Views Bangladesh Logo

যুক্তরাষ্ট্রই বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র?

Rased Mehedi

রাশেদ মেহেদী

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে বিশ্ব মেনে নিয়েছে। বিশ্ব মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান ‘সভ্য’ দুনিয়া এটাও মেনে নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো দেশে যেকোনো মুহূর্তে হামলা চালানোর, সামরিক-বেসামরিক মানুষকে হত্যা করার, রাষ্ট্র কিংবা সরকার প্রধানকে তুলে নেওয়ার এবং সম্পদ দখলের অধিকার রয়েছে। অতএব এটাও স্পষ্ট করেই প্রমাণিত হয়, বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় একমাত্র স্বাধীন দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের অন্যসব রাষ্ট্র তার উপনিবেশ বা কলোনী রাষ্ট্র।

আপনি হয়তো বলবেন, রাশিয়া, চীন তো প্রতিবাদ জানিয়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অনেক রাষ্ট্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। প্রতিক্রিয়া জানানোর তালিকায় বাংলাদেশ, ভারতও আছে। অতএব ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা বিশ্ব মেনে নিল কীভাবে? আসুন প্রতিবাদ এবং প্রতিক্রিয়ার ভাষাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। সবচেয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া এসেছে চীনের কাছ থেকে, “আমরা কখনোই বিশ্বাস করি না যে, কোনো দেশ বিশ্বের পুলিশ হিসেবে কাজ করতে পারে, কিংবা কোনো দেশ নিজেকে বিশ্বের বিচারক হিসেবে দাবি করবে- সেটিও আমরা মেনে নেব না।” দেখুন কী সতর্ক প্রতিক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়েছে, সেখানে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু চীনের প্রতিক্রিয়ায় ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রতিক্রিয়ার ভাষায় চীন শুধুমাত্র কোনো দেশের “বিশ্বের বিচারক” সাজার দাবি মেনে না নেওয়ার কথা বলেছে। এই প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চীন প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন জানিয়েছে।

রাশিয়া আরও স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কারাকাস আক্রমণে সমর্থন দিয়েছে। রাশিয়া প্রতিক্রিয়ায় “দুই পক্ষের প্রতি সংযম প্রদর্শন এবং সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান জানিয়েছে।” কী হাস্যকর! রাশিয়া কি ইউক্রেনে হামলার সময় “সংযম” এবং “সংলাপ” শব্দগুলো মনে রেখেছিল?

যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা ফোর্স তো রাতের আঁধারে একদল ডাকাতের মতো কারাকাসে হামলা করেছে। ভেনেজুয়েলা তো কোনো হামলা চালায়নি। তাহলে এখানে দুই পক্ষ হলো কীভাবে? দুই পক্ষ বলার অর্থই হচ্ছে ভেনেজুয়েলার হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি রাশিয়ার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

চীন, রাশিয়ার এ ধরনের প্রতিবাদ কিংবা প্রতিক্রিয়ার পর অন্য দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিশ্লেষণের আর কিছু থাকে না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে রাশিয়ার হামলার শিকার ইউক্রেন ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন দিয়েছে। এতদিনে প্রমাণ হলো, ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা প্রকৃতপক্ষে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা প্রস্তুতির প্রথম পর্ব ছিল। জেলেনস্কি আসলে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া দুই দেশের রঙ্গমঞ্চেরই ক্লাউন।

এবার ইরানের পালা। ইরানে যা শুরু হয়েছে, বেশ বোঝা যাচ্ছে, খোমেনি শাসনের অবসানের মধ্য দিয়েই এই গণবিক্ষোভের শেষ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। অনেকের ধারণা ছিল তেহরানে খোমেনির বিপ্লবী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের ঘোর বিরোধী। প্রকৃতপক্ষে তা নয়। দৃশ্যত, রেজা শাহ পাহলভীকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র বলা হলেও ষাট, সত্তর ও আশির দশকে পাহলভীর নেতৃত্বে ইরানের দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র কখনই তার মধ্যপ্রাচ্যের সেনানিবাস ও সামরিক গবেষণাগার ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের পাশে আর কোনো রাষ্ট্রকেই কোনো উন্নত ও উদার দৃষ্টিভঙ্গীর দেশ হিসেবে দেখতে চায়নি। যে কারণে টার্গেট হয় ইরান, ইরাক ও সিরিয়া। কারণ এই তিনটি দেশই উন্নততর শিক্ষা ও প্রযুক্তি গবেষণায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল। অন্যদিকে ভোগ-বিলাসের রাজতন্ত্রের দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত কিংবা কাতার অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হলেও বিজ্ঞানচর্চা ও শিক্ষায় অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া দেশ হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একেবারেই মাথাব্যথার কারণ ছিল না। বরং ইরাকে হামলার সময় সৌদি আরব ও কুয়েতের অতি বিলাসী রাজারা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের একান্ত বাধ্যানুগত কলোনী প্রধান হিসেবেই ভূমিকা পালন করেছে।

অতএব ধর্মীয় গোঁড়ামির তত্ত্ব এবং আন্তঃধর্মীয় সংঘাতই হচ্ছে একটি শক্তিশালী অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়া দেশকে দুর্বল করার প্রধান অস্ত্র। ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মূলত তার আধিপত্যবাদ টিকিয়ে রাখার মেটিকুলাস ডিজাইনে দু’টি অস্ত্র প্রয়োগ করে। একটি হচ্ছে মাদক এবং অপরটি হচ্ছে উগ্র ধর্মীয় তত্ত্ব বা জঙ্গি উৎপাদন ও প্রতিপালন কর্মসূচি। ল্যাটিন আমেরিকায় জঙ্গিবাদ বিস্তার সহজ না হওয়ার কারণে সেখনে মাদকের বিস্তারই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অস্ত্র।

অন্যদিকে, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় গোঁড়ামির তত্ত্ব বেশ চলে। অতএব এখানেই জঙ্গি উৎপাদন ও প্রতিপালন কর্মসূচিই যুক্তরোষ্ট্রের আধিপত্যবাদ টিকিয়ে রাখার প্রধান হাতিয়ার। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় ৮০ শতাংশ টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারটে নেটওয়ার্ক, ৯৯ শতাংশ অপারেটিং সফটওয়্যার, ৯০ শতাংশ নিরাপত্তা সফটওয়্যার, ৯৫ শতাংশ অ্যাপ এবং ৯৯ শতাংশ সোশ্যাল মিডিয়া যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি দ্বারা পরিচালিত। অতএব যুক্তরাষ্ট্রের নজরের বাইরে কিছুই নেই, কিছুই চলে না। অতএব মাদকের বিস্তার কিংবা জঙ্গিবাদের তাণ্ডব অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের ইশারার বাইরে হচ্ছে, এটা ভাবাটা নিছক বোকামি।

প্রকৃতপক্ষে ইরানের খামেনি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তাতেই ক্ষমতায় এসেছিল। তবে তার চরিত্র ছিল ভিন্ন। সে সময়ে ইরানের ভেতরে মেটিকুলাস ডিজাইন অনুযায়ী মার্কিন বিরোধিতার ভিত্তি হিসেবে ধর্মীর গোঁড়ামির যে তত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেটা পোক্ত করতেই ১৯৭৯ সালে পাহলভী সরকারের পতনের পর তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে হামলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল ধর্মীয় গোঁড়ামির তত্ত্বে খোমেনি সরকারের সময়ে ধীরে ধীরে জ্ঞানচর্চায় পিছিয়ে পড়ে ইরান একটি দুর্বল অর্থনীতির রাষ্ট্রে পরিণত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সেই চেষ্টা সফল হয়েছে। খোমেনি সরকার সামরিক সরঞ্জাম কেনা ও সীমিত পারমাণবিক অস্ত্রের গবেষণায় বিপুল ব্যয় বাড়িয়েছে। দেশের শিক্ষা ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ প্রতি বছর কমেছে। ফলে ধীরে ধীরে দেশের উন্নয়ন অর্থনীতি দুর্বল হয়ে গেছে। সেই অর্থনৈতিক দুর্বলতাই আজকের ইরানে বিক্ষোভের মূল কারণ। তবে খোমেনির শাসনামলে ইরান যে সামরিক সক্ষমতা অর্জন করেছে তার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের থাকেনি।

যেমন একসময় যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনি তাদের অনুগত লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি এবং মিশরের হোসনি মোবারকের ক্ষেত্রে। এ কারণেই খোমেনিকে এখন সেই গাদ্দাফি, হোসনি মোবারকের পরিণতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে। এখন খোমেনি সরকার টিকে গেলে সেটা হবে বড় বিস্ময়।

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে একটু অতীতে তাকালে দেখা যাবে, নব্বইয়ের দশক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের একক বৃহত্তম গণহত্যাকারী দেশ। ইরাকে দুই দফায় ‍মিথ্যা তথ্যের অজুহাতে প্রায় দুই লাখ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। লক্ষ্য ছিল ইরাককে একটি পঙ্গু রাষ্ট্রে পরিণত করা, সেটা করেছে। সাদ্দাম হোসেনের কাছে রাসায়নিক অস্ত্র থাকা, কুয়েতে হাসপাতালে শিশু হত্যা- সবকিছুই পরে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তেই ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। এভাবে প্রমাণ ছাড়া শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে একটা দেশের দুই লাখ মানুষকে হত্যার কথা হাসিমুখে স্বীকার করতে পারে কেবল যুক্তরাষ্ট্রই। কারণ তারাই একমাত্র জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে স্বাধীন দেশ!

ভেনেজুয়েলায় হামলার পরে যেমন, ঠিক ইরাকে হামলার সময়ও রাশিয়ার এবং চীনের ভূমিকা ছিল একই কিংবা এখনকার চেয়ে আরও দুর্বল। প্রকৃতপক্ষে মিখাইল গরভাচেভের আমল থেকে রাশিয়া এবং সুন চিং লি ও ডং বি-উ’র আমল থেকে চীন মূলত কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেনি। সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে প্রতিক্রিয়া দিয়ে দু’টি দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সব সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন যুগিয়ে গেছে। আর ইউরোপের দেশগুলো নিজেরা ভালো থাকার স্বার্থে কোনো ঝুট-ঝামেলায় জড়াতে চায়নি। যে কারণে তারা কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত বিশ্লেষকদের একটা কমন ডায়ালগ আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটা বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এই বিশ্ব ব্যবস্থা ভাঙলে বিশ্বে বড় বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ভয়ের কারণেই অনেক দেশের রাষ্ট্র এবং সরকার প্রধানরা কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে পারছে না। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য না থাকলে বিশ্ব অচল হয়ে যাবে!

অথচ তারা প্রশ্ন তোলেন না, যখন যুক্তরাষ্ট্র যখন ইচ্ছা তখন একটা দেশে হামলা চালায়, একটা দেশের তেল সম্পদ নিজেদের বলে ঘোষণা দেয়, একটা দেশে গণহত্যা চালায়, মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে দেশে দেশে নিজেদের খেয়াল-খুশি মতো সরকার বদলায়। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের কর্মকাণ্ড তাদের কাছে কর্তৃত্ববাদী নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বন্দুকের গুলিতে নিরীহ মানুষ মারা গেলে তারাও জেলনস্কির সুরে বলে ওঠেন, “ওয়াও”।

এখন এমন একটা বৈশ্বিক অবস্থা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে কোনো লাভ নেই। রাশিয়া-চীনসহ বিশ্বের সব রাষ্ট্রকেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, সিনেট আর কংগ্রেসের সামনে মাথা নত করেই থাকতে হবে। কারণ বিশ্বের সব দেশই প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের একেকটা কলোনী। এ কলোনী এক দিনে গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি, বিশেষত, ইন্টারনেটভিত্তিক সামরিক কৌশল নিয়ে এগিয়ে গেছে, তখন রাশিয়া-চীনের মতো দেশগুলো দৌড়ে অনেক পিছিয়ে পড়েছে।

ধীরে ধীরে বিশ্ব যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যপ্রযুক্তির কলোনী হয়ে গেছে। এখন তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করে অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি গতিতে দৌড়েও তথ্যপ্রযুক্তিতে চীন যুক্তরাষ্ট্রের যোজন মাইল পেছনেই পড়ে থাকছে। আর রাশিয়া তো সাইবেরিয়ার ঠান্ডা হাওয়ায় ভারী ওভারকোট থেকে মুখ বের করা করা এক সতর্ক দৃষ্টির বাজপাখি, যে শুধু নিজের শিকার পেলে একদম খুশি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞও।

লেখক: সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ