Views Bangladesh Logo

বিশ্ব শান্তির জন্য কী অবদান রাখতে পারে এআই প্রযুক্তি?

Rased Mehedi

রাশেদ মেহেদী

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা গেল। বাজারে যারা একে-অপরের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী, সেই ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই একই সুরে কথা বললেন। গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আমোদেই বলেছেন, ঠিকভাবে পরিচালিত না হলে এআই পুরো মানবজাতির জন্য ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। অল্টম্যান সতর্ক করেছেন, ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাত থেকে এআই-এর হাতে চলে যেতে পারে। অর্থাৎ যারা প্রযুক্তিটি বানাচ্ছেন, তারাই বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নিরাপত্তা ফোরামে দাঁড়িয়ে বলছেন, আমাদের নিয়ন্ত্রণ করুন।

ঠিক পরদিন, বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে মুখোমুখি হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। বৈঠকের আগে ট্রাম্প এআই-কে “সুপার ইন্টেলিজেন্স” নাম দিয়ে এবারের বৈঠকে আলোচনায় এক নম্বর আলোচ্যসূচি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। আগের দিন ট্রুথ সোস্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প খুব জোর দিয়েই জানান, তিনি এআই প্রযুক্তির প্রতি কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিপক্ষে। আর এআই মানব সভ্যতার জন্য হুমকি হতে পারে, এটা তিনি বিশ্বাসও করেন না।

তবে বৈঠক শেষে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর কন্ঠে শোনা গেল উল্টো সুর। তিনি তার বক্তব্যে জানান, এআই শাসনব্যবস্থা উন্নয়নে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে। শি বললেন, দুই দেশেরই এআই বিকাশ ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ও দায়িত্ব আছে এবং এআই যেন সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে।

তবে বহুল আলোচিত ওই বৈঠকে কোনো বাধ্যতামূলক চুক্তি হয়নি, কোনো যৌথ ঘোষণাও আসেনি। এআই নির্মাতারা লাগাম চাইছেন আর যাদের হাতে লাগাম টানার রাজনৈতিক ক্ষমতা, তারা আপাতত শুধু সদিচ্ছার কথা বলছেন। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি তোলা জরুরি-এআই কি সত্যিই বিশ্ব শান্তিতে কোনো অবদান রাখতে পারে নাকি এটি নতুন যুগের সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র হয়ে উঠছে?

প্রায় তিন দশক ধরে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে একটি কথা বারবার মনে হয়েছে, প্রযুক্তি নিজে কখনো শান্তি বা যুদ্ধ আনে না। মোবাইল ফোন গ্রামের কৃষককে বাজারের দাম জানিয়েছে আবার সেই মোবাইল ফোনেই তুচ্ছ ঘটনাকে বড় আকারে গুজব ছড়িয়ে মানুষের বাড়িঘর-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া হয়েছে। এআই-এর ক্ষেত্রেও সত্যটি একই, তবে মাত্রাটি অনেক বড়। কারণ এআই এমন একটি প্রযুক্তি যে শুধু বার্তা বহন করে না, শুধু মানুষের নির্দেশেই কাজ করে না, মানুষকে এড়িয়ে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আর প্রযুক্তিকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো মানবিক গুণে সক্ষম করে তুলেছে মানুষই।

তাই শুরুতেই স্পষ্ট করা দরকার, যুদ্ধের মূল কারণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক। কোনো অ্যালগরিদম ক্ষমতার লোভ, সীমান্ত বিরোধ বা জাতিগত ঘৃণা মুছে দিতে পারবে না। কিন্তু দায়িত্বশীল হাতে থাকলে এআই শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে দ্রুত, তথ্যনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে পারে। সেই সম্ভাবনাগুলো উপেক্ষা করার মতো নয়।

যেখানে এআই শান্তির পক্ষে কাজ করতে পারে
এক. সংঘাতের আগাম সতর্কতা। আগুন লাগার পর নেভানোর চেয়ে আগুন লাগতে না দেওয়াটাই উত্তম ব্যবস্থা। সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয় ও নরওয়ের পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলোর যৌথ প্রকল্প “ভিউজ” অর্থনৈতিক সূচক, খাদ্যমূল্য, জলবায়ু ও সামাজিক মাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোথায় রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ছে তার নিয়মিত পূর্বাভাস দেয়। প্রশ্ন হলো, পূর্বাভাস পাওয়ার পর রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে কি না। সতর্কবার্তা ফাইলবন্দি থাকলে পৃথিবীর সেরা অ্যালগরিদমও অর্থহীন।

দুই. শান্তি আলোচনায় সাধারণ মানুষের কণ্ঠ। শান্তি আলোচনার টেবিলে সাধারণত বসেন বন্দুকধারীরা আর বাইরে থাকেন যারা বন্দুকের গুলিতে মরেন। কিন্তু গুলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কন্ঠ দ্রুততম সময়ে সুশৃঙ্খল উপায়ে জোরালো করে তুলে ধরে বন্দুকধারীর বন্দুকের ট্রিগার থেকে আঙুল সরিয়ে দিতে বাধ্য করতে পারে। যেমন জাতিসংঘ ইয়েমেন, লিবিয়া ও ইরাকে এআই-সহায়িত ডিজিটাল সংলাপের মাধ্যমে একসঙ্গে হাজার হাজার নাগরিকের মতামত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেছে। এতে বোঝা গেছে কোথায় ঐকমত্য আর কোথায় বিভাজন।

নারী, তরুণ ও প্রান্তিক মানুষের কথা আগে সোস্যাল মিডিয়া তুলে ধরত। কিন্তু সোস্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম গুজব, ডিফেমিং কনটেন্ট কিংবা মিথ্য তথ্য ছড়ানোর রোধে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। কারণ ফেসবুক-ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম কনেটেন্টের সত্য-মিথ্যা যাচাই, বিশ্লেষণে মোটেও পারদর্শী নয়। বরং ইউটিউব-ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মের দুর্বল অ্যালগরিদমের জন্য ডিমেফিং, ভুয়া এবং সহজে বলতে গেলে নোংরাতম কনটেন্টগুলোই প্রতিনিয়ত ভাইরাল হচ্ছে। এসব প্ল্যাটফর্মে এখন ভালো কনটেন্ট, মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কনটেন্টে রিচ দেওয়া হয় না। এ কারণে সোস্যাল মিডিয়া জনমত জরীপ কিংবা তথ্য বিশ্লেষণের জন্য নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। বরং ইউটিউব-ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মের ভয়ংকর দায়িত্বহীনতার কারণে দেশে দেশে অসংখ্য নির্দোষ মানুষের জীবন আজ হুমকির মুখে।

কিন্তু এআই তথ্যের ভালো-মন্দ বিচার করতে পারে। ব্যবহারকারী হিসেবে আপনি তাকে কোন মতলবে কোন নির্দেশ দিচ্ছেন সেটাও এআই এজেন্ট বুঝতে পারে এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনাকে নেগেটিভ নির্দেশ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিতে পারে। এআই দ্রুততম সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক নির্ভরযোগ্য মাধ্যম থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তার একটি চমৎকার বিশ্লেষণ দিতে পারে। সেই বিশ্লেষণ ব্যবহার করে সাধারণ ব্যবহারকারী থেকে রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারক মহল সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাই বলে এআই ভুল করতে পারে না, তা নয়। তবে সোস্যাল মিডিয়া যেখানে এখনও তার অ্যালগরিদমে ভুল আর দুর্বলতার মাত্রা ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়েই যাচ্ছে, সেখানে এআই প্ল্যাটফর্মগুলো নিজেদের নির্ভুল বিশ্লেষণে সক্ষমতা দ্রুতই বাড়াচ্ছে। যেমন অ্যানথ্রোপিকের সর্বশেষ রিপোর্টে কীভাবে কোথায় এআই এজেন্টকে অপকর্মে ব্যবহার করা হয়েছে তার বিবরণ তুলে ধরেছে এবং মানুষের কল্যাণে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের নিজেদের দায়িত্বশীলতার প্রমাণ দিয়েছে। যে ধরনের দায়িত্বশীলতার প্রমাণ ইউটিউব-ফেসবুক কখনই দিতে পারেনি।

এআই প্রযুক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বজ্ঞানহীন অ্যালগরিদমকেও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে, সে আলোচনাও শুরু হয়ে গেছে। কারণ সোস্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নোংরা কনটেন্টকে যেখানে বাণিজ্যের মূল পণ্য হিসেবে ব্যবহার করছে, সেখানে ব্যবসায়িক স্বার্থেই নির্মাতাদের এআই এজেন্টকে অনেক বেশী দায়িত্বশীল ও পজিটিভ চিন্তায় প্রশিক্ষিত করতে হচ্ছে। এখানেই আমার দৃঢ় আস্থা, এআই বিশ্ব শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত প্রযুক্তি বিবেচিত হতে পারে।

তিন. ভাষার দেয়াল ভাঙা। এআই ব্যবহারে তাৎক্ষণিক অনুবাদ প্রযুক্তি ভিন্ন ভাষাভাষী সম্প্রদায় ও শান্তিরক্ষীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ সহজ করছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে শীর্ষ সেনা প্রেরণকারী দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এটি নিছক প্রযুক্তির খবর নয়। আফ্রিকার কোনো গ্রামে আমাদের শান্তিরক্ষী যখন স্থানীয় মানুষের কথা বুঝতে পারেন, তখন ভুল বোঝাবুঝি থেকে প্রাণহানির ঝুঁকিও কমে।

চার. যুদ্ধবিরতি ও চুক্তি পর্যবেক্ষণ। স্যাটেলাইট ছবি এআই দিয়ে বিশ্লেষণ করে সেনা সমাবেশ, অস্ত্রের চলাচল বা গ্রাম পোড়ানোর ঘটনা শনাক্ত করা যায়। কে চুক্তি ভাঙছে, তা যখন নিরপেক্ষভাবে প্রমাণ করা যায়, তখন পারস্পরিক আস্থা তৈরি হয়। আস্থা ছাড়া শান্তিচুক্তি কাগজের বেশি কিছু নয়।

পাঁচ. সংঘাতের শিকড়ে হাত দেওয়া। দারিদ্র্য, খাদ্য সংকট, পানি ও জমি নিয়ে প্রতিযোগিতা বহু যুদ্ধের জন্ম দিয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির হাঙ্গারম্যাপ লাইভ এআই দিয়ে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা পর্যবেক্ষণ করে। বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের নিখুঁত পূর্বাভাস বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য বাস্তুচ্যুতি ও সম্পদ নিয়ে বিরোধ ঠেকানোর হাতিয়ার হতে পারে।

ঝুঁকির মাত্রাও বিবেচনায় রাখতে হবে
শান্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকির চিত্রটিও সমান স্পষ্ট করে বলা দরকার। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই সপ্তাহেই মানুষের নিয়ন্ত্রণবিহীন স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র বা “কিলার রোবট” নিয়ে সতর্ক করেছেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি যুদ্ধে এআই-নির্ভর লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থা বেসামরিক প্রাণহানি ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সাড়ে চার বছর ধরে যুদ্ধে থাকা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সাধারণ পরিষদে বলেছেন, যন্ত্রের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ দ্রুত নিশ্চিত না হলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।

আর এআই এজেন্টের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ জানিয়েছেন, জুন মাসে ওপেনএআই-এর একটি এজেন্ট দেশটির মেডিকেয়ার পরিসংখ্যান পোর্টালের গোপন ফাইলে ঢুকে পড়ে, বারবার বাধা দেওয়া সত্ত্বেও। ওপেনএাই অষ্ট্রেলিয়া সরকারকে জানিয়েছে ৮৪ দিন পরে, তাও একটি সাধারণ পাবলিক ইমেইল ঠিকানায়!

এখানে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রাখতে চাই বাংলাদেশ সরকারের নীতি নির্ধারকদের কাছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত প্রযুক্তি সক্ষমতার দেশ যদি নিজের সরকারি ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ টের না পায় এবং খবর পায় তিন মাস পরে তাহলে বাংলাদেশের অবস্থা কী? আমাদের সরকারি ওয়েবসাইট, ডেটা সেন্টার, এনআইডি সার্ভার বা টেলিকম নেটওয়ার্কে এমন কিছু ঘটলে আমরা কি আদৌ জানতে পারব? বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশের মতো দেশের দরকষাকষির শক্তি কতটুকু? দেশের মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকেই যেখানে গ্রাহক স্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য আদায় করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে বৈশ্বিক এআই কোম্পানির জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি আমাদের নেই বললেই চলে।

নিয়ম কারা লিখবে?
নিরাপত্তা পরিষদে অ্যানথ্রোপিকের প্রধান দারিও আমোদেই তিনটি প্রস্তাব দিয়েছেন। জৈব অস্ত্র তৈরিতে এআই ব্যবহার নিষিদ্ধের মতো সুনির্দিষ্ট বৈশ্বিক চুক্তি, দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি পরস্পর যাচাইয়ের ব্যবস্থা এবং অভিন্ন বৈশ্বিক মানদণ্ড। অল্টম্যান চেয়েছেন সক্ষমতা পরিমাপ ও ঝুঁকি মূল্যায়নের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং মানুষের অর্থবহ তদারকি। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো পরিস্থিতিকে পারমাণবিক যুগের সূচনার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তুলনাটি যথার্থ এবং সেখানেই আমাদের শঙ্কা। পারমাণবিক যুগের নিয়ম-কানুন লিখেছিল পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো, আর বাকি বিশ্বকে সেই নিয়ম মেনে নিতে হয়েছিল। এআই-এর ক্ষেত্রেও কি একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে? যুক্তরাষ্ট্র আর চীন যখন নিজেদের মধ্যে হটলাইন খুলছে, তখন গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য কোন লাইন খোলা আছে? কোনো পরাশক্তির এআই যদি বাংলাদেশের নেটওয়ার্কে বিপর্যয় ঘটায়, সেই খবর আমাদের কে দেবে? জাতিসংঘের আওতায় এআই শাসন নিয়ে গঠিত বৈশ্বিক সংলাপ ও স্বাধীন বৈজ্ঞানিক প্যানেলে বাংলাদেশের মতো দেশের কণ্ঠ কতটা শোনা যাচ্ছে?

ওয়াশিংটন বৈঠক: হটলাইন আছে, লাগাম নেই
ট্রাম্প–সি বৈঠকের সবচেয়ে দৃশ্যমান অর্জন একটি এআই হটলাইন। বৈঠকের আগে রবিবার নিউইয়র্কে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ও চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেংয়ের আট ঘণ্টার আলোচনায় ঠিক হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করার মতো এআইজনিত কোনো ঘটনা ঘটলে দুই দেশ পরস্পরকে জানাবে। শীর্ষ বৈঠকে সি সেই সহযোগিতার পথে সম্মতি দিয়েছেন আর চলতি বছরের শেষে চীনের শেনজেনে আরও আলোচনার কথা রয়েছে।

স্নায়ুযুদ্ধের ইতিহাস মনে রাখলে এটিকে তুচ্ছ বলা যায় না। কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর ওয়াশিংটন–মস্কো হটলাইনও ছিল একটি সাধারণ যোগাযোগ চ্যানেল, অথচ পরের দশকগুলোতে তা দুর্ঘটনাজনিত পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি কমিয়েছে। কিন্তু খুঁটিনাটিতে গেলে শঙ্কাই বেশি। কত দ্রুত সতর্কবার্তা পাঠাতে হবে আর বার্তা পেলে অপর দেশের কী করণীয়, সে বিষয়ে এখনো কোনো পক্ষ কিছু বলেনি। উন্নত চিপের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মতো মূল বিরোধের বিষয় আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে। বাণিজ্য যুদ্ধবিরতিও বাড়ানো হয়েছে মাত্র দুই মাসের জন্য। আর দুই দেশ ২০১৪ সালে যে সামরিক হটলাইন চালু করেছিল, তাও একসময় অকার্যকর হয়ে পড়েছিল।

মূল সমস্যাটি অবিশ্বাসের। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, নিজে সংযত হলে চীন গোপনে এগিয়ে যাবে; চীনেরও একই ভয়। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, এআই-তে যে জিতবে, সেই জিতবে। এই মানসিকতায় দুই পরাশক্তি পরস্পরকে দুর্ঘটনার খবর জানাতে রাজি, কিন্তু দৌড় থামাতে নয়। অর্থাৎ ওয়াশিংটন বৈঠক দুর্ঘটনা সামলানোর ব্যবস্থা দিয়েছে, দুর্ঘটনা ঠেকানোর নয়। অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা মনে রাখলে প্রশ্নটি আরও তীক্ষ্ণ হয়: একটি মার্কিন কোম্পানি যখন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র অস্ট্রেলিয়াকেই ৮৪ দিন পরে খবর দেয়, তখন এক পরাশক্তি আরেক পরাশক্তিকে সময়মতো সতর্ক করবে, এই ভরসা কতটুকু?

শেষ কথা
এআই শান্তি আনবে, নাকি নতুন যুদ্ধের কারণ হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর কোনো ল্যাবরেটরিতে লেখা হবে না। লেখা হবে রাজনীতির টেবিলে। যন্ত্র যত বুদ্ধিমানই হোক, শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় সহমর্মিতা, দায়বোধ আর সদিচ্ছা সব সময় মানুষেরই একচেটিয়া। যারা এআই বানাচ্ছেন, তারা নিজেরাই যখন বলছেন আমাদের থামান, তখন সেই আহ্বানে সাড়া না দেওয়াটাই হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় অবিবেচনা। এআই এমন একটি প্রযুক্তি যেটি আপনার হাতের মুঠোয় অসীম সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। সেই সম্ভাবনা যেন আশঙ্কায় পরিণত না হয়, সে কারণেই এআই প্রযুক্তি মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-শি বৈঠক দেখিয়ে দিয়েছে, দুই পরাশক্তি আপাতত কেবল নিজেদের মধ্যে ফোনের লাইন খুলতে রাজি। সেই লাইনের বাইরে থাকা বাকি বিশ্বের কী হবে, সে প্রশ্ন তোলার দায় আমাদের। নিয়ম লেখার টেবিলে বাংলাদেশের মতো দেশ অনুপস্থিত থাকলে, অন্যের লেখা নিয়মের দায়ই শুধু আমাদের বহন করতে হবে, আগেও যেমন হয়েছে।

রাশেদ মেহেদী
টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি খাত বিশ্লেষক; সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ