৬ বছরের শিশু ও ৭৫ বছরের বৃদ্ধ কারাগারে: আইন ও মানবাধিকারের প্রশ্নে সরব আইনজ্ঞরা
কক্সবাজারের উখিয়ায় এক আসামি পালিয়ে যাওয়ার জেরে তার পরিবারের একজন বৃদ্ধ, দুই গৃহবধূ এবং মাত্র ৬ বছরের একটি শিশুকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর ঘটনা এখন আইন ও মানবাধিকারের প্রশ্নে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শনিবার রাতে রাজাপালং ইউনিয়নের শেখপাড়ায় পরিচালিত ওই পুলিশি অভিযানের পর থেকে স্থানীয় জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে তীব্র সমালোচনা। আইনজ্ঞরা পুরো ঘটনাটিকে সরাসরি অমানবিক ও আইনবহির্ভূত বলে আখ্যা দিয়েছেন।
যেভাবে শুরু
ঘটনার সূত্রপাত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সালাহউদ্দিন মেম্বারের ছোট ভাই মিজানকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে। পুলিশের দাবি, হাতকড়া পরা অবস্থায় মিজান পালিয়ে যান এবং এতে তার পরিবারের সদস্যরা সহায়তা করেন। এর পরপরই অভিযান চালিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ ভিন্ন— মিজানের পালিয়ে যাওয়ার ‘খেসারত’ হিসেবেই নিরীহ পরিবারের সদস্যদের আটক করা হয়েছে, যা আইনের মৌলিক নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
সংবিধান ও ফৌজদারি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার নেত্রী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় তার পরিবারের ওপর চাপানো বাংলাদেশের সংবিধান ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত অপরাধের দায় কখনোই পারিবারিকভাবে আরোপ করা যায় না। যদি কেউ সরাসরি অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ না থাকে, তাহলে তাকে গ্রেফতার করা সম্পূর্ণ বেআইনি। এখানে পুলিশ যদি শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে বা চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্যে পরিবারের সদস্যদের আটক করে থাকে, তাহলে তা ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি শিশুকে কারাগারে পাঠানো বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো অবস্থাতেই শিশুকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অংশ করা যায় না। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিরও পরিপন্থী।’
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ওমর ফারুক এই ঘটনাকে গভীরভাবে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা বারবার দেখছি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কখনো কখনো অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করছে। একজন আসামি পালিয়ে গেলে তার পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতার করা একটি ধরনের প্রতিশোধমূলক আচরণ, যা আইনের শাসনের সঙ্গে যায় না। বিশেষ করে নারী ও শিশুকে এভাবে গ্রেফতার করা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অগ্রহণযোগ্য।’
তিনি বলেন, ‘শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী কোনো শিশুকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলা যাবে না, যা তার মানসিক বা শারীরিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারাগারের পরিবেশ একটি শিশুর জন্য কখনোই উপযুক্ত নয়। এই ধরনের ঘটনা শিশুর মনে দীর্ঘস্থায়ী ট্রমা তৈরি করতে পারে। এর দায় নেবে কে?’
এদিকে কক্সবাজারের উখিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো রকিবুল হাসান বলেন, ‘শিশুটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করা হয়নি। বরং তার মা নিজেই তাকে সঙ্গে নিতে চেয়েছেন। আর আসামি পালাতে গ্রেফতার হওয়া সবাই জড়িত ছিলেন।’
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল পুলিশ সুপার মো রকিবুল হাসানের এ বক্তব্যের বিষয়ে ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘পুলিশ যদি দাবি করে যে পরিবারের সদস্যরা আসামিকে পালাতে সহায়তা করেছে, তাহলে সেই অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকতে হবে। শুধু মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হলে তা আদালতে টিকবে না। আর ৭৫ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ এবং দুই গৃহবধূকে এভাবে গ্রেফতার করা হলে তা ন্যায়বিচারের বিষয়ে প্রশ্ন তোলে।’
শিশুর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মায়ের গ্রেফতারের ক্ষেত্রে শিশুকে কারাগারে না পাঠিয়ে আদালতের মাধ্যমে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত ছিল। সরাসরি কারাগারে পাঠানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাস্তব পরিস্থিতিতে একজন মায়ের পক্ষে সন্তানকে ফেলে যাওয়া সম্ভব নয়, ফলে এটিকে স্বেচ্ছায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বলা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
জনমনে উদ্বেগ ও আস্থার সংকটের শঙ্কা
ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এই ধরনের পদক্ষেপ কি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বদলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করছে না? বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনসাধারণের আস্থায় গভীর ক্ষত তৈরি হবে। আইন প্রয়োগে সংযম ও মানবিকতা নিশ্চিত করা এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি বন্ধ করাই এখন সময়ের দাবি।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে