Views Bangladesh Logo

প্রতিকূলতায়ও টিকে থাকতে শিখে গেছে ইরান!

পারস্য সাম্রাজ্যের সূচনা থেকেই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার এক দীর্ঘ ইতিহাস বহন করে আসছে ইরান। সময়ের পরিক্রমায় নানা আক্রমণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে তাদের এই দৃঢ় মানসিকতা। বিশেষ করে ইরান-ইরাক যুদ্ধ দেশটিকে শিখিয়েছে কীভাবে সীমিত সম্পদ নিয়েও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয় এবং দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। আজ যখন বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিধর দেশের সঙ্গে সরাসরি উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়ছে তেহরান তখন প্রশ্ন উঠছে এই অবস্থান কি কেবল আধুনিক প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতার ফল, নাকি ইতিহাসের কঠিন অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া আত্মনির্ভরতার শিক্ষা? নাকি এটি পারস্যের প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রেখে মাথা উঁচু করে টিকে থাকার এক অবিচল সংকল্পের বহিঃপ্রকাশ?


দীর্ঘ ইতিহাসজুড়ে যুদ্ধ, সাম্রাজ্য পতন, বিপ্লব ও আন্তর্জাতিক চাপ- এই সবকিছুর মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে ইরানের রাষ্ট্রচিন্তা ও কৌশলগত মানসিকতা। পারস্য সাম্রাজ্যের সময় থেকে শুরু করে আধুনিক ইসলামি প্রজাতন্ত্র পর্যন্ত একটিই বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট। আর তা হচ্ছে প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার এক অনমনীয় ক্ষমতা। তবে এই শক্তির পেছনে শুধু ইতিহাস বা সামরিক সক্ষমতা নয়, ইরানের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানও সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাহাড়বেষ্টিত ভূখণ্ড, বিস্তৃত মালভূমি, কঠিন মরুভূমি এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ- সব মিলিয়ে ইরানকে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রতিরোধক্ষম রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।


১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান যখন রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত, তখন দেশটির ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই তাকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়। উত্তর ও পশ্চিমে জাগরোস ও এলবুর্জ পর্বতমালা প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে কাজ করে, যা শত্রুপক্ষের অগ্রযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। দক্ষিণে পারস্য উপসাগর এবং তার মুখে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব ইরানকে একটি কৌশলগত সুবিধা দেয়, যা বৈশ্বিক শক্তিগুলোর জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।


১৯৮০ সালে সাদ্দাম হোসেন যখন ইরানে আক্রমণ চালান তখন তার ধারণা ছিল, দুর্বল রাষ্ট্র কাঠামোর কারণে ইরান দ্রুত ভেঙে পড়বে। কিন্তু ইরানের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য যেমন পাহাড়, মরুভূমি ও বিস্তৃত মালভূমি ইরাকি বাহিনীর অগ্রযাত্রাকে ধীর করে দেয়। আট বছরের দীর্ঘ যুদ্ধে এই ভূপ্রকৃতি ইরানের জন্য একটি বড় কৌশলগত সুবিধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সীমিত সম্পদ নিয়েও তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।


এই যুদ্ধ ইরানকে শেখায় যে, ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে প্রতিরক্ষা কৌশল গড়ে তুলতে হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইরান তাদের সামরিক স্থাপনাগুলো পাহাড়ের গভীরে ও মাটির নিচে স্থানান্তর করে, যা শত্রুপক্ষের বিমান হামলা থেকে সেগুলোকে রক্ষা করে। এই ধরনের অবকাঠামো আজও ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


ইরানের বিস্তৃত মালভূমি ও মরুভূমি অঞ্চলও প্রতিরক্ষা কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই কঠিন ভূখণ্ডে যুদ্ধ পরিচালনা করা বহিরাগত শক্তির জন্য চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু স্থানীয় বাহিনীর জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক। ফলে সম্ভাব্য স্থলযুদ্ধে ইরান একটি প্রাকৃতিক সুবিধা পায়। একই সঙ্গে এই অঞ্চলগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা স্থাপন করা সহজ, যা শত্রুর নজর এড়িয়ে পরিচালনা করা যায়।


ইরানের সামরিক শক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা। বিস্তৃত ভূখণ্ড এবং পাহাড়ি এলাকা এসব অস্ত্রের মোতায়েন ও গোপনীয়তা বজায় রাখতে সহায়তা করে। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি শত্রুপক্ষের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণকে কঠিন করে তোলে। পাশাপাশি হাজার হাজার ড্রোন ও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ইরানকে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধক্ষম রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। আইআরজিসি বা রেভল্যুশনারি গার্ড এই পুরো কৌশলগত কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু। তারা শুধু স্থলবাহিনী নয়, বরং নৌ ও আকাশ প্রতিরক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে তাদের উপস্থিতি ইরানের কৌশলগত গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এই প্রণালির মাধ্যমে বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল পরিবহন হয়, ফলে এখানে ইরানের প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।


ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ এবং পারমাণবিক কর্মসূচিও তাদের কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। যদিও এটি আন্তর্জাতিক বিতর্কের বিষয়, তবে এটি ইরানকে একটি প্রতিরোধমূলক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছে। একই সঙ্গে এটি তাদেরকে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে আলোচনায় একটি বাড়তি সুবিধা দেয়।


বর্তমান মার্কিন-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের এই ভৌগোলিক ও সামরিক শক্তির সমন্বয় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সরাসরি সংঘর্ষের পরিবর্তে তারা এমন একটি কৌশল অনুসরণ করে, যেখানে নিজেদের ভূখণ্ড, আঞ্চলিক প্রভাব এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা যায়। হরমুজ প্রণালি, পারস্য উপসাগর এবং পার্বত্য সীমান্ত- সব মিলিয়ে ইরান একটি বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছে।


সব মিলিয়ে ইরানের টিকে থাকার রহস্য শুধু ইতিহাস বা সামরিক শক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে তাদের ভৌগোলিক বাস্তবতা। পাহাড়, মালভূমি, মরুভূমি এবং হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত অবস্থান-সবকিছু মিলিয়েই ইরানকে একটি জটিল কিন্তু দৃঢ় রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। যা মনে করিয়ে দেয় পারস্য সাম্রাজ্যে সেই অপাজেয় জাতির গৌরবময় ইতিহাস। যারা জানে, চরম বৈরী পরিস্থিতিতেও কিভাবে মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে হয়।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ