Views Bangladesh Logo

বিশ্ব এনজিও দিবস ২০২৬

অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও মানবিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার

প্রতি বছর ২৭শে ফেব্রুয়ারি সারাবিশ্বের কিছু দেশে বিশ্ব এনজিও দিবস পালন করা হয়। বিশ্ব এনজিও দিবস এর একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। বিশ্ব এনজিও দিবস সারাবিশ্বে সমাজ উন্নয়নে নিরন্তর কাজ করে যাওয়া বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থাসমূহের জন্য একটি বৈশ্বিক উপলক্ষ হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে এটি এনজিওদের মাথাউঁচু করে দাড়াবার স্বীকৃতি, এটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উন্নয়নের অংশীদারীত্বের স্বীকৃতি। বর্তমানে বিশ্বের ৮৯ টিরও বেশি দেশে এ দিবসটি সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে বাংলাদেশ এনজিও’র সুতিকাগার হলেও এখানে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয় না।

পেছনের গল্প

বিশ্ব এনজিও দিবসের ধারণাটি ২০০৯ সালে সামাজিক উদ্যোক্তা Marcis Liors Skadmanis সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বেসরকারি উদ্যোগসমূহের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতি দিতে একটি সুনির্দিষ্ট দিবসের বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে আসেন। ২০১০ সালে, বাল্টিক সমুদ্রের তীরবর্তী অঞ্চলের এনজিওদের ফোরাম “বাল্টিক সি এনজিও ফোরাম” আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব এনজিও দিবস প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয়। এই প্রস্তাবটি খুব দ্রুতই বৃহত্তর এনজিও সমাজের সমর্থন পায় এবং তাদের প্রয়োজনীয়তা ও প্রচেষ্টার স্বীকৃতি সরূপ ২০১৪ সালে ফিনল্যান্ডের পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের আনুকূল্যে প্রথমবারের মতো বিশ্ব এনজিও দিবস পালিত হয়।

প্রতিপাদ্য’র বিকাশ

প্রতিষ্ঠার পর থেকে, বিশ্ব এনজিও দিবস এনজিও অবদানের বিভিন্ন দিক প্রতিফলিত করে বিভিন্ন থিম গ্রহণ করেছে। ২০১৫ সালে "কাউকে পিছনে ফেলে নয় থেকে শুরু করে প্রতিবছরই নতুন প্রতিপাদ্যকে উপলক্ষ করে দিবস উদযাপিত হতে থাকে। বিগত বছরে দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল “টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এনজিওগুলোর ভূমিকা”এ বছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে “ Restoring Dignity Through Inclusion” অর্ন্তভূক্তির মাধ্যমে মর্যাদা পুনরুদ্ধার”। এ পর্যন্ত, প্রতিটি প্রতিপাদ্য এনজিওগুলির বহুমুখী কাজ ও বহুমাত্রিক অবদানকে তুলে ধরে। এ বছরের প্রতিপাদ্যে অর্ন্তভুক্তিমূলক উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। "অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে মর্যাদা পুনরুদ্ধার" বা “Restoring Dignity Through Inclusion”—এই প্রতিপাদ্যটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন মানে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং সমাজের প্রতিটি প্রান্তে থাকা সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষকে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা। যখন একজন মানুষ তার অধিকার ও সুযোগের সমতা পায়, তখনই তার হারিয়ে যাওয়া সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার হয়। এনজিওগুলো এই দর্শনেই বিশ্বাস করে যে, কাউকে পেছনে ফেলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়; তাই প্রতিটি কর্মসূচি হতে হবে অংশগ্রহণমূলক। এই প্রতিপাদ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করাই টেকসই উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

তাৎপর্য ও সংহতি

বর্তমানে বিশ্ব এনজিও দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি বিশ্বব্যাপী এনজিও, সরকার, সুশীল সমাজ এবং উদ্যমী ব্যক্তিদের একযোগে কাজ করার একটি অনন্য সেতুবন্ধন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আজ এই দিবসের বার্তাকে ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে, যা ইতিবাচক পরিবর্তনের লড়াইয়ে এনজিওদের অপরিহার্য ভূমিকাকে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এই দিবসটি এনজিওদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করার এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে প্রান্তিক মানুষের দাবিগুলো পৌঁছে দেওয়ার একটি বলিষ্ঠ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে।
এবারের প্রতিপাদ্য “Restoring Dignity Through Inclusion” বা “অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে মর্যাদা পুনরুদ্ধার” আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এনজিওগুলোর মূল শক্তি হলো সমাজের প্রতিটি স্তরে সমতা ও সমন্বয় নিশ্চিত করা। এই উপলক্ষটি সামাজিক উন্নয়ন খাতের ভেতরে আন্তঃযোগাযোগ বৃদ্ধি করে এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ কর্মপদ্ধতি গড়ে তুলতে সহায়তা করে। সর্বোপরি, বিশ্ব এনজিও দিবস আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে—সহযোগিতা ও সংহতির মাধ্যমেই আমরা একটি বৈষম্যহীন, টেকসই এবং মানবিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি।

জনআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ ও সরকারের প্রতি নিবেদন
জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান আমাদের সামনে এক বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এই নতুন যাত্রায় বর্তমান নির্বাচিত জনবান্ধব সরকারের নিকট আমাদের বিনীত নিবেদন—রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিটি পদক্ষেপে এনজিওদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগান। আমরা কেবল এনজিও সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি নই, বরং আমরা এই মাটির মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার; তাই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এনজিওদের ওপর অর্পিত অযথা প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে একটি সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করুন। সরকারের প্রতি আমাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ—তৃণমূলের কণ্ঠস্বর যেন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, সেজন্য এনজিওদের সাথে নিয়মিত সংলাপের পথ উন্মুক্ত রাখুন। আসুন, এই পরিবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এমন এক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করি, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে এবং উন্নয়নের সুফল পৌঁছে যাবে একেবারে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায়।

শেষকথা

পরিশেষে বলবো, এনজিও মানে কেবল কিছু দাতা সংস্থার প্রকল্প বা কিছু কাগুজে রিপোর্ট নয়। এনজিও হলো সেই ভরসার নাম, যা মাঝরাতের দুর্যোগে অসহায়ের পাশে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়ায়; এনজিও হলো সেই সাহস, যা অবহেলিত নারীর চোখে স্বাবলম্বী হওয়ার রঙিন স্বপ্ন বুনে দেয়, এনজিও হলো সেই সংগীর নাম যে অসহায়কে বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়। অনেক চরাই উৎরাই পার হয়ে এলেও আমাদের মূল লক্ষ্য কক্ষনোই বিচ্যুত হয়নি—আর তা হলো 'নিঃস্বার্থে মানুষের সেবা'। আমরা এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে উন্নয়নের সুফল কেবল শহরের উঁচু দালানেই আটকে থাকবে না, বরং তা পৌঁছে যাবে পাহাড়-সমতলের শেষ প্রান্তে থাকা প্রতিটি মানুষের জীর্ণ কুটিরে।
আজকের এই বিশ্ব এনজিও দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—আমরা রাষ্ট্রের সহযোগী শক্তি, আমরা সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদের গড়ার কার্যকর অংশীদার। এনজিওদের প্রতিও আবেদন থাকবে, আসুন, সাধারণ মানুষের অটুট আস্থার প্রতীক হই এবং নিজেদের স্বচ্ছতা ও কঠোর জবাবদিহিতার মাধ্যমে এনজিও খাতকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাই।
কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন করা নয়, আমাদের প্রকৃত কাজ হলো প্রতিটি মানুষের হারানো 'মর্যাদা' ফিরিয়ে দেওয়া। সেই মর্যাদার লড়াইয়ে আমরা অতীতে ছিলাম, বর্তমানে আছি এবং অনাগত ভবিষ্যতেও মানুষের পাশেই থাকবো। সবাইকে আবারও বিশ্ব এনজিও দিবসের শুভেচ্ছা।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ