেরও নিবন্ধন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এ নিয়ে এখন বেশ বিতর্ক চলছে। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠেছে, ‘সাংবাদিকতা কি সৃজনশীল পেশা? যদি সৃজনশীল পেশা হয় তাহলে সৃজনশীলতাকে কোন মানদণ্ডে বিচার করে নিবন্ধন দেওয়া হবে? মানদণ্ড বিচার করবে কে?
বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য বড় অভিশাপ হচ্ছে, সাংবাদিক নামধারীদের কাছে পেশাদার সাংবাদিকতা জিম্মি হয়ে পড়া। মানসম্পন্ন জাতীয় দৈনিক এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালের চেয়ে অপসাংবাদিকতায় ভরপুর আন্ডারগ্রাউন্ড সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা অনেক বেশী। পেশাদার টেলিভিশন সাংবাদিকতার চেয়ে অপেশাদার কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সংখ্যাও হু হু করে বাড়ছে। এ কারণে পেশাদার সাংবাদিকের চেয়ে সাংবাদিক নামধারীর সংখ্যা এখন কয়েকগুন বেশী। ফলে জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের মতো সংগঠনে এদের আধিপত্যও বেশী। সাংবাদিক নেতৃত্বের একটা অংশ পেশাদার সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ নন, বরং আন্ডারগ্রাউন্ড ডিক্লারেশন বাণিজ্যে তাদের পেশাদারিত্ব অসাধারণ! এই বাণিজ্যের অংশ হিসেবে এক ফকিরারপুল থেকেই এখনও শ খানেকের বেশী নামসর্বস্ব সংবাদপত্র একই ধরনের কনটেন্টে একটা-দুইটা প্রেস থেকেই ছাপা হয়। আর পেশাদারিত্ব না থাকার কারণে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন অনিবার্যভাবেই আছে। ফলে সাংবাদিক নেতৃত্বের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের আনুগত্য, পেশাদারিত্ব নয়।

আবার প্রথম শ্রেণির মানসম্পন্ন গণমাধ্যম হিসেবে যেগুলো পরিচিত সেগুলোর প্রায় সবগুলোই বড় কর্পোরেট পুঁজির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচালিত। ফলে সেগুলোতেও সাংবাদিকদের সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্বের পাশাপাশি মালিক পক্ষের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার দিকে বিশেষ নজর দিতে হয়। ফলে এখানেও প্রতিনিয়ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে আনুগত্যের বড় দ্বন্দের মধ্যে থাকতে হয় এসব সংবাদ মাধ্যমের নেতৃত্বে থাকা সাংবাদিকদের।

সাংবাদিক নামধারী এবং পেশাদার সাংবাদিকতার উদাহারণ হিসেবে গত ৮ জুলাই রাতে সাভারে ঘটে যাওয়া ঘটনা বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। ওই দিন রাতে ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচ ছিল। সেই ম্যাচ চলাকালীন সময়ে উপজেলা কমপ্লেক্সের ভেতরে সরকারি কর্মকর্তা কিংবা তাদের সহযোগীদের হাতে মারধরের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন একজন সাংবাদিক। দিদারুল ইসলাম নামে ওই সাংবাদিকের অভিযোগ হচ্ছে, বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার সরকারি নীতি লঙ্ঘন করে উপজেলা কমপ্লেক্সের কনফারেন্স রুমে এসি চালিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখছিলেন। সাংবাদিক দিাদরুল ইসলাম সেখানে গিয়ে ‘বিদ্যুৎ অপচয়’ সম্পর্কে সরকারি নীতির ব্যত্যয় ঘটানো নিয়ে প্রশ্ন করলে তার ওপর হামলা করেন সরকারি কর্মকর্তা ও তাদের স্বজন কিংবা সহযোগীরা। অন্যদিকে ঘটনা সম্পর্কে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সহকারি কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল আমিন জানান, বিকেলে একটি কারখানায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালিয়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং জরিমানা করা হয়। এটা নিয়ে সাংবাদিক দিদারুল ইসলাম রাত পৌনে ১১টার দিকে তাকে ফোন দেন। পরে তিনি ওই কারখানার লোকজন নিয়ে তার কাছে যান এবং ওই কারখানার পক্ষে তদবির করে জরিমানা কমানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি কারখানার পক্ষে কিছু করার ব্যাপারে অপরাগতা প্রকাশ করলে সাংবাদিক দিদারুল ইসলাম কনফারেন্স রুমের ভিডিও ধারণ করে সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে খেলা দেখার বিষয়ে প্রশ্ন করেন।”

আমরা এ পর্যন্ত ঘটনার প্রবাহ যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে প্রথমেই প্রশ্ন ওঠা উচিত, দিদারুল আলম কি সত্যিই সেখানে পেশাদার সাংবাদিকতা করতে গিয়েছিলেন? বিশ্বকাপ খেলা দেখা নিয়ে রাজধানীতেও তো অনেক বিশেষ আয়োজন আছে। বড় স্ক্রিনে মাঠের মধ্যে খেলা দেখা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্লাব, হোটেলের লাউঞ্জে বিশেষ আয়োজন করা হচ্ছে। অতএব উপজেলা কমেপ্লেক্সের কনফারেন্স রুমে পরিবার-পরিজন নিয়ে বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ দেখাকে কি সংবাদের বিষয় হিসেবে গণ্য করা যায়? কমনসেন্স কি বলে? সেখানে যদি দশটা পরিবারের বিশ জন সদস্য একসঙ্গে খেলা দেখেন তাহলে ওই দশটা বাড়িতে টিভি বন্ধ আছে। বাড়ির সদস্য সংখ্যা দুইজন হলে অনিবার্যভাবে একটি লাইট ছাড়া বাকীগুলো বন্ধ আছে। অতএব সেখানে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে। অতএব এই একটা ম্যাচ দেখার ৯০ মিনিটের আয়োজন নিয়ে ওই সাংবাদিক সাহেবের এতবড় পেশাদারিত্ব (!) দেখানোর ক্ষেত্রে তার ‘কমনসেন্স’ নিয়েই প্রথম প্রশ্ন ওঠে।

আমি ঘটনা নিয়ে কয়েকটি রিপোর্ট পড়েছি। সবচেয়ে পেশাদার রিপোর্ট করেছে ডেইলি স্টার। অনলাইনে বাংলা ভার্সনের রিপোর্টটি থেকেই মূলত পুরো ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়েছে। ডেইলি স্টারের রিপোর্টে ভুক্তভোগী সাংবাদিক, সহকারি কমিশনার(ভূমি) এবং স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। এই রিপোর্ট থেকে ঘটনা সম্পর্কে যে কেউ স্পষ্ট চিত্র পাবেন। রিপোর্টের শেষে সাভারের স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে পাওয়া ঘটনার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজেরর বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এমনকি ফুটেজে ১২ থেকে ১২টা ৩৮ মিনিট পর্যন্ত অংশ নেই সেটা উল্লেখ করা হয়েছে এবং সে বিষয়েও ইউএনও’র বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। অতএব এই রিপোর্ট একেবারেই পেশাদার রিপোর্ট।

এবার ওই সাংবাদিক যে পোর্টালে কাজ করেন সেই ডোমেইনে ঢুকলাম। দিদারুল আলমের রিপোর্টটি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্ত সাইটটি কারিগরীভাবে এতটাই দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ যে সেখান থেকে কোনভাবেই রিপোর্টটি খুঁজে পাওয়া সম্ভব হলো না। গুগলে সার্চ দিলে অন্য অনেক পোর্টালে প্রকাশিত রিপোর্টে আসে, ঢাকা টুডে খুঁজে পাওয়া যায় না। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে সাইটের নীচে সম্পাদকের নাম নেই। কোন অফিস অ্যাড্রেস নেই। একটা মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল অ্যাড্রেস দেওয়া আছে। এছাড়া কিছু নেই। পোর্টালটির তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন পাওয়ার নম্বর অবশ্য নীচে উল্লেখ করা আছে। তবে ফেসবুকে গুলশান এলাকার একটি বাড়ির ঠিকানা আছে। যেকোনো সচেতন মানুষ পোর্টালটি একবার ঘুরে দেখলেই বুঝবেন, পেশাদার সাংবাদিকতার বিচারে পোর্টালটির অবস্থান কি? এখন এই সাংবাদিকের সঙ্গে ডেইলি স্টারের সাংবাদিকের পেশাদারিত্বের মানদণ্ড কি একইভাবে মূল্যায়ন করা হবে? করা হলে সেটি কি যৌক্তিক হবে?

পুরো ঘটনায় আরও একটি বিষয় গুরুত্ব দেওয়ার বিষয় আছে। দিদারুল ইসলাম সেদিনের ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। অতএব দিদারুল ইসলামের ওপর হামলার ঘটনা প্রমাণিত হয়। এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসন ৩৮ মিনিটের ফুটেজ দেখাতে পারেনি। ওই ৩৮ মিনিট কি ঘটেছিল, তার সদুত্তর প্রশাসনের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। ওই ঘটনায় আরও একটা বিষয় খুই গুরুত্বপূর্ণ। সহকারি কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিন ডেইলি স্টারকে বলেছেন, “'তখন তাকে বলি, আপনি অবৈধ কারখানার পক্ষে তদবির করতে এসেছেন, আপনাকে আটক করা হলো। পরে সাংবাদিকদের অনুরোধে তার কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাকে মারধর করা হয়নি।” অর্থাৎ আর্জেন্টিনার জার্সি পড়ে ম্যাচ দেখতে দেখতেই তিনি মোবাইল কোর্টের বিচারকে পরিণত হয়েছিলেন! কোনো প্রশ্ন পছন্দ না হলেই একজন সরকারি কর্মকর্তা মুহুর্তেই আদালতের বিচারক হয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য কি ভয়ংকর উদ্বেগের, বুঝতে পারছেন?

আর আমাদের দেশে সরকারি কর্মকর্তারা মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে অরাজকতার কোন পর্যায়ে যেতে পারেন, তার প্রমাণ তো চোখের সামনেই আছে। আমরা ভুলে যাইনি ২০২০ সালের ১৩ মার্চ গভীর রাতে কুড়িগ্রামে স্থানীয় সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগ্যানের বাড়িতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নাম দিয়ে সন্ত্রাসী হামলা চালায় স্থানীয় কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা তৎকালীন আরডিসি নাজিম উদ্দিন, রাহাতুল ইসলাম এবং রিন্টু বিকাশ চাকমা। তারা সাংবাদিক রিগ্যানকে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে তুলে নিয়ে এসে নির্মম শারীরিক নির্যাতন করেন। এরপর তথাকথিত মোবাইল কোর্ট বসিয়ে দণ্ড দিয়ে জেলে পাঠান। আমলাতন্ত্রের ইতিহাসে সরকারি কর্মকর্তাদের এ ধরনের জঘন্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের উদাহরণ আর নেই। কুড়িগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক পারভিন সুলতানার বিরুদ্ধে একটি প্রমাণিত দূর্নীতির রিপোর্ট করার কারণেই দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এই অভিযান পরিচালিত হয়। সরকারি তদন্ত কমিটিতেই এই কর্মকর্তাদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে এই কর্মকর্তাদের অপরাধ ক্ষমা করার বিশেষ ব্যবস্থা নেন! ক্ষমা পেয়ে এক কর্মকর্তাদের একজন নাজিম উদ্দিন সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পান। ওই দায়িত্ব পালনের সময়ও তার বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণ ও সাংবাদিক নির্যাতন এবং প্রকাশ্যে ঘুষ চাওয়ার মতো একাধিক অভিযোগ প্রমাণসহ উঠে আসে। সবচেয়ে আশ্চর্য হচ্ছে, ড.মুহম্মদ ইউনূসের অন্তবর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই নাজিম উদ্দিনকে আওয়ামী লীগ আমলে বঞ্চিত দেখিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদে পদায়নের ব্যবস্থা নেওয়া হয়! পরে সংবাদ মাধ্যমে রিপোর্ট হলে সেই পদায়ন স্থগিত হয়।

আওয়ামী লীগ আমলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আমলাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার, পেশীশক্তির ব্যবহারের বেশ কয়েকটি উদাহরণ আছে। ঢাকায় সচিবালয়ে প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের ওপর হামলার ঘটনা আমরা সবাই জানি। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেনও রোজিনা ইসলামের ওপর হামলার নিন্দা জানান। কিন্তু পুলিশের তদন্তে রোজিনা ইসলাম নিরাপরাধ প্রমাণিত হলেও আমলাতন্ত্র তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সাজানো মামলা প্রত্যাহারে প্রবলভাবে বাধা দেয়। আমলাদের মধ্যে আমার অনেক কাছের মানুষ আছেন, বন্ধু আছেন। অনেক কর্মকর্তাকে আমি চিনি যারা অত্যন্ত প্রাজ্ঞ এবং মানবিক। কিন্তু তারাও এই অপরাধপ্রবণ আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাছে অসহায়।

এখানেই আমাদের প্রশ্ন। সাংবাদিকদের যেভাবেই নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা হোক, সেটা এই আমলতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই হবে। তাহলে আমরা কিভাবে নিশ্চিত হবো যে, এই ব্যবস্থার মধ্যে সত্যিকারের সাংবাদিকরা নিবন্ধন পাবেন, প্রক্রিয়াটি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে না? আবার নিবন্ধন দেওয়ার পর এই ‘নিবন্ধন বাতিল’ পেশাদার সাংবাদিকতা নিয়ন্ত্রণের বড় অস্ত্রে পরিণত হবে না, তার নিশ্চয়তা কি? প্রশ্ন আরও আছে। ১৯৯২ সালে সাংবাদিক ইউনিয়ন রাজনৈতিক মতাদর্শে দুইভাগে ভাগ হওয়ার পর থেকে আমরা দেখছি বিভিন্ন সরকারের আমলে ক্ষমতাসীন রাজিনৈতিক দলের অনুগত সাংবাদিক নেতৃত্বের অংশই সাংবাদিকে সমাজের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন। এমনকি ড. মুহম্মদ ইউনূস সরকারের অন্তবর্তী সরকারের আমলেও হঠাৎ ওই সরকারের অনুগত হয়ে ওঠা এক শ্রেণির আমলাতান্ত্রিক সাংবাদিক নেতৃত্বের বিস্ময়কর উলম্ফনও আমরা দেখেছি। নিশ্চিতভাবে সরকারের অনুগত সাংবাদিক নেতৃত্বই নিবন্ধন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ তদারকিতে থাকবেন। ফলে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সত্যিকারের পেশাদারিত্বের মানদণ্ড বিচার করা নিয়ে বড় সংশয় কি থেকে যায় না? নিবন্ধন প্রক্রিয়া সাংবাদিকের পেশাদারিত্বের নিশ্চয়তা দেয় না, দিতে পারে না।

এখন সাংবাদিকদের কথা সাহিত্যিক, কবিদের মতো সৃজনশীল বিবেচনা করা হবে, নাকি চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক, প্রকৌশলীদের মতো প্রাতিষ্ঠানিক পেশাজীবি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, সে বিতর্কও রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকরা কবি, কথা সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পীদের মতো সৃজনশীল বিবেচিত হতে পারেন না। কারণ সাংবাদিককে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই দৈনিন্দিন জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে প্রমাণসহ তথ্য উপস্থাপন করতে হয়। এই তথ্য প্রদানে সৃজনশীল লেখকের মতো মনের মাধুরী মিশিয়ে উপমার ব্যবহার কিংবা আকাশে বাতাসে কল্পনার ডানা মেলে দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে অবশ্যই কারা পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে বিবেচিত হবেন তার একটা মানদণ্ড থাকা উচিত।

কিন্তু সেই মানদণ্ড অব্শ্যই একটি নিব্ন্ধন প্রক্রিয়া বা পরীক্ষা নয়। কারণ সাংবদিকরা চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক, প্রকৌশলীদের মতো টিপিক্যাল প্রাতিষ্ঠানিক পেশাজীবীও নন। সাংবাদিকতা শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উপরও নির্ভর করে না। কবি কিংবা কথা সাহিত্যিকের মতো না হলেও সাংবাদিকতায় মননশীরতা, সৃজনশীলতারও যোগ আছে। একই বাস্তব ঘটনার বিবরণ তথ্য, প্রমাণ ঠিক রেখে একেক সাংবাদিক তার সৃজনশীল মনন দিয়ে একেকভাবে তুলে ধরতে পারেন। যার উপস্থাপন যত বেশী পাঠকের কাছে হৃদয়গ্রাহী হবে তিনি ততবেশী পেশাদার সাংবাদিক। যেমন গ্রামীণ প্রেক্ষাপট নিয়ে অনেকেই সাংবাদিকতা করেছেন এবং করছেন। কিন্তু মোনাজাত উদ্দিন সবার ভেতরে থেকেও অনন্য হয়ে উঠেছিলেন নিজের অসাধারণ প্রতিভা আর সৃজনশীলতায়। একইভাবে ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে অনেক সাংবাদিক লেখেন, কিন্তু উৎপল শুভ্রের ম্যাচ রিপোর্ট পড়লে নিজের দেখা ম্যাচও অন্য এক আলোয় দেখা যায়। এখন উৎপল শুভ্রের পেশাদারিত্ব এবং সৃজনশীলতা কোন মানদণ্ডে পরিমাপ করবেন?

এখানেই মাননীয় তথ্যমন্ত্রীকে ভাবতে হবে। সাংবাদিকদের নিবন্ধন নয়, বরং সংবাদমাধ্যমগুলোকে সাংবাদিক নিয়োগে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মধ্যে আনতে হবে। সংবাদমাধ্যমগুলোকে যদি সাংবাদিক নিয়োগ এবং প্রাতষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড অনুসরণে বাধ্য করা হয় তাহলেও সমস্যার সমাধান সঠিকভাবে হওয়া সম্ভব। কারণ দিন শেষে বাংলাদেশে একজন সাংবাদিককে দায়বদ্ধ থাকতে হয় তার সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কাছেই। আমি উপরে সাভারের ঘটনায় ডেইলি স্টার ও ঢাকা টুডে’র প্রাতিষ্ঠানিক পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়েছি। প্রতিষ্ঠান যদি নিয়োগে, পরিচালনায় পেশাদারিত্ব অনুসরণ করে তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাংবাদিকরাও সেই মানদণ্ডে সত্যিকারের পেশাদার হয়ে উঠবেন। আবার উৎপল শুভ্রের মতো অসাধারণ প্রতিভাবান সাংবাদিকরাও তাদের সৃজনশীলতার যথাযথ প্রকাশ ঘটনোর সুযোগ পাবেন।

আর প্রতিষ্ঠানের জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকলে, প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে পেশাদার সাংবাদিকরাও হঠাৎ বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন না, আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়বেন না। আবার অদক্ষ, অযোগ্য কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুত করতে গিয়েও বড় জটিলতায় পড়তে হবে না প্রতিষ্ঠানগুলোকে। ফলে সাংবাদিক নামধারী অপেশাদার সাংবাদিকও তৈরি হবে না গন্ডায় গন্ডায়। সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বেও পেশাদারিত্ব আসবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালণা নিয়ন্ত্রণ করবে কে? সেজন্য বিএমএ কিংবা বার কাউন্সিলের মতো দায়িত্ব পালন করতে পারে প্রেস কাউন্সিল কিংবা গণমাধ্যম কমিশন। এটা প্রমাণিত, আমলতন্ত্র নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা ডিক্লারেশন বাণিজ্যের বিস্তৃতি ঘটায়, অসংখ্য অপেশাদার প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়, ফকিরারপুল কেন্দ্রিক আন্ডারগ্রাউন্ড সাংবাদিকতার পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠে। এজন্যই সংবাদমাধ্যমগুলোর (সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টিভি চ্যানেল) অনুমোদন, পরিচালনার মানদণ্ড তৈরি এবং সেই মানদণ্ড অনুযায়ী সংবাদমাধ্যমগুলোর পরিচালনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি সত্যিকারের সক্ষম ও গ্রহণযোগ্য প্রেস কাউন্সিল কিংবা গণমাধ্যম কমিশন গঠন সবচেয়ে জরুরি। আশা করি সরকারের নীতি নির্ধারকরা এই বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে অভিশাপ মুক্ত করে সরকারের সামনে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে নিরপেক্ষ, পেশাদার সংবাদমাধ্যম দেশের স্বার্থেই ভীষণ জরুরি।

রাশেদ মেহেদী, সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ