সাংবিধানিক যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হবেন নতুন রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিন শারীরিক অসুস্থতার কারণে গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পদত্যাগ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয় এবং সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ও শপথ গ্রহণ না করা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, পদত্যাগ, অপসারণ বা অন্য কোনো কারণে পদ শূন্য হলে সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। অর্থাৎ সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচকমণ্ডলী। নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন, যা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুসরণ করে তফসিল ঘোষণা, মনোনয়নপত্র গ্রহণ, যাচাই-বাছাই এবং প্রয়োজন হলে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করে।
তবে বাস্তবে বাংলাদেশের অধিকাংশ রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। কারণ সংসদে যে দল বা জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, তাদের মনোনীত প্রার্থীই সাধারণত নির্বাচিত হন। যদি একজনের বেশি বৈধ প্রার্থী থাকেন, তাহলে সংসদ সদস্যদের গোপন ব্যালটে ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হয়। আর একমাত্র বৈধ প্রার্থী থাকলে তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যপারে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘ রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রেও সংবিধানে কিছু শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রার্থীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে এবং জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। একই ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি রাষ্ট্রপতি হতে পারেন না। নির্বাচিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির কাছে শপথ গ্রহণ করেন। শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের অবসান ঘটে এবং নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।’
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মূলত সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান। দেশের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার হাতে ন্যস্ত থাকলেও রাষ্ট্রপতির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সাংবিধানিক দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ, সংসদ আহ্বান ও মুলতবি, সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি প্রদান, সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমা প্রদর্শন এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে পালন করা হয়। তবে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় এসব ক্ষমতার অধিকাংশই তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োগ করেন।’
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘মো. শাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ফলে এখন নির্বাচন কমিশনের সামনে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক দায়িত্ব এসেছে। তফসিল ঘোষণার পর সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেই ভোটের মাধ্যমে অথবা একক প্রার্থী থাকলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।
সংবিধান অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়াটি ৯০ দিনের মধ্যেই সম্পন্ন করতে হবে। ততদিন পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবেন এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে কোনো সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে না।’
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
২৪ জুলাই বিকেলে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের শপথকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার বলেন, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শুক্রবার বিকেল ৫টা ১ মিনিটে তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে দাখিল করেন। পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। একই সঙ্গে পদত্যাগপত্রটি জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ডে সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
মতামত দিন