ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
সংখ্যালঘু, আওয়ামী লীগ ও তরুণ ভোটারে বিশেষ দৃষ্টি জামায়াত-বিএনপির
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টি এখন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংকের দিকে। সেগুলো হচ্ছে সংখ্যালঘু, আওয়ামী লীগ–সমর্থক ও তরুণ ভোটার। এবারের নির্বাচনের আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মাঠে না থাকায় তাদের সমর্থক ভোটারদের অবস্থান ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও আস্থার প্রশ্ন, আওয়ামী লীগ–সমর্থকদের ভোট নিজেদের বাক্সে নেওয়া এবং তরুণদের চাকরি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে কৌশল সাজাচ্ছে অংশগ্রহণকারী দলগুলো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এসব ভোটারই এবারের নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকে চোখ বিএনপি ও জামায়াতের
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী রাজনীতিতে নানা কৌশলগত হিসাব–নিকাশ স্পষ্ট হলেও একটি জায়গায় এসে বিএনপি ও জামায়াত কার্যত অস্বস্তিতে পড়েছে, তা হচ্সংছে খ্যালঘু ভোটব্যাংক। ভোটের অঙ্কে এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই ভোটব্যাংকে বিএনপি ও জামায়াত এখনো বড় ধরনের আস্থা সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী-বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায় অধিকাংশই ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির কারণে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘুদের কাছে তুলনামূলক নিরাপদ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত। এর বিপরীতে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাস সংখ্যালঘুদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি করেছে। তার পরেও এবার আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে না থাকায় সংখ্যালঘু ভোট নিজেদের বাক্সে নিতে মরিয়া বিএনপি-জামায়াত উভয় দলই।
সংখ্যালঘু ভোটার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকা ২০টি সংসদীয় আসন হচ্ছে- ১. খুলনা-১ (বটিয়াঘাটা-দাকোপ) আসনে সংখ্যালঘু ভোটার প্রায় ৪৭ শতাংশ। খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে প্রায় ২৭ শতাংশ। এছাড়া খুলনা-৬, বাগেরহাট-১, বাগেরহাট-৪, মাগুরা-১, মাগুরা-২, বরিশাল-১, বরিশাল-৫, নেত্রকোনা-৪, খাগড়াছড়ি, রঙ্গামাটি, বান্দরবান, গাইবান্ধা-২, গাইবান্ধা-৫, সুনামগঞ্জ-২, মৌলভীবাজার-৩, ঢাকা-৮, ঢাকা-১২, চট্টগ্রাম-১১, সিলেট-১, লক্ষ্মীপুর-৪, গোপালগঞ্জ-৩, দিনাজপুর–১ ও দিনাজপুর-৬। এসব আসনে এবারের নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যালঘুদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। দলটির নেতারা বক্তব্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলছেন। কিছু এলাকায় সংখ্যালঘু নেতাদের সঙ্গে বৈঠক, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং প্রতিশ্রুতিমূলক বক্তব্যও দেওয়ারও সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াতও সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে প্রভাব বিস্তার করতে সক্রিয়। তারা স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে বৈঠক, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং প্রতিশ্রুতিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে ভোটারদের মন জয় করতে চেষ্টা করছে। বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট, মাগুরা, দিনাজপুর ও বরিশালসহ সংখ্যালঘু অংশ বেশি থাকা আসনগুলোতে জামায়াত তাদের প্রচারণা তীব্র করেছে। দলটি মূলত ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সমাজকল্যাণের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরার মাধ্যমে ভোটারদের সমর্থন আকর্ষণ করছে। খুলনা‑১ (দাকোপ‑বটিয়াঘাটা) আসনে তোকৃষ্ণ নন্দী নামের একজন হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাকে প্রার্থেই ঘোষণা করেছে দলটি। তিনি জামায়াতের ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি। এটি জামায়াতের প্রথম হিন্দু প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী দৌড়ে নামা একটি নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মন্দিরে হামলা, ভূমি দখল, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচারহীনতার অভিযোগ সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে রয়েছে বলে জানা গেছে। এই বাস্তবতায় সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকে বিএনপি ও জামায়াত কার্যত ‘চাপে’ ও ‘চোখে’ রাখছে। উভয় দলই জানে, এই ভোটব্যাংকের বড় অংশ তাদের পক্ষে না এলে অনেক আসনে বিজয় কঠিন হবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক এখনো বিএনপি ও জামায়াতের জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। আস্থার সংকট, ইতিহাসের বোঝা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা এই তিনটি দেয়াল ভেঙে সামনে এগোনো তাদের জন্য সহজ হবে না।
আওয়ামী লীগের ভোটারদের টানতে মরিয়া বিএনপি-জামায়াত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মাঠে না থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক ভিন্ন চিত্র সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরিয়তপুর, দিনাজপুর, পার্বত্য চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, পটুয়াখালী ও খুলনা অঞ্চলের মতো দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকায় এ পরিস্থিতি আরও বেশি। এসব এলাকায় সাধারণত আওয়ামী লীগ–সমর্থকরা ভোটের বড় ব্যাঙ্ক হিসেবে কাজ করেছে, কিন্তু এবার নৌকার ভোটাররা কোন দলকে ভোট দেবে তা এখন অনিশ্চিত।
বিএনপি এবং জামায়াত স্থানীয় পর্যায়ে প্রচারণা ও জনসংযোগ বাড়াচ্ছে। তারা আওয়ামী লীগ–সমর্থকদের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে—যেমন নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও স্থানীয় উন্নয়ন নিয়ে প্রতিশ্রুতি। এসব এলাকায় নেতা-কর্মীরা বৈঠক, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং প্রতিশ্রুতিমূলক বক্তব্য দিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা চালাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আওয়ামী লীগ–সমর্থকরা যে এবারের নির্বাচনে ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে তা ভোটে অংশগ্রাহণকারী সব দলই ভালোভাবে জানে। নির্বাচনী মাঠে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বিশেষ করে এই অধ্যুষিত এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ উভয়ই তৈরি করছে।
বিএনপির কৌশল: আওয়ামী লীগ সমর্থকদের আস্থা অর্জন
সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির বক্তব্য ও রাজনৈতিক ভাষ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দলটি কেবল আওয়ামী লীগকে আক্রমণ করার পথে নেই। বরং তারা চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সমর্থকদের আলাদা করে দেখতে। দিচ্ছেন নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও।
বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে প্রায়ই উঠে আসছে—“সমস্যা দল নয়, সমস্যা সরকার পরিচালনার ধরন।” এই বার্তার মাধ্যমে বিএনপি বোঝাতে চায় যে তারা আওয়ামী লীগ–সমর্থকদের শত্রু মনে করে না; বরং তারা মনে করে সাধারণ আওয়ামী সমর্থকরাও বর্তমান ব্যবস্থার ভুক্তভোগী। এ ছাড়া ব্যাক্তিগ ও সমষ্টিগ্রত নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন সামনে এনে বিএনপি কাছে টানছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটারদের। তাতে অনেকটা সফলও হচ্ছে বিএনপি, এমনটাই জানা গেছে।
জামায়াতের কৌশল: ধর্মপ্রাণ আওয়ামী ভোটার
জামায়াতে ইসলামী সরাসরি বড় জনসভা বা প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকলেও সামাজিক ও ধর্মীয় নেটওয়ার্কে তাদের তৎপরতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জামায়াত মূলত আওয়ামী লীগের ধর্মভিত্তিক সমালোচকদের দিকে নজর দিচ্ছে। তারা চেষ্টা করছে এই ধারণা দিতে যে আওয়ামী লীগ ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে গেছে এবং সাধারণ মুসলমান ভোটারদের অনুভূতির প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। এমন প্রচারণা চালিয়ে জামায়াত আওয়ামী লীগের সেই সমর্থকদের টার্গেট করছে, যারা আদর্শগতভাবে ধর্মীয় বিষয়ে সংবেদনশীল কিন্তু সরাসরি বিএনপির রাজনীতিতে স্বচ্ছন্দ নন। বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যবয়সী ধর্মপ্রাণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের এই প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তরুণ ভোটারের ভোট পেতে বিএনপি ও জামায়াত উভয়ই মরিয়া
এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের বিশেষভাবে দৃষ্টি তরুণ ভোটারদের দিকে কেন্দ্রীভূত। দেশে মোট ভোটারের প্রায় ৩০ শতাংশই ১৮–৩৫ বয়সী তরুণ, যা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলগুলো এখন এই অংশের সমর্থন জোগাড় করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কর্মসূচি, শিক্ষার্থী ও যুবসমাবেশের মাধ্যমে প্রচারণা জোরদার করেছে।
বিএনপি তরুণদের মধ্যে চাকরি, শিক্ষার সুযোগ, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রের উন্নয়নসহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছে। জামায়াতও যুবসমাবেশ, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম এবং স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করছে। বিশেষ করে নগরাঞ্চল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক এলাকায় তারা তরুণদের মন জয় করতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
জামায়াত ইসলামীও তরুণ ভোটারদের কাছে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক সাম্য, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম এবং স্থানীয় উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছে। তারা যুবসমাবেশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি কার্যক্রমের মাধ্যমে সরাসরি তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করছে এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধকে নির্বাচনী বার্তার অংশ হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে নগরাঞ্চল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক এলাকায় তারা তরুণ ভোটারদের মন জয় করতে এই দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রেখেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তরুণ ভোটার এবারের নির্বাচনে ফলাফলের বড় ফ্যাক্টর হতে পারে। কারণ তরুণরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সক্রিয়, দ্রুত তথ্য গ্রহণ করে এবং নতুন রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে সহজে সাড়া দেয়। নির্বাচনী মাঠে তরুণদের অংশগ্রহণ শুধুমাত্র ভোটের সংখ্যা বাড়াবে না, বরং ভোটের মৌলিক প্রভাবকেও নির্ধারণ করবে।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে