গুজব কতটা প্রভাব ফেলবে এবারের নির্বাচনে?
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা, সহিংসতা এবং তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিস্তার লাভ করছে গুজব ও অপতথ্য। মাঠের রাজনীতির পাশাপাশি ভার্চুয়াল দুনিয়াও এখন এক ধরনের ‘তথ্যযুদ্ধের’ ময়দান। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো ভুয়া খবর, এআই দিয়ে তৈরি ডিপফেক ভিডিও, নকল ফটোকার্ড; সব মিলিয়ে ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার এক ভয়ংকর বাস্তবতা সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠছে, এই গুজব কতটা প্রভাব ফেলতে পারে আসন্ন নির্বাচনের ওপর?
গুজব নতুন কোনো রাজনৈতিক অস্ত্র নয়, এদেশের প্রেক্ষাপটে তো নয়ই। তবে ডিজিটাল যুগে এর গতি, ব্যাপ্তি ও প্রভাব বহুগুণ বেড়েছে। আগে যেখানে চায়ের দোকান, বাজার বা গণপরিবহনে মুখে মুখে গুজব ছড়াত, এখন সেখানে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ হয়ে উঠেছে প্রধান মাধ্যম। স্মার্টফোন ও মোবাইল ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় মুহূর্তের মধ্যেই একটি যাচাইহীন তথ্য হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, যার সত্যতা যাচাই করার সুযোগ বা সময় অনেকেরই থাকে না।
ডিসমিসল্যাব, রিউমার স্ক্যানারসহ বিভিন্ন ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে ছড়ানো অপতথ্যের বড় অংশই রাজনৈতিক এবং তার অধিকাংশই নির্বাচনকেন্দ্রিক। এসব অপতথ্যের ভাষা ও উপস্থাপন কৌশল এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে তা আবেগ, ভয় বা ক্ষোভকে উসকে দেয়—যুক্তির চেয়ে অনুভূতির ওপরই বেশি আঘাত হানে। ফলে ভুয়া খবর অনেক সময় সত্য খবরের চেয়েও দ্রুত বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। এসব গুজব শুধু বিভ্রান্তিই তৈরি করছে না, অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি সহিংসতা, ভোটার আতঙ্ক এবং নির্বাচনী পরিবেশের অবনতি ঘটাচ্ছে। বাস্তব রাজনীতির সঙ্গে ভার্চুয়াল দুনিয়ার এই মিথস্ক্রিয়া নির্বাচনের মাঠকে আরও জটিল করে তুলছে, যেখানে একটি গুজবই কখনো কখনো বাস্তব পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
গুজব ও সহিংসতার সরাসরি যোগসূত্র
নির্বাচনকে ঘিরে ছড়ানো গুজবের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর সহিংস পরিণতি। শেরপুরে সম্প্রতি নির্বাচনকালীন উত্তেজনার মধ্যে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়িয়ে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। পরবর্তীতে নিহত হওয়ার ভুয়া খবর ছড়িয়ে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়—যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এধরণের ঘটনা আগেও এত বেশি ঘটেছে যা গুণে শেষ করা যাবে না। এসব উদাহরণ দেখায়, অপতথ্য কীভাবে খুব দ্রুত বাস্তব জগতে রক্তক্ষয়ী রূপ নিতে পারে।
অতীতের বহু ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নির্বাচনের সময় ছড়ানো গুজব সাধারণত বিচ্ছিন্ন বা হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনাকেই অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করে। এরপর সেই বিকৃত তথ্য স্থানীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে—কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট, কখনো অডিও বার্তা, আবার কখনো স্থানীয় মসজিদের মাইকে ঘোষণার মাধ্যমে। এতে করে ঘটনার প্রকৃত সত্য জানার আগেই জনমনে ক্ষোভ ও প্রতিশোধপরায়ণতা তৈরি হয়।
নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে, গুজব ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে যেখানে রাজনৈতিক বিভাজন আগে থেকেই তীব্র, সেখানে একটি ভুয়া খবর জনতাকে দ্রুত মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়। ফলে গুজব এখানে আর কেবল তথ্যগত বিভ্রান্তি থাকে না; এটি সরাসরি সহিংসতা উসকে দেওয়ার কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে, নির্বাচনকালীন গুজব মোকাবিলা না করা হলে তা শুধু নির্বাচনী পরিবেশ নয়, সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার জন্যও গুরুতর হুমকি তৈরি করতে পারে।
ভোটার আচরণে গুজবের প্রভাব
নির্বাচনের সময় গুজবের মূল লক্ষ্য থাকেন ভোটাররা, এবারও ভোটারদের প্রভাবিত করতে নানাবিধ গুজব ছড়ানো হচ্ছে। কখনো বলা হচ্ছে ‘নির্বাচনই হবে না’, কখনো শোনা যাচ্ছে ‘অমুক কেন্দ্রে ভোটগ্রহন শেষ’, আবার কোথাও রটানো হচ্ছে ‘ভোট দিতে গেলে হামলা হবে’। এসব গুজব ভোটারদের মনে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রেই ভোটার সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন কেন্দ্রে যাবেন না। ফলে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং গুজবকারীদের উদ্দেশ্য সফল হয়।
নির্বাচনকালীন সময়ে এই ধরনের গুজব বিশেষভাবে কার্যকর হয়, কারণ তখন ভোটাররা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। ভোটের দিন বা তার আগের রাতে ছড়ানো একটি ভুয়া খবর—যেমন ভোট স্থগিত, কেন্দ্র দখল বা সহিংসতার আশঙ্কা—ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে এবং তারা নিরাপত্তার কথা ভেবে ঘরেই থেকে যান। এছাড়াও, অনেক সময় পুরোনো সহিংসতার ভিডিও বা আগের নির্বাচনের বিশৃঙ্খলার দৃশ্য বর্তমান সময়ের বলে প্রচার করা হয়। এতে করে ভোটাররা বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্ত হন এবং ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়েন। এতে করে ভোটার উপস্থিতি কমে যায়, যা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকেই দিনশেষে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ভোটারদের লক্ষ্য করে ছড়ানো গুজবের বড় অংশই শেষ মুহূর্তে ছড়ানো হয়, যাতে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করার সুযোগ কম থাকে। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যখন আর এক সপ্তাহ দূরে তার আগে তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সয়লাব গুজবে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে কোনটা যে সত্য তথ্য আর কোনটা যে মিথ্যা তা আলাদা করে বোঝার উপায় নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: নির্বাচনী প্রভাবের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু মত প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। মিশরের তাহরির স্কয়ারের আরব বসন্ত থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের গণঅভ্যুত্থান—বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই অভিজ্ঞতাগুলো দেখায়, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কখনো আন্দোলনের সংগঠক, আবার কখনো রাজনৈতিক মতাদর্শ ছড়ানোর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে ৬ কোটিরও বেশি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু ফেসবুক ব্যবহারকারীই ৬ কোটি, টিকটক ব্যবহারকারী ৪ কোটি ৬০ লাখ। পাশাপাশি লিংকডইন ও ইনস্টাগ্রামের ব্যবহারকারী সংখ্যা যথাক্রমে ৯৯ লাখ ও ৭৫ লাখ। এই বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তি নির্বাচনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী মাধ্যম করে তুলেছে।
ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ তরুণ হওয়ায় রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে স্বীকার করা হচ্ছে, অফলাইনের তুলনায় অনলাইনে প্রচারণার মাত্রা অনেক বেশি। বিএনপি চেয়ারপারসনের বৈদেশিক কমিটির বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কার্যত একটি অনিয়ন্ত্রিত পরিসর, যেখানে ভুয়া ফটোকার্ড, বিভ্রান্তিকর সংবাদ, গুজব ও ডিসইনফরমেশন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহারের কৌশলও নিচ্ছে। এনসিপির নির্বাচনী মিডিয়া উপ-কমিটির প্রধান মাহাবুব আলম জানিয়েছেন, তরুণদের অনুপ্রাণিত করতে এবং ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি বাড়াতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ প্রচারণা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এটি স্পষ্ট করে যে, ভোটার আচরণ গঠনে অনলাইন প্রচারণা একটি নির্ধারক ভূমিকায় পৌঁছে গেছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের আলাদা আলাদা তথ্যজগতে বিভক্ত করে ফেলছে। উদারপন্থী ও রক্ষণশীল ব্যবহারকারীরা কার্যত ভিন্ন বাস্তবতায় বসবাস করছেন, যেখানে একই ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ছে। এই বিভাজনের সুযোগ নিয়েই গুজব, অপতথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। এই বাস্তবতায় বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আসন্ন নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভিন্ন ও গভীর স্তরে পৌঁছাতে পারে। ফলে কেবল রাষ্ট্রীয় নজরদারি নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
এআই এর অপব্যবহার
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় নতুন চ্যালেঞ্জ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। ডিসমিসল্যাব ও রিউমার স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে এআই-নির্ভর ডিপফেক কনটেন্টের ব্যবহার কয়েকশ শতাংশ বেড়েছে। নির্বাচন ঘিরে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করেছে গুজব ও অপতথ্যের বিস্তারে। রাজনৈতিক নেতাদের কণ্ঠ নকল করে তৈরি অডিও, বক্তব্য কাটছাঁট করে বানানো বিভ্রান্তিকর ভিডিও এবং বিদেশি নেতাদের ভুয়া ভিডিও বা ফটো ব্যবহার করে জনমত প্রভাবিত করার একাধিক চেষ্টা ইতোমধ্যেই শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, নামকরা সংবাদমাধ্যমের লোগো ও ডিজাইন নকল করে তৈরি করা ভুয়া ফটোকার্ডের বিস্তার। এসব ফটোকার্ড দেখতে অনেকটাই মূলধারার গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদের মতো হওয়ায় সাধারণ পাঠক ও ভোটারদের পক্ষে সত্য-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই যাচাই ছাড়াই এসব কনটেন্ট শেয়ার হচ্ছে, যা গুজবকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে।
নির্বাচন কমিশনও এই ঝুঁকিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কমিশনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত একাধিক ফটোকার্ডে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে—এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, ভিডিও, অডিও বা ডিপফেক তৈরি ও প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপই ইঙ্গিত দেয়, এআই-ভিত্তিক অপপ্রচার নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য একটি বাস্তব ও তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এআই-ডিপফেকের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর বিশ্বাসযোগ্যতা। আগের গুজব অনেক সময় ভাষাগত অসঙ্গতি বা দৃশ্যগত ত্রুটির কারণে সন্দেহ তৈরি করত। কিন্তু এআই-সৃষ্ট কনটেন্ট এতটাই নিখুঁত যে, তা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মী ও এমনকি সংবাদকর্মীদেরও বিভ্রান্ত করতে পারে। নির্বাচনকালীন উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে একটি ভুয়া ভিডিও বা অডিও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে জনমনে সন্দেহ, ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি করতে সক্ষম।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঝুঁকি আরও গভীর, কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার দ্রুত হলেও ডিজিটাল যাচাই–সচেতনতা এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে এআই যুক্ত অপতথ্য শুধু বিভ্রান্তি তৈরি করে না, বরং ভোটারদের আস্থা নষ্ট করে এবং নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা বাড়িয়ে তোলে। ভোট দিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক সময় এই অনাস্থা থেকেই জন্ম নেয়—যার সামগ্রিক প্রভাব পড়ে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ওপর। এইভাবে এআই, ডিপফেক ও নকল ফটোকার্ড নির্বাচনে এমন এক নীরব কিন্তু গভীর ক্ষতি সাধন করছে—যেখানে বিভ্রান্তি শুধু তথ্যের স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ভোটারের সিদ্ধান্ত ও আস্থাকে সরাসরি প্রভাবিত করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয়।
রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি ও সীমাবদ্ধতা
নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, র্যাব ও সাইবার ইউনিটগুলো নির্বাচনকালীন গুজব ও অপতথ্য মোকাবিলায় নজরদারির কথা বললেও বাস্তবতা হলো—এই চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি ঠেকানো প্রায় অসম্ভব। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বিশেষ মনিটরিং বা ফ্যাক্ট-চেকিং সেল গঠন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবু অপতথ্যের গতি ও বিস্তার রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুততর। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর সঙ্গে কার্যকর ও তাৎক্ষণিক সমন্বয় না থাকায় বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো পোস্ট বা ভিডিও অপতথ্য হিসেবে শনাক্ত হওয়ার আগেই তা হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং কাঙ্ক্ষিত প্রভাব সৃষ্টি করে ফেলে। পরে কনটেন্ট সরানো হলেও ক্ষতি তখন অনেকাংশেই হয়ে যায়। প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকেও সীমাবদ্ধতার কথা উঠে আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কিছু পেশাদার সফটওয়্যার থাকলেও মনিটরিং সেলগুলো এখনো বড় পরিসরে ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্সের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এআই-নির্ভর ডিপফেক, সমন্বিত অপপ্রচার নেটওয়ার্ক বা বিদেশি উৎস থেকে পরিচালিত বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা শনাক্ত করা সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছড়ানো অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি মোকাবিলায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের সহায়তা চেয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ভলকার তুর্কও স্বীকার করেছেন, ভুয়া তথ্যের এই বিস্তার একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং বিষয়টি মোকাবিলায় বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। এই উদ্যোগ ইঙ্গিত দেয়, সমস্যাটি কেবল অভ্যন্তরীণ নয়; এর একটি আন্তর্জাতিক মাত্রাও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দায় চাপিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রয়োজন স্পষ্ট নীতিমালা, আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম ও ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। তা না হলে গুজব ও অপতথ্য প্রতিরোধের উদ্যোগ বারবার সীমাবদ্ধতার মুখে পড়বে।
নির্বাচনকালীন গুজব ও অপতথ্য মোকাবিলায় প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি করণীয় হলো প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করা। আমাদের বিপুল জনসংখ্যার এদেশে গুজব নিয়ন্ত্রনে রাখতে হলে নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাইবার ইউনিটগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের গতি বাড়াতে হবে, যাতে সন্দেহজনক কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত ও যাচাই করা যায়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে আগাম ও কার্যকর যোগাযোগ কাঠামো তৈরি করা জরুরি, যাতে ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ সম্ভব হয়। নীতিগত দিক থেকে নির্বাচনকালীন সময়ে এআই-নির্ভর কনটেন্ট ব্যবহারের সীমা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি, ভিডিও বা অডিও হলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যেতে পারে। এতে ভোটারদের পক্ষে তথ্য যাচাই সহজ হবে এবং বিভ্রান্তি কমবে।
গণমাধ্যমেরও এক্ষেত্রে দায়িত্ব রয়েছে। মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোকে দ্রুত ফ্যাক্ট-চেক, নির্ভুল তথ্য প্রচার এবং গুজব শনাক্তে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। উত্তেজক শিরোনাম বা যাচাইহীন তথ্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবশেষে, নাগরিক সচেতনতার বিকল্প নেই। ভোটারদের তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা, সন্দেহজনক কনটেন্ট শেয়ার না করা এবং অফিসিয়াল উৎসের ওপর নির্ভর করা—এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তই সামগ্রিকভাবে গুজব প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কেননা, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ যত শক্তিশালীই হোক, সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া গুজবের এই স্রোত পুরোপুরি থামানো সম্ভব নয়।
গুজবের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের বিশ্বাস। যখন সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়, তখন মানুষ বিভ্রান্ত হয়, সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে সত্য খবরও অনেক সময় অবিশ্বাস্য হয়ে পড়ে। এটাই গুজবের সবচেয়ে বিপজ্জনক সাফল্য। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, অপতথ্যের স্রোত তত বাড়ছে—এটি শুধু নির্বাচনী ফল নয়, সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও হতে পারে বড় হুমকি।
তাহলে প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়—গুজব নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম। এটি ভোটার উপস্থিতি কমাতে পারে, সহিংসতা উসকে দিতে পারে, এমনকি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ভোটারের। কেউ কিছু বললেই বিশ্বাস না করে, যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হতে পারে গুজব মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। রাষ্ট্র, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল আচরণ ছাড়া এই তথ্যযুদ্ধ জেতা কঠিন। ডিজিটাল যুগে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে সচেতন ভোটারই শেষ ভরসা।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে